ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪ | ২ শ্রাবণ ১৪৩১

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

কোটাবিরোধী আন্দোলনে স্থবির ঢাকা, ভোগান্তি চরমে

অনলাইন ডেস্ক
🕐 ৩:৫২ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০২৪

কোটাবিরোধী আন্দোলনে স্থবির ঢাকা, ভোগান্তি চরমে

সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সারাদেশে চালিয়ে যাচ্ছেন এ কর্মসূচি। বুধবার (১০ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে রাস্তায় নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ে স্থিতাবস্থার প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই।

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের পরিপত্র ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর একমাসের স্থিতাবস্থা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ফলে কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে জারি করা পরিপত্রটি বহাল থাকছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। বুধবার (১০ জুলাই) দুপুরে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এ আদেশ দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ (এএম) আমিন উদ্দিন জানান, আপিল বিভাগ স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দিয়েছেন। ফলে যা ছিল, তা-ই থাকবে। অর্থাৎ, কোটা বাতিল নিয়ে ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল থাকছে।

কোটা নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর এক মাসের স্থিতিবস্থার আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। তিনি বলেন, প্রতিবাদকারীরা চাইলে আদালতে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে নিতে ভিসিদেরও উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষের দুর্ভোগ হয় এমন কর্মসূচি পরিহার করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। বুধবার দুপুরে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ অনুরোধ জানান। আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে আদালতে চূড়ান্ত শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে কোটা সংস্কার। এ পর্যন্ত মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে এমন কর্মসূচি বন্ধ করে আদালতের নির্দেশ মেনে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

শিক্ষার্থীরা আসার পর শাহবাগ ছেড়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ

কোটাবিরোধী দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মিছিল শাহবাগ মোড়ে আসার পর পুলিশের অনুরোধে ওই এলাকা ছেড়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। বুধবার (১০ জুলাই) দুপুর ১২টার কিছু আগে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শাহবাগে মোড়ে এসে অবরোধ করলে পুলিশের অনুরোধে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থানকারীরা চলে যান। শিক্ষার্থীদের মিছিল আসার সময় জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান করছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডসহ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় উভয়পক্ষকেই উত্তপ্ত স্লোগান দিতে দেখা যায়। এর আগে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে টিএসসি ঘুরে আসেন সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা।

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা শিক্ষার্থীদের

মুক্তিযোদ্ধা কোটা ইস্যুতে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর আপিল বিভাগের এক মাসের স্থিতাবস্থার মধ্যে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পক্ষে এই ঘোষণা দেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকা কলেজ শাখার সমন্বয়ক নাজমুল হাসান।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকা। দুপুর ১২টার দিকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যাতাযাত ব্যবস্থা। বাসসহ অন্যান্য যানবাহন প্রধান সড়কগুলোয় আটকা পড়েছে। পুরো নগরজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র যানজট। অনেকে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওয়ানা দিচ্ছেন।

কারওয়ানবাজারে রেললাইনের ওপর বসে পড়লেন শিক্ষার্থীরা

রাজধানীর কারওয়ানবাজারে রেললাইনের ওপর বসে পড়েছেন কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাদের অবরোধের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। দুপুর ১টার দিকে কয়েকশো আন্দোলনকারী অবস্থান নেন কারওয়ানবাজার সংলগ্ন রেললাইনের ওপরে। এসময় তারা রেললাইনের দুই পাশে কাঠের স্লিপার দিয়ে রেললাইনের ওপরে বসে পড়েন। এতে বেলা ১১টার পর কমলাপুরের সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

শিক্ষার্থীদের অবরোধে অচল শাহবাগ

বেলা ১১টার পর থেকে সর্বাত্মক ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শাহবাগ মোড়ে আসতে থাকেন শিক্ষার্থীরা৷ দুপুর পৌনে ১২টায় শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। বন্ধ হয়ে যায় চলাচল। এর আগে সকাল ১০টায় তারা জড়ো হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হল ও বিভাগ থেকে মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন। সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে হলপাড়া-মুহসিন হল-ভিসি চত্বর-টিএসসি হয়ে শাহবাগে যান তারা। এরপর শাহবাগ মোড় অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা।এ সময় ওই এলাকায় আটকা পড়ে অনেক যানবাহন। যাত্রীদের গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে যেতে দেখা যায়।

গুলিস্থান-পল্টনে যান চলাচল বন্ধ

গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট মোড় ও পল্টন মোড় অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। গুলিস্তানের নুর হোসেন চত্বর দিয়ে সব ধরনের যানবাহন বন্ধ আছে। শিক্ষার্থীরা সকাল ১০টার পর থেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে এই মোড়। গুলিস্তান মোড়ে শিক্ষার্থীরা চারপাশে বৃত্তাকার হয়ে বসে পড়েছেন। শিক্ষার্থীরা দখলে নিয়েছেন পল্টন মোড়ও। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শ্যামপুর, জুরাইন, পুরান ঢাকার লোকজন ঢাকার অন্যান্য অংশের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এই জিরো পয়েন্ট মোড় ব্যবহার করেন। কিন্তু চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন দিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে জিরো পয়েন্টের আশপাশের সড়কে থেমে থাকতে দেখা যায়।

আগারগাঁও ব্লকেড, মিরপুর বিচ্ছিন্ন

আগারগাঁও মোড়ের চারটি রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এতে মিরপুর থেকে গাড়ি আসা-যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। শ্যামলী বা বিজয় সরণির দিকেও যাচ্ছে না কোনো গাড়ি। যে গাড়ি যেদিক থেকে এসেছে, সেদিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় মিরপুর ও গাবতলীর পথে চলাচলের সড়কটি দিয়েও যান চলাচল ব্যাহত হয়। জরুরি প্রয়োজনে পায়ে হেঁটে ও গলি পথ ধরে রিকশায় যাতায়াত করছেন পথচারীরা।

মহাখালী-বনানীর রাস্তা বন্ধ

অন্দোলনে মহাখালী থেকে বনানী পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ। যানবাহন না চলার কারণে অনেকে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। অনেকে যানজটে দীর্ঘ সময় গাড়িতে বসে রয়েছেন আশেপাশের রাস্তায়। ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। এনামুল হক নামের একজন বলেন, কাজের সময় এভাবে একটানা এক জায়গায় বসে আছি। বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। সকাল ১০টা থেকে এখনো যানজটে আটকে আছি। এখনো জানি না কখন রাস্তা ছাড়বে। এ রকম আর কত দিন চলবে?

অনেক রাস্তা আবার ফাঁকা

এদিকে একই সময় রামপুরা থেকে শান্তিনগর, কাকরাইল পর্যন্ত রাস্তায় যানজট ছিল না। রাস্তার পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখা গেছে। প্রতিদিনের মতো আবুল হোটেলের মোড় ও মেরুল বাড্ডা এলাকায় যানবাহনের চাপ বেশি ছিল। এ রাস্তায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চোখে পড়েনি।

জরুরি কাজ ছাড়া আজ সকাল থেকে রাজধানীতে সড়কে বের হননি অনেকেই। এ কারণে বেশিরভাগ সড়ক রয়েছে অনেকটা ফাঁকা। কোথাও কোনো সিগন্যাল ছাড়া পার হতে পারছে যানবাহন। সড়কে বাসসহ অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যাও কম চলাচল করতে দেখা গেছে।

সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পূর্বনির্ধারিত স্থানে, এমনবি মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সড়কে ব্যারিকেড প্রস্তুত রেখেছে পুলিশ। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। এ বিষয়ে ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, সকাল থেকে সতর্ক পুলিশ। মানুষ ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কেউ যাতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে সে জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া আছে।

 
Electronic Paper