রূপকথার কোনো গল্প নয়, সে এক সত্য ঘটনা। নাম তার গেদু মিয়া। তিনি ছিলেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রান্নাঘরে ঠাঁই পাওয়া একমাত্র মুসলমান বাবুর্চি। বাংলাদেশে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া একটি স্বনামধন্য জেলা। এ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক গুণী ব্যক্তি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরে বর্তমান একটি উপজেলার নাম সরাইল। এ উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন কিশোর গেদু মিয়া। তাদের ছিল দারিদ্র্যের সংসার।
তখন অবিভক্ত বাংলায় ঢাকার চেয়ে কলকাতায় ছিল কাজ কর্মের সুযোগ-সুবিধা বেশি। সে সময় ১৪ বছরের বালক গেদু মিয়া মামার হাত ধরে এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে সুদুর কলকাতা মহানগরে উপস্থিত হন। সময় কালটা ছিল সেই ১৯৩০ সাল। গেদু মিয়া তার মামার সুবাদে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের ঘরে কাজ পান রান্নার বাবুর্চি হিসেবে। এই ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের নাম ছিল জর্জ গ্রেগরি। বিশেষ করে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ঝাল, মসলাবিহীন সেদ্ধ খাবার খেতেন। গেদু মিয়া এই বালক কে দেখে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পছন্দ করলেন। ম্যাজিস্ট্রেটের স্ত্রী গেদু মিয়াকে মসলা ছাড়া সেদ্ধ খাবার রাধা বাড়ার কাজ কিছুদিনের মধ্যেই শিখিয়ে দেন। পরে গেদু মিয়ার রান্নার খাবার খেয়ে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট খুবই খুশি ও পরিতৃপ্ত ছিলেন। এই কলকাতার ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে সে সময় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল।
সে সময় ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেগরি তার মোটর গাড়িতে করেই গেদু মিয়াকে রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সালটি ছিল সে সময় ১৯৩৯। রবীন্দ্রনাথ তখন হজম শক্তি ও গোলমালজনিত পেটের পীড়ায় ভুগছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার অসুস্থের একথা একদিন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেগরিকে জানান। রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পেটের পীড়ার জন্য মসলাবিহীন সেদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। জবাবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন তেমন বাবুর্চি তো এখানে পাওয়া যাবে না। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তখন গেদু মিয়ার কথা রবীন্দ্রনাথ কে বলেছিলেন যে, তিনি যদি সম্মতি দেন তবে তিনি গেদু মিয়া বাবুর্চি কে তার সামনে হাজির করাতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথ এক কথায় রাজি হয়ে যান। এ ভাবেই গেদু মিয়া রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরে সাক্ষাৎ করতে পেরেছিলেন।
কিশোর গেদু মিয়া ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত মোট আট বছর জর্জ গ্রেগরি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তার রান্নার বাবুর্চি হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কাজ করেছিলেন। সঙ্গে তার বাগান পরিচর্যা ও করতেন এ কিশোর।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেগরি তার মোটর গাড়িতে করেই গেদু মিয়াকে রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সালটা ছিল ১৯৩৯। শান্তি নিকেতনের নির্জন ছায়া ঢাকা পরিবেশ গেদু মিয়ার খুব ভালো লেগেছিল। সে ভয়ে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব সে সময় বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে দারোয়ান গোছের একজন লোক এসে গেদু মিয়াকে নিয়ে গেলেন বাড়ির ভেতর। রবীন্দ্রনাথ আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে তার নাম জিজ্ঞেস করলেন। গেদু মিয়া ঘরে ঢুকেই আদাব দিলেন রবীন্দ্রনাথ কে এবং তার নাম বলাতে রবীন্দ্রনাথ যখন জানলেন গেদু মিয়া জাতে মুসলমান তখন তিনি মৃদুস্বরে বললেন- ‘শোনো আমার কাছে জাত পাত বলে কিছু নেই। কিন্তু আমার রান্নাঘরে আরো দুজন বাবুর্চি আছে একজন ব্রাহ্মণ অন্যজন উড়িয়া। ওরা এখন থেকে আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য রান্না করবে আর শুধু তুমি রান্না করবে আমার। তবে তুমি খুব সাবধানে থাকবে, ব্রাহ্মণ ও উড়িয়া পাচক দুজনের কাছে নিজের নাম পরিচয় গোপন রাখবে। কোনোক্রমেই তারা যেন ঘুণাক্ষরে জানতে না পারে তুমি মুসলমান। তাদের বলবে তুমি বাঙালি রবীন্দ্রনাথের ধর্মই তোমার ধর্ম। একথা বলেই রবীন্দ্রনাথ তার ছেলের বউ প্রতিমাকে ডেকে এনে গেদু মিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাকে রান্নাঘরে নিয়ে যেতে বলেন। এসবেই শুরু হলো গেদু মিয়ার রবীন্দ্রনাথের পাচক ও বাবুর্চি হিসেবে তার নতুন কাজের জীবন।
রবীন্দ্রনাথের রসুইঘরে ঠাঁই পাওয়ার এক মাসের মাথায় গেদু মিয়াকে চলে আসতে হয় কালিম্পয়ে। সঙ্গে তার ছেলে রথীন্দ্রনাথও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। তারা সপরিবারে উঠেছিলেন ময়মনসিংহের গৌরীপুরের মহারাজার বাড়িতে। গৌরীপুরে মাস তিনেক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই কিশোর বালককে উত্তর বঙ্গের নানা জায়গায়। ঈশ্বর দি স্টেশনের কথা মনে পড়ে গেদু মিয়ার। রবীন্দ্রনাথকে একনজর দেখার জন্য প্রচণ্ড ভিড় হয়েছিল স্টেশনে। সঙ্গে ছিলেন পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ও ছেলে রথীন্দ্রনাথসহ আরো অনেকে। সেবার তাকে কুষ্টিয়ার তৎকালীন রানা ঘাটেও যেতে হয়েছিল। মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন, মানুষও গভীরভাবে তাকে ভালোবাসত।
একবার গেদু মিয়ার সঙ্গে সেই উড়িয়া ও ব্রাহ্মণ পাচক একটু দুর্ব্যবহার ও ঝগড়াঝাঁটি করার পর রবীন্দ্রনাথকে বলায় তাদের রবীন্দ্রনাথ এই বলে শাসিয়ে ছিলেন তারা যদি গেদু মিয়ার সঙ্গে কোনো রকম দুর্ব্যবহার করে তাহলে, তাদের দুজনকেই চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হবে। এরপর ভয়ে উভয়েই পাচক তার সঙ্গে আর কোন দুর্ব্যবহার ও ঝগড়াঝাঁটি কখনো করেনি। একবার রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে কথা অকপটে বলেছিলেন গেদুমিয়া। তার জন্ম দিনে সেখানেও লোক জনের কমতি ইে কবির জন্য উপহার হিসেবে অনেকে অনেক কিছু নিয়ে আসতেন। কেউ কেউ কবিকে মিষ্টি মুখ করাতেন। কবি নামে মাত্র মিষ্টি খেয়ে সেগুলো সবার কাছেই বণ্টন করে দিতেন। মিষ্টির হাঁড়ি তার পাচকদের হাতে ও তুলে দিতেন। রবীন্দ্রনাথ বলতেন ‘গেদু মিয়া সব সময় সাবধানে থাকবে। পাচকদ্বয় যেনো ঘুণাক্ষরে জানতে না পারে তুমি মুসলমান। আমার কাছে সব ধর্মের মানুষই সমান। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। হিংসা, বিদ্বেষ সব সময় পরিহার করে চলবে ও মানুষকে ভালোবাসবে। মানুষের কাছে মানুষের শ্রেষ্ঠ দান হলো মানবতা ও প্রীতি ভালোবাসা। মানুষের মনুষত্ব বোধ থাকতে হবে।’ যতদিন তার কাছে গেদু মিয়া ছিলেন এ উপদেশ মনে রাখার চেষ্টা করেছেন।
১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত দুবছর রবীন্দ্রনাথের বাবুর্চি ছিলেন এ বাঙালি যুবক। ১৯৪০ সালের পর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঘনঘন অসুস্থ হতে থাকেন। সে সময় তাকে বাবুর্চির কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে চলে যান। যাবার সময় গেদু মিয়াকে রবীন্দ্রনাথ একটা সার্টিফিকেট বা প্রশংসাপত্র দিয়েছিলেন নিজ হাতে লিখে। এ কিশোর পাচক রবীন্দ্রনাথকে যে সব পাত্রে স্যুপ রেধে খাওয়াতেন তার বিদায় বেলায় সেসব পাত্র থেকে একটা পাত্র (স্যুপজার) স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে তাকে উপহার দিয়েছিলেন। সঙ্গে উপহার দিয়েছিলেন একটা দামি হুকোও। বিদায়ের দিন তাকে বলেছিলেন আমার তো দিন শেষ গেদু মিয়া, আমি এখন পুরোপুরি ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে চলে যাচ্ছি, আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোমাকে বিদায় দিতে হচ্ছে। উড়িয়া এবং ব্রহ্মণ পাচক দুজনকেই একই কারণে বিদায় করে দিচ্ছি। পরে গেদু মিয়াকে আবার ফিরে আসতে হয়েছিল সেই ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। এবার তিনি ফিরে এসেছিলেন সাহেবের পাচক হিসেবে নয়, বাগানের মালি হিসেবে। গেদু মিয়া তার স্মৃতি হাতড়ে স্বভাব সুলভ নম্র ভঙ্গিতে বলেছিলেন সে সময় ১৯৪০ সালের শুরুর দিকে কলকাতায় হিন্দু মুসলমানের প্রচণ্ড দাঙ্গা শুরু হয়। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনার শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তি নিকেতনে, তিনি আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ‘উড়িয়া ও ব্রহ্মণ বাবুর্চি যেন কোনো ক্রমেই জানতে না পারে যে তুমি মুসলমান’।
কবি যখন বিদেশে বেড়াতে যেতেন তখন সঙ্গে ট্রাংক নিয়ে যেতেন সেটাতে থাকতো রবীন্দ্রনাথের প্রয়োজনীয় বই পত্রে ঠাসা। গেদু মিয়ার সঙ্গে গল্পের ছলে একদিন রবীন্দ্রনাথ মুসলমান সমাজের নানা সমস্যা ও সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার কথা বলতে বলতে তিনি বলেছিলেন, ‘সংখ্যায় বাঙালি হিন্দুদের চাইতেও মুসলমান বাঙালির সংখ্যা বেশি তবু তাদের মধ্যেই নব জাগরণের কোনো চিহ্ন মাত্র নেই। তবে আমি মুসলমানদের মধ্যে একজনের দেখা পেয়েছি তাকে দিয়ে যদি কিছু হয় তিনি হলেন ফজলুল হক (শেরে বাংলা)।’
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলেন গেদু মিয়া লোক মারফত। তখন তিনি কলকাতায় ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ গ্রেগরীর ওখানে কর্মরত। চারদিকে তখন থম থমে ভাব। সারা কলকাতা শহর ভেঙে পড়েছিলে সে সময় চারদিকে লোকারণ্য। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট দম্পতিকে গেদু মিয়া ভয়ানক বিষণ্ন হতে দেখেছিলেন। মনের গভীরে অজান্তে তারও দুচোখ অশ্রুতে ভিজে উঠেছিল সে সময়।
১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর কলকাতা থেকে ব্রহ্মণবাড়িয়া যাত্রা করে গেদু মিয়া। রানা ঘাটে আসার পর তিনি দাঙ্গাবাজদের কবলে পড়েন। তার সঙ্গে নগদ টাকা-পয়সা, কিছু কাপড়-চোপড় ও সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া প্রশংসা পত্রটি নিয়ে যায় দাঙ্গা বাজরা। তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথের দেওয়া শুধু সেই স্যুপজার এবং হুকোটি। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য সেই দুটি স্মারক তিনি ১৯৭৫ সালে দান করেছিলেন জাতীয় জাদুঘরে। বর্তমানে সেগুলো জাতীয় জাদুঘরে আছে কিনা জানা যায় না।
গেদু মিয়ার পারিবারিক দাম্পত্য জীবন ছিল সুখের। তিনি ছিলেন দুছেলে ও দুমেয়ের জনক। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন আমাদের ব্রহ্মণবাড়িয়া জেলায় ১৯১৬ সালে এবং মারা যান ২০০১ সালের ২৯ অক্টোবর এ নিজ জেলাতেই। ১৯৬৬ সালের দিকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে একটা ছোটখাটো চাকরি নেন। সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮৩ সালের দিকে বিরোধী দলে থাকার সময় বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গেদু মিয়ার একবার দেখাও হয়েছিল। তিনি তার হাতের সেলাই করা কিছু সুচের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর শেষ জীবনে ঢাকার গ্রিন রোডের গ্রিন সুপার মার্কেটের দোতলায় সেলাইয়ের কাজ করতেন চোখে পুরু লেন্সের চশমা লাগিয়ে।
তিনি তার বাড়ির আশপাশের প্রাঙ্গণকে জীবদ্দশায় পরিণত করেছিলেন একটা মনোরম উদ্যানে। সহজ সরল জীবনে অভ্যস্ত গেদু মিয়া নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও রোজা পালন করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে। ছিলেন স্বল্পভাষী। নিজ এলাকার কারো সঙ্গে তার কোনো ধরনের মনোমালিন্য ও বিবাদ বিসম্বাদ ছিল না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে আমাদের জানামতে তিনিই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রান্নাঘরে ঠাঁই পাওয়া একমাত্র মুসলমান বাঙালি বাবুর্চি।
কেকে/এমএ