আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সমানে রেখে ২৩৭টি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে বিএনপি। গত সোমবার গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালে এক সংবাদ সম্মেলনে মনোনয়নপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তবে প্রার্থী ঘোষণার পরই কয়েকটি আসনে তুমুল ক্ষোভ দেখা দেয়। কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এরই মধ্যে বিতর্কিত এক নেতার প্রার্থিতা স্থগিত করেছে দলটি। অনেক আসনে প্রার্থিতা বদলের আন্দোলন এখনো চলছে। এ ঘরোয়া দ্বন্দ্বের রাশ টানতে না পারলে অনেক আসন হাতছাড়া হতে পারে বলে শঙ্কা করছেন নেতাকর্মীরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্কিত আসনগুলোতে প্রার্থী নির্বাচনে পুনর্মূল্যায়ন চলছে বলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিষয়টি তদারকি করছেন।
প্রার্থী ঘোষণা পরদিন, অর্থাৎ গত মঙ্গলবার বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ থেকে অন্তত দশ জেলায় বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, সড়ক-রেলপথ অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মেহেরপুরে দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। অভিযোগ রয়েছে, বেশ কয়েকটি আসনে তৃণমূলে জনপ্রিয় নেতাকে উপেক্ষা করে হাইব্রিড, উড়ে এসে জুড়ে বসা প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম ঘনিষ্ঠদের মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মাঠে রাজনীতিকদের চেয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সবসময় তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সৎ, জনপ্রিয় ও মাঠে নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হলে ওই আসনে পাস করে আসা সহজ। এ বাইরে যদি সুযোগসন্ধানীরা মনোনয়ন পায়, তাহলে নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চারিত হয় এবং সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এর সুযোগ নেবে প্রতিপক্ষ, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী। তার ভুল প্রার্থী বাছাইয়ে আসন হারানোর শঙ্কা দেখা দেয়।
বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, বর্তমান প্রার্থী তালিকাটি চূড়ান্ত নয়। এটি সম্ভাব্য তালিকা। আসনগুলোতে আরো যাচাইবাছাই চলছে। সৎ, যোগ্য ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেবে বিএনপি।
সূত্র বলছে, ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা পর বেশি কিছু আসনে অসন্তোষের বিষয়টি বিএনিপর শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে এসেছে। এ ছাড়া কোনো কোনো আসনে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম ঘনিষ্ঠতের মনোনয়নের বিষয়টিও হাইকমান্ডের নজরে এসেছে। সব মিলিয়ে সার্বিক বিষয় নিয়ে দলের উচ্চ ফোরামে আলোচনা হয়েছে। এরপরই বিতর্কিত আসনগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবছে দলের শীর্ষ মহল।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিতর্কিত আসনে প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে। এ নিয়ে দলটি কাজও শুরু করে দিয়েছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আসনভিত্তিক একাধিক জরিপ চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত গুরুত্ব পাবে। স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির অগ্রাধিকার থাকবে। বিতর্কিতরা কোনোভাবেই মনোনয়ন পাবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা বলেন, গত ১৭ বছর ধরে সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা অনেক ত্যাগ শিকার করেছেন। তাদের মূল্যায়নের সময় এসেছে। বিএনপিও তাদের মূল্যায়ন করতে চায়। তাই হাইব্রিড ও সুযোগ সন্ধানীরা কোনোভাবেই সুযোগ পাবে না।
এর আগে প্রার্থী ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়াটি আসে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) থেকে। এ আসনে ‘হেভিওয়েট’ নেতা আসলাম চৌধুরীর বদলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আসলামের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সালাহউদ্দিন। এতে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা আন্দোলনের পাশাপাশি গণপদত্যাগের ঘোষণাও দিয়েছেন। আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তার অনুসারীরা গত সোমবার রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এ ছাড়া একাদিক জেলায় প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য বিক্ষোভ করছেন নেতাকর্মীরা। এদিকে নোয়াখালী-৫ আসনে মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম ঘনিষ্ঠ বলে জানা গেছে।
কেকে/এআর