ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা

ঢাকা, শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১৫ ফাল্গুন ১৪২৭

ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা

আনিসুর রহমান ১:৫০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১

print
ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা

আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। রনির বাবার অফিস বন্ধ। তাই সে বাবার সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছে। প্রত্যেক ছুটির দিনেই কোথাও না কোথাও ঘুরতে যায় তারা। আজ বাবার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ওর স্কুলে পৌঁছে গেছে। রনি এই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাবাকে তার স্কুলটি দেখিয়ে বলল, ‘দেখ, বাবা আমার স্কুলটি কত্ত সুন্দর।’ স্কুলের গেটের পাশেই শহীদ মিনার। রনি দৌড়ে গিয়ে শহীদ মিনারে উঠে পড়ল। তখনই তার বাবা ধমক দিয়ে বললেন, ‘রনি, জুতা পায়ে শহীদ মিনারে উঠেছ কেন? এখনি জুতা খুলে বাইরে রাখো।’

রনি জিজ্ঞেস করল, ‘কেন বাবা, জুতা পায়ে উঠলে কী হয়?’
বাবা এবার রেগে গেলেন। জোরে একটা ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে জুতা খুলে রাখতে বলেছি আমি। আগে জুতা খুলে বাহিরে রাখো।’ ‘আচ্ছা বাবা, রাখছি।’ রনি বলল।

রনি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, শহীদ মিনারে জুতা নিয়ে উঠলে কী হয়? আর শহীদ মিনার কেন তৈরি করা হয়েছে?’
‘আচ্ছা, শোনো তাহলে। আমাদের বাংলাভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তারা হচ্ছেন ভাষাশহীদ। আর ভাষাশহীদদের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। তাই শহীদ মিনারে জুতা পায়ে উঠলে শহীদদের অসম্মান করা হয়। এই যে দেখ, কারা যেন শহীদ মিনার নোংরা করে রেখেছে। বাদাম এবং কলা খেয়ে খোসা রেখে গেছে। এসব ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখলেও শহীদদের অসম্মান করা হয়। শহীদদের আত্মা কষ্ট পায়।’

তার বাবা এসব বলতে বলতে নিজ হাতে সব ময়লা তুলে স্কুল গেটে থাকা ডাস্টবিনে ফেলতে লাগলেন। রনিও এবার খালি পায়ে উঠে এসব ময়লা পরিষ্কার করা শুরু করল। রনি জানতে চাইল, ‘ভাষার জন্য কারা জীবন দিয়েছে, বাবা?’
বাবা উত্তর দিলেন, ‘অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে। তবে প্রথম জীবন দেন রফিক, শফিক, জব্বার, সালাম এবং বরকত।’
রনি বলল, ‘কেন জীবন দিতে হয়েছে, বাবা?’

বাবা উত্তর দিলেন, ‘আমাদের এই বাংলাদেশ একসময় ছিল না। আমরা পাকিস্তানের অধীনে ছিলাম। পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ ছিল। একটি পূর্ব বাংলা, অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান।’
‘আমরা কোন অংশে ছিলাম বাবা?’ জিজ্ঞেস করে রনি।

‘আমরা পূর্ব বাংলা অংশে ছিলাম। আমাদের ভাষা ছিল বাংলা আর পশ্চিম পাকিস্তানের লোকদের ভাষা উর্দু। ওরা আমাদের উপর অনেক নির্যাতন চালাত। চাকরি দিত না। আমাদের অংশে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করত না। আমরা শিক্ষা নিতে পারতাম না। ছিল না ভালো হাসপাতাল। রোগে ভুগতাম আমরা। আমাদের কষ্টে জন্মানো ক্ষেতের ফসল পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যেত। আমরা না খেয়ে অনেক কষ্ট পেতাম। শুধু তাই নয়, ওরা আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দিয়েছিলেনÑ উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে আমরা মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলতে পারব না। তাই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলার দামাল ছেলেরা এর প্রতিবাদে মিছিল বের করেন। মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। সেদিন পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক এবং জব্বার শহীদ হয়।’ বাবার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। রনির চোখও টলমল করছে এসব শুনে। রনি বলল, ‘বাবা, এই শহীদরা যদি জীবন না দিতেন তাহলে তো আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারতাম না।’
বাবা বললেন, ‘তুমি ঠিক বলেছ, রনি।’
‘এবার বুঝেছি, বাবা। শহীদরা আমাদের কাছে কাছে অনেক সম্মানীয়। আমাদের সকলের উচিত তাদের প্রতি সম্মান দেখানো। তাদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনারকেও সম্মান দেখানো উচিত। এখন থেকে আমি জুতা পায়ে উঠব না, ময়লা ফেলব না। শহীদ মিনারে কাউকে জুতা পায়ে এবং ময়লা ফেলতে দেখলে নিষেধ করব। শহীদ মিনার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখব।’

‘হ্যাঁ, রনি তুমি অবশ্যই এগুলো করবে। তোমরা শহীদের মর্যাদা রক্ষা করবে। তাদের প্রতি সম্মান দেখাবে।’
তারপর বাবা-ছেলে আবার হাঁটতে শুরু করল। রনি আবদার করল তালতলা বাজারে তার বন্ধু আদনানদের দোকানে ভালো সন্দেশ পাওয়া যায়। ওখান থেকে সন্দেশ খাবে আর মায়ের জন্যও নিয়ে যাবে। বাবা বললেন, ‘আচ্ছা, চল তাহলে।’ তারপর দুজনে আমতলা বাজারের দিকে যেতে লাগল।