পৌষের শেষ দিকে শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে ঢাকায় থাকা অবনী, অন্তু, ওদের গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলার রূপশালী গ্রামে।
গ্রামের বাড়িতে দাদা থাকেন সঙ্গে থাকে ছোট ফুপি আর তার একমাত্র ছেলে টোটন। টোটনের বাবা নেই করোনা কালীন সময়ে হাসপাতালে ডাক্তারের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন টোটনের বাবা, সেই সময়ে একদিন হুট করেই তিনি মারা গেছেন। টোটনরা তখন দাদাবাড়ী বরিশালে থাকত। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই টোটনের আর ওর মায়ের নানা বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছে।
মাকে টোটন অনেক প্রশ্ন করেছে আমরা কতদিন থাকব নানাবাড়ি? আমার তো নানা বাড়িতে কোনো বন্ধু নেই, আমি বরিশালে স্কুলে পড়ি কেন এত০দিন আমি নানা বাড়িতে থাকছি মা?
টোটনের মা কোন কথার জবাব দিতো না বরং মায়ের চোখের অসুখ হয়ে গেলো কাঁদতে কাঁদতে। নানা ভাই বললেন ‘শোন টোটন আমি তো একা বাড়িতে থাকি সময় কাটে না, আর আমি একা রান্নাবান্না করতে পারি না এই জন্য তুমি আর তোমার মা এখন থেকে আমার কাছে থাকবা’
সেই থেকে টোটন আর মা বরিশাল শহরের স্কুল, সহপাঠী, প্রতিবেশী বন্ধু, বাসার পাশের ক্রিকেট খেলার মাঠ সবকিছু ছেড়ে দিয়ে নানাবাড়িতে এসে থাকে।
প্রায় চার বছর হয়েছে ওরা নানাবাড়িতে থাকে। বরিশালে টোটন শহরের স্কুলে যেত আব্বুর মোটরসাইকেলে নামিয়ে দিতো আর ছুটির সময় মা গিয়ে নিয়ে আসত।
নানাবাড়ি এসে টোটনের তেমন কোনো বন্ধু হয়নি। স্কুল বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে, রাস্তাঘাট খুব একটা ভালো না। সামান্য বৃষ্টি হলেই স্কুলে যাওয়া হয় না। সাধারণত নানা ভাই-এর সঙ্গে টোটন স্কুলে যায়। মা একেবারে ই সময় পায় না। টোটনের মনে হয় আব্বু মারা যাওয়ার পরে সবাই যেন তার মাকে দিয়ে অনেক কাজ করায়। সেই রাত দশটা বেজে যায় তারপর কাজ থেকে মায়ের মুক্তি। তারপর যদি কোনো মেহমান আসে তাহলে মা প্রায় সারাদিন সারারাত কাজ করে বিশেষ করে ঢাকা থেকে যখন মামা মামি আর তাদের ছেলেমেয়েরা আসে তখন তো মা খুবই ব্যস্ততায় থাকেন।
টোটনকে গত বছর একদিন গ্রামের হাট থেকে নানা ভাই একজোড়া হাঁস কিনে দিয়েছে।
সেই থেকে এই হাঁস টোটনের বন্ধু। টোটন যেখানই যায় হাঁস প্যাক প্যাক শব্দ করতে করতে টোটনের পেছনে পেছনে যায়।
টোটন হাঁস নিয়ে নানা ভাইকে অনেক প্রশ্ন করে এই যেমন..
টোটন আচ্ছা নানা ভাই আমাদের হাঁস দুটো কি দুই ভাই?
নানা না, ওরা এক ভাই এক বোন।
টোটন আমি তাহলে ওদের দুজনের জন্য দুইটা নাম ঠিক করি,
নানা খুব ভালো হয়, তা কি নাম রাখতে চাও?
টোটন আমি বেশ কিছুদিন খেয়াল করে দেখেছি ওরা পুকুর খুব ভালোবাসে, পছন্দ করে এ কারণে আমি ওদের নাম দিতে চাই....একটার নাম নদী আর একটার নাম সাগর।
নানা হা হা হা করে জোড়ে শব্দ করে হেসে বলেন, ভাই টোটন এই নাম রাখলে আমাদের পাশের বাড়ি থেকে দুই ভাইবোন ছুটে আসবে, ওই যে উত্তর দিকে জানালা দেখতে পাচ্ছো ওই বাড়ির দুই ভাইবোনের নাম নদী এবং সাগর।
টোটন চিন্তায় পড়ে যায়, মায়ের সঙ্গে রাতে আলাপ করে কি নাম রাখা যায়। মা বলেন ‘তুমি আজকাল পড়াশোনা বাদ দিয়ে হাঁস নিয়ে চিন্তা বেশি করছো টোটন।’ টোটন নিজেও জানে মা সঠিক কথা বলছেন। আজকাল স্কুলে গেলেও হাঁস নিয়ে চিন্তা করে সে।
টোটন ঘুম থেকে উঠে হাঁস দুটোর নাম বলে নানাভাইকে, ওদের নাম রাখা হয় ‘তুলতুল এবং বুলবুল’। কয়েকদিনের মধ্যে হাঁসেদের নাম তাদের নিজেদের মনে থাকে এ বিষয়টি টোটনকে খুব আনন্দ দেয়।
গতকাল অবনী অন্তু টোটনের নানা বাড়ি অর্থাৎ অন্তুর দাদা বাড়িতে আসার পরে থেকেই ওদের দুই ভাইবোনেরও তুলতুল বুলবুল প্রিয় হয়ে ওঠে।
টোটনদের বাড়ির পাশে ছোট একটা পুকুর সেখানে হাঁস নিয়ে খেলা করত ওরা।
একসপ্তাহ অবনী অন্তু দাদা বাড়িতে ওরা আগামীকাল ঢাকায় ফিরে যাবে। বাড়িতে মা খুব ব্যস্ত পাশের গ্রামের একজন খালা আর মা মিলে বিভিন্ন রকম পিঠা বানাচ্ছে। নানা মাকে বলছে ‘আনোয়ার চালের রুটি পছন্দ করে খুব মাংসের ঝোল দিয়ে আজ বানাইও’
মা রুটি বানাচ্ছে তখন রাত নয়টা বেজে গেছে টোটন এসে মাকে জিজ্ঞেস করে মা কিসের মাংসের ঝোল দিয়ে আমরা রুটি খাব মা?
টোটন তিন চারবার প্রশ্ন করছে কিন্তু মা কোনো উত্তর দেয় না, নানা ভাই বলে ওঠেন হাঁসের মাংস দিয়ে, তোমার মামা মামি হাঁসের মাংস রুটি খুব পছন্দ করে।
টোটনের বুকের ভেতরে তোলপাড় করে ওঠে, টোটন নানাভাইকে প্রশ্ন করে
তুমি কি আজ হাট থেকে হাঁস কিনে আনছো?
নানা বলেন... আজকে তো হাটবার না।
টোটন দৌড়ে ঘরের বাহিরে যায় যেখানে তুলতুল বুলবুল থাকে সেখানে যেয়ে দেখে একটি হাঁস নেই।
টোটন মা.....বলে জোড়ে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।
সে রাতে টোটনের খুব জ্বর আসে
ভোর বেলা যখন অবনী অন্তুরা ঢাকায় রওয়ানা হয়ে যায় মায়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে মামা বলেন টোটনকে ডাক্তার দেখাইও বুবু।
টোটন মায়ের কোলে ঘুমোচ্ছে মা টোটনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলছে ‘বাবা তোমার জ্বর কমলেই আমরা হাটে যাবো হাঁস কিনতে তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো আব্বু’।
কেকে/ এমএস