জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের দাবিতে দেশের রাজনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও এর সমমনা রাজনৈতিক দল চায় জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হোক। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাবি নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে হবে। এ দাবিসহ ৫ দফা দাবিতে জামায়াতসহ ৮টি ধর্মভিত্তিক দল আন্দোলনও চালিয়ে যাচ্ছে। গণভোট প্রশ্নে উভয় পক্ষই নিজ নিজ দাবিতে অনড় অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোট প্রশ্নে বিএনপি-জামায়াতের বিপরীতমুখী অবস্থান দেশকে সংঘাতের মুখে ফেলতে পারে। যা নির্বাচনকে ব্যাহত বা পিছিয়ে দিতে পারে। এরই মধ্যে দুই দলের দিক থেকেই আক্রমণাত্মক বক্তব্য আসছে। যা সংঘাতকে উসকে দেবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কথায় কথায় আপনি রাস্তায় যাবেন। এখন অন্য দল যদি তার প্রতিবাদে আবার রাস্তায় যায়, তাহলে কী হবে, সংঘর্ষ হবে না? বৃহত্তর দল বাংলাদেশে যদি রাস্তায় নামে এগুলোর প্রতিবাদে, সংঘর্ষ হবে।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সাংঘর্ষিক রাজনীতি দেখতে চায় না, স্থিতিশীলতা দেখতে চায়।
গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে ট্রেস কনসালট্যান্সি নামে এক সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনি ইশতেহার প্রণয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে সংলাপে আমীর খসরু এ কথাগুলো বলেন। বিএনপি নেতা কোনো দলের নাম উল্লেখ করেননি। তবে গণভোট আগে করাসহ পাঁচ দাবিতে রাজপথে নানা কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের সেই আন্দোলনেক নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছেন বিএনপির নেতারা।
আমীর খসরু আরো বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে যে যতটুকু ঐকমত্য হয়েছে, তার বাইরে গিয়ে আবার নতুন ইস্যু সৃষ্টি করলে কিন্তু ঐকমত্যের শ্রদ্ধা দেখানো হচ্ছে না। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ঐকমত্য হতে হবে।’ বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘শেখ হাসিনার গত ১৭ বছরের শাসনে আমাদের মধ্যে একটা স্বৈরাচারী মনোভাব চলে আসছে। আমরা মনে করি যে আমার দফা, আমার দাবি, আমার চিন্তা না থাকলে এটাকে গ্রহণ করা যাবে না।’ যতটুকু ঐকমত্য হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হবে বলেন আমীর খসরু। যেগুলোয় ঐকমত্য হয়নি, তা জনগণের কাছে নিয়ে যেতে হবে বলে মত দেন তিনি। ঐকমত্যের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে জানান এ নেতা।
গণভোট প্রসঙ্গে বিএনপির এ নেতা বলেন, এ সরকার সংবিধানের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয়েছে। সেই সংবিধানে গণভোটের কিছু নেই। যদি গণভোট করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুসারে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে এসে সংসদে পাস করার পরে সেই বিষয়গুলো গণভোটে যেতে পারে। এসব করে অনেকে নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে চায় বলে মন্তব্য করেন আমীর খসরু।
এদিকে বিএনপির এখনকার আচরণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ নিয়ে জামায়াতের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল এক সংলাপে তিনি এই মন্তব্য করেন।
হামিদুর বলেন, ‘বিএনপির মহাসচিবকে আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু ওনারা বলেছেন, জামায়াতের আহ্বানে তারা সাড়া দেবেন না। বিগত রেজিম কিন্তু এ ধরনের সুর সব সময় বাজাত যে ওমুকের সঙ্গে বসবে না। এই কালচার থেকে কি বের হতে পারি না? বিএনপি যদি আহ্বান করে জামায়াত যাবে এবং অন্যদেরও আহ্বান জানাবে।’ পাঁচ দফা দাবিতে রাজপথে নামার বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়াত আগে থেকেই মাঠে আছে, হঠাৎ করে আসেনি। আলোচনা এবং রাজপথে নিজেদের দাবি জানানো সমানভাবে চলছে।
এদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গণভোটের দাবি কোনো রাজনৈতিক দলের চাপের মুখে উপেক্ষা করলে জাতীয় নির্বাচন সংকটের মুখে পড়তে পারে। অবিলম্বে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করতে হবে এবং গণভোটের তারিখ ঘোষণা করতে হবে।
জামায়াতের এ নেতা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই গণভোটের তফসিল ঘোষণা হওয়া জরুরি, এটিই হচ্ছে গণদাবি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে যেসব সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলোর সেই সব বিষয়ে এখন ভিন্নমত পোষণ করা অথবা নোট অব ডিসেন্টকে গণভোটে যুক্ত করার দাবি হচ্ছে অন্যায় দাবি।
কেকে/এআর