২১ ফেব্রুয়ারির সকাল

ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

২১ ফেব্রুয়ারির সকাল

শামীম খান যুবরাজ ২:০১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১

print
২১ ফেব্রুয়ারির সকাল

জিসানের দাদা অনেক বছর ধরে প্রবাসে থাকেন। পেশায় ডাক্তার। সৌদি আরবের খামিস মোশাইত শহরে শিফা আল-খামিস হাসপাতালের প্রধান ডাক্তার তিনি। দাদার চাকরির সুবাদে জিসান ও তার বাবা-মা বেশ ক’বছর ধরে বসবাস করছেন একই শহরে। বাবা ব্যবসা করেন আর মা ঘরের কাজ দেখা দেখাশোনা করেন। জিসান পড়ে ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজে। বাসায় দাদার কাছে বাংলা পড়ে। আজ স্কুল থেকে ফিরে দাদাকে প্রশ্ন করে জিসান- দাদা, কাল তো ২১ ফেব্রুয়ারি। কাল সারা বিশ্বে পালিত হবে একটি বিশেষ দিন এবং দিনটির সঙ্গে আমাদের দেশের ইতিহাস জড়িত।

: হ্যাঁ জিসান, কাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশের গুলিতে শহীদ হন বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা।
: দাদা জানো, ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস থেকে আজ পাকিস্তানের একজন শিক্ষক ক্লাসে আলোচনা করেছেন। আলোচনা করতে গিয়ে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সমালোচনাও করেছেন। আমি সেদিনের পুরো ইতিহাস জানতে চাই।
: অবশ্যই জানবে জিসান। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ অনেকে শহীদ হয়েছিলেন সেদিন। তাই আমরা দিবসটিকে শহীদ দিবস হিসেবেই পালন করে আসছি। তারপর দিবসটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। সারাবিশ্বে এটি পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।
: পাকিস্তান সরকার কেন এমন করেছিল?
: তারা চেয়েছিলো রাষ্ট্রভাষা উর্দু বাংলাদেশিদের ওপর চাপিয়ে দিতে। বাধ্য করতে চেয়েছিলো সর্বস্তরে উর্দুর ব্যবহার। কেড়ে নিতে চেয়েছিল আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলাকে, আমাদের মায়ের ভাষাকে। কিন্তু আমরা মানিনি। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে আমাদের ছাত্ররা। পুলিশের গুলিতে ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়। আমার ভাইয়েরা জীবন দিয়ে যেমন মায়ের ভাষাকে রক্ষা করেছেন তেমনি স্বাধীনতার পথকে করে গেছেন সুগম।
দাদার মুখে ১৯৫২ সালের ইতিহাস শুনে আরও কৌতূহলী হয়ে ওঠে জিসান। প্রবাসে থেকেও নিজের দেশের জন্যে গর্বে ফুলে ওঠে বুক। প্রিয় বাংলাদেশের জন্য মনটা হু হু করে কেঁদে ওঠে তার।
রাতে ইন্টারনেট ঘেঁটে ভাষা দিবস সম্পর্কে আরো অনেক কিছু শিখল জিসান। শহীদ মিনারের ছবি ডাউনলোড করল। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটিও ডাউনলোড করল। তারপর রাত জেগে ককশিট কেটে শহীদ মিনারের আকৃতিতে তৈরি করে ফেলল একটি শহীদ মিনার। মাঝে লাল সূর্য বসানো হলো।
খুব ভোরে সবাই যখন জাগল। জিসান সবাইকে ডেকে আনল ছাদে। তার তৈরি শহীদ মিনারটি ছাদের একপাশে বসানো হলো। দাদা, বাবা ও মা যখন ছাদে এলেন জিসানের অনুরোধে সবাই পা থেকে জুতো খুলে ফেললেন। ছাদের টব থেকে তৈরি একটি গাঁদা ও গোলাপ ফুলের মালা এগিয়ে দিলো সবাইকে। সবাই অবাক চোখে ছোট্ট জিসানের একুশে উদযাপন দেখে যাচ্ছেন। কারও মুখে কোনো কথা নেই। অভিভূত সবাই। দাদা, বাবা ও মা যখন ফুলের মালা নিয়ে জিসানের তৈরি শহীদ মিনারের দিকে যাবেন তখনি জিসানের রেকর্ডারে বেজে উঠল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’।
প্রভাতফেরি শেষ হলে দাদা সবার বুক পকেটে কালো কাপড়ের ব্যাজ পরিয়ে দিলেন। বাবা ও মা ছেলের এমন দেশপ্রেম দেখে জিসানকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন জিসানের দাদা। এমন দৃশ্যে দাদার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল সাদা দাড়ি ছুঁয়ে। ২১ ফেব্রুয়ারির সকালবেলা এক আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হলো খামিস মোশাইতের এই বাড়িতে।