দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে সুদানে। রাজধানী খার্তুম থেকে পশ্চিম দারফুর পর্যন্ত পরিণত হয়েছে আগুন, রক্ত আর ধ্বংসস্তূপে। দেশটিতে সামরিক বাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনীর মধ্যে চলা লড়াইয়ে বলি হচ্ছে মানুষ। প্রতিদিনই হত্যার শিকার হচ্ছেন কেউ না কেউ। জীবন বাঁচাতে আবার অনেকে পালিয়ে ছাড়ছেন এলাকা। জাতিসংঘ এই পরিস্থিতিকে আধুনিক সময়ের ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
সংস্থাটি বলছে, সুদানে এখন চলছে আধুনিক সময়ে ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি। ইতোমধ্যে দেড় লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ নাগরিক। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা যাচ্ছে বিশাল এলাকাজুড়ে পোড়া ঘরবাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দেহাবশেষ। শুধু এল-ফাশের থেকেই পালিয়েছে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। কিন্তু এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ও যেন বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না।
যেভাবে শুরু সুদানের গৃহযুদ্ধ
সুদানের বর্তমান অস্থিতিশীলতার সূত্রপাত ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরের পতনের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকা বশিরকে সরাতে সেনাবাহিনী ও বেসামরিকদের বিক্ষোভে দেশ কেঁপে ওঠে। সেনারা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতা নেয়, পরে জনগণের চাপের মুখে বেসামরিকদের সঙ্গে যৌথ সরকার গঠন করে।
কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবরে আরেকটি অভ্যুত্থান এই সরকারকেও উৎখাত করে। এই অভ্যুত্থানের নেপথ্যে ছিলেন জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান, সেনাপ্রধান ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট, এবং জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো, যিনি আরএসএফের কমান্ডার—জনপ্রিয় নাম হেমেডটি।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদানের সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই শুরু হয়। সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগালো (হেমেডটি)—দুজনেই একসময় ছিলেন সহযোগী। ২০২১ সালে তারা একসঙ্গে বেসামরিক সরকার উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে আরএসএফ বাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে আনার প্রশ্নে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।
সম্প্রতি আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দখল করেছে দারফুরের এল-ফাশের শহর। এটি ছিল সেনাবাহিনীর শেষ শক্ত ঘাঁটি। আরএসএফের হাতে শহরটি পড়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট—যা জাতিসংঘের চোখে স্পষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধ। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে বিশাল এলাকাজুড়ে পোড়া ঘরবাড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দেহাবশেষ। জাতিসংঘের হিসাব বলছে, শুধু এল-ফাশের থেকেই পালিয়েছে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ।
এই লড়াই প্রথমে রাজধানী খার্তুমে সীমাবদ্ধ থাকলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম দারফুর, কোরদোফান ও অন্যান্য অঞ্চলে। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে ভারী কামান, ড্রোন ও ট্যাংক। শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, এমনকি জাতিসংঘের ত্রাণকেন্দ্র পর্যন্ত আক্রমণের শিকার হয়েছে।
দারফুরে গণহত্যা
দারফুর অঞ্চলটি সুদানের দীর্ঘ ইতিহাসে বহুবার রক্তপাতের সাক্ষী। ২০০৩ সালে ওমর আল-বশির সরকারের সময় এই অঞ্চলে চালানো গণহত্যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল। সেই একই মাটি আবার আজ রক্তে রঞ্জিত।
আরএসএফ বাহিনী, যারা মূলত সেই সময়ের জাঞ্জাউইদ মিলিশিয়া থেকে বিকশিত হয়েছে, এখন দারফুরে অ-আরব জনগোষ্ঠী মাসালিত ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ওপর তীব্র সহিংসতা চালাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, আরএসএফ ও তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, পুরুষদের গুলি করে হত্যা করছে এবং নারী-শিশুদের ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ চালাচ্ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানায়, কেবল এল-ফাশের শহর থেকেই ৬০ হাজারের বেশি মানুষ পালিয়ে গেছে। ডজন ডজন গণকবরের সন্ধান মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন—‘দারফুরে যা ঘটছে, তা নিঃসন্দেহে গণহত্যা।’
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ছায়াযুদ্ধ
এই যুদ্ধ কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাত নয়; এটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। সুদানের সেনাবাহিনীকে মিসর সমর্থন দিচ্ছে, অন্যদিকে আরএসএফ পাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)-এর অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বেশকিছু গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরএসএফ বাহিনী লিবিয়া ও মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মাধ্যমে আমিরাত থেকে ড্রোন ও অস্ত্র পাচ্ছে। সেনাবাহিনী বলছে, এই সহায়তাই আরএসএফকে সামরিকভাবে প্রাধান্য দিচ্ছে। যদিও আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে সুদানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান—রেড সি করিডর ও আফ্রিকার বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিসেবে—এই সংঘাতে বিদেশি আগ্রহ বাড়িয়েছে। ফলে, এই যুদ্ধ এখন কেবল দুই জেনারেলের লড়াই নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার প্রভাব বিস্তারের এক ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা পরোক্ষ যুদ্ধ।
মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা
সুদানের অবস্থা এখন এক মানবিক দুঃস্বপ্ন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে—যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষুধা সংকটগুলোর একটি। প্রায় ৮০% স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে বা অচল। নারী ও শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, দারফুর অঞ্চলের অনেক এলাকায় ত্রাণ পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে কারণ রাস্তা ও বিমানবন্দর আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে। মানবিক সংস্থার কর্মীরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। এমনকি জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদেরও হত্যা বা অপহরণের খবর পাওয়া গেছে।
দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। হাজার হাজার শিশু অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে। যেসব পরিবার একসময় কৃষিকাজে জীবিকা নির্বাহ করত, তারা এখন আশ্রয় শিবিরে বেঁচে থাকার জন্য অল্প কিছু রুটির ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্বের নীরবতা: এক নৈতিক ব্যর্থতা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নির্লিপ্ততা। ইউক্রেন বা গাজায় সংঘাতের মতো বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া সুদানের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এই বিপর্যয় তুলনামূলকভাবে অল্প জায়গা পাচ্ছে, আর বড় শক্তিগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে নীরব রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘সুদানে যা ঘটছে তা মানবতার জন্য লজ্জার।’ তবু নিরাপত্তা পরিষদে এখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মানবিক সহায়তা পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছে বিশ্ব, কারণ কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত নয়।
বিশ্বের নীরবতা এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। যখন গণহত্যা চলছে, তখন ‘রাজনৈতিক ভারসাম্য’ রক্ষার নামে নীরব থাকা মানে নৈতিকভাবে অপরাধে অংশ নেওয়া।
বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক দায়িত্ব
সুদানের মতো দেশগুলোর বিপর্যয় কেবল তাদের অভ্যন্তরীণ নয়; এটি গোটা বিশ্ববাসীর জন্য একটি বার্তা। বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের কণ্ঠস্বরও এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে আরও জোরালো হওয়া উচিত। কূটনৈতিকভাবে ও আন্তর্জাতিক ফোরামে সুদানের গণহত্যা বন্ধে সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
মানবতার প্রশ্নে জাতিসংঘ, আফ্রিকান ইউনিয়ন, আরব লিগ—সবাইকে একত্র হয়ে শান্তির পথ খুঁজতে হবে। এখনই যদি পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সুদান ভেঙে যাবে কয়েকটি খণ্ডে, আর লাখ লাখ মানুষ হারাবে তাদের ভবিষ্যৎ।
কোথায় মানবতা?
জাতিসংঘ জানিয়েছে, সুদানে এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট চলছে। প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত—যা ইউক্রেন ও গাজা মিলিয়েও তার চেয়ে বেশি। প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব, যাদের মানবাধিকারের বুলি এত জোরালো, তারা যেন সুদানের নাম ভুলে গেছে।
গাজা বা ইউক্রেন নিয়ে প্রতিদিন সংবাদ শিরোনাম হয়, কিন্তু দারফুরের মৃত্যুর খবর তেমন করে সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে না। এটি আমাদের বিবেকের ওপর এক গভীর দাগ রেখে যায়।
সুদানের এল-ফাশেরে যা ঘটছে, তা শুধু এক দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়—এটি মানবতার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
আজ যদি আমরা নীরব থাকি, আগামীকাল এই আগুন অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়বে। গণহত্যার ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং তা অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ানো। যখন কোনো গণহত্যা ঘটে, তখন বিশ্ব পরাশক্তি প্রথমে নীরব থাকে, পরে অনুতপ্ত হয়। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় এমন নীরবতাই লাখো প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।
সুদানে চলমান এই মানবিক নৃসংসতা ও গণহত্যা রোধে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক জবাবদিহি, মানবিক সহায়তা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিরবচ্ছিন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। কারণ প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি বিলম্ব, প্রতিটি অনীহা—আরও কিছু প্রাণের মৃত্যু ডেকে আনছে।
লেখক : সহ-সম্পাদক, ডেইলি সান