পাইকা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫ মাঘ ১৪২৭

পাইকা

মিলা মাহফুজা ৪:১৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০২০

print
পাইকা

ওরা যখন গ্রামে পৌঁছল তখন রোদ কমে গেছে।
দাদি বারান্দায় পুরনো কাঠের সোফায় বসে অপেক্ষা করছিলেন। জিসান সোজা গিয়ে সোফার চওড়া হাতলে বসে দাদিকে জড়িয়ে ধরল। দাদি ওর হাতে হাত বুলিয়ে বললেন, খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছিস রে ভাই!

শুনে জিসান হাসে। মোটে ১৩ বছর বয়স তার। সারাক্ষণ ‘এটা করো না, ওটা করতে হয় না’ শুনে শুনে সে হয়রান হচ্ছে। অন্তত আরও পাঁচ বছর নাকি লাগবে নিজের ইচ্ছে মতো কিছু করার। আম্মু তা-ও বলে, আসলে নিজের ইচ্ছেমতো করা বলে কিছুই হয় না। বড় হতে হতে নিজেই নিজেকে বারণ করার শিক্ষাটা হয়ে যায়।

আপাতত জিসান বছরগুলো তাড়াতাড়ি পার করতে চায়। তবে স্কুল, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ক্রিকেট খেলা— সব নিয়ে বেশ ব্যস্তই থাকে। আর এসবের ফাঁকে বছরে দু-তিনবার দাদির কাছে ঘুরতে আসে। শীতলাহাটি নামের গ্রামে দাদি ছাড়া তার অন্য আকর্ষণ হলো খালের ওপারের জঙ্গলটা। আব্বু জিসানকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গাছ চেনায়। বনবিড়াল, সজারু, খরগোস, বেজি, শিয়াল, বনমোরগ দেখায়। পাখি দেখায়। হাঁড়িচাচা, ফিঙ্গে, কাঠঠোকরা, মাছ রাঙ্গা, টুনটুনি, ঘুঘু, বেনে বউ— আরও কত রকম পাখি। এক জোড়া টুনটুনি তো উঠোনের জবা ফুলের গাছে নিয়মিত বাসা করে ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। টুনটুনি নিজে ছোট্ট পাখি, তার বাসাটাও এত্তটুকুন। আর এত চঞ্চল! জিসানকে পাক্কা দুদিন লেগে থাকতে হয়েছে একটা ভালো ছবি তোলার জন্য। গেল বার মহি ওকে একটা ঘুঘু ধরে দিয়েছিল। তিলা ঘুঘু। গায়ের পালকে সাদা ফুটকির জন্য ওর এই নাম। কিন্তু আম্মু বোঝাল, ‘এভাবে খাঁচায় পাখি বন্দি করা অন্যায়। পাখি মুক্ত জায়গার প্রাণী, তাকে বন্দি করলে সে কষ্ট পায়।’

মহি, বারেক, রানা জিসানের বন্ধু। গ্রামে এলে সারাক্ষণ ওরা একসাথে থাকে। আব্বু-আম্মু চায় জিসান মাটি সংলগ্ন মানুষ হোক। গাছ, পাখি, ফল, ফুল, মাছ, ফসল চিনুক। বুঝুক কেমন করে ফসল ফলে।

যদিও ফিরে যাওয়ার পর ক্লাসের আবরার, সালমানরা ওকে ‘গাঁইয়া’ বলে খ্যাপানোর চেষ্টা করে। বলে— আমরা যাই সিঙ্গাপুরে নাইট সাফারি করতে আর গাঁইয়া যায় গ্রামে— এই আর কী!

এটা সত্যি এখন পর্যন্ত ওর দেশের বাইরে কোথাও যাওয়া হয়নি। আবরার সালমানরা বিদেশ ঘুরে এসে কী দেখেছে তার গল্প করে। সুন্দর গল্প। জিসান মনোযোগ দিয়ে শোনে। কিন্তু ওরা জিসানের বেজি আর সাপের লড়াই দেখার গল্প শুনতে চায় না। বিদেশ থেকে যে সোয়ালো পাখির ঝাঁক শীতকালে এদেশে এসে জিসানের সঙ্গে দেখা করে যায় সে কথাও আর বলা হয় না।

প্রত্যেকবার যেমন হয়, সকলে মিলে চলল গল্প আর গল্প । দাদি বললেন, এক জোড়া বেনে বউ সকালের দিকে উঠোনের জাম গাছে রোজ এসে বসে। এক কাঁদি চিনিচাঁপা কলায় পাক ধরেছে। রাজহাঁস আর মুরগির ছানা হয়েছে কয়েকদিন আগে। বাছুর বড় হয়ে ওঠায় এখন লালী গরুর দুধও পাওয়া যাচ্ছে।

মুড়কি-মুড়ি আর চা খেতে খেতে গল্প চলছিল। হঠাৎ কারও চিৎকারে চমকে উঠল জিসানরা। দাদি একটুক্ষণ কান পেতে শুনে বললেন, ‘ও কিছু না। জুহি পাগলি আবার কিছু করেছে মনে হয়।’

‘কী করে ও?’

‘ওই আজে-বাজে... নোংরামি। নিজে তো দেখিনি। লোকে যা বলে আমার তা বিশ্বাস হয় না। মেয়েটাকে ওর স্বামী তালাক দেওয়ার পর বাপ-ভাইয়ের কাছে আছে। গরিবের সংসারে যা হয়, বোঝা হয়েছে, তার উপর এই ঝামেলা। খুব মারধর করে মেয়েটা। পাগলকে মেরে কী লাভ? কেউ যদি তা বোঝে!’ দাদি বিষণœ গলায় কথাগুলো বলেন।

‘আজে-বাজে মানে কী?’ জিসান জিজ্ঞেস করার আগে ওর আব্বুই জিজ্ঞেস করেন।

‘থাকুক, এখন আর ওসব শুনে কাজ নেই।’ দাদি বিষয়টা ঝেড়ে ফেলার মতো করে বললেন।

দাদি বলতে চায় না দেখে আব্বুও আর জোর করলেন না।

পরদিন সকালে মহি, রানারা চলে এলো সকাল সকাল। জিসানকে নিয়ে যাবে ক্রিকেট খেলতে। পাড়ার এক দলের সঙ্গে ম্যাচ আছে। দাদি সবাইকে চালের আটার রুটি আর কবুতরের মাংস খেতে দিলেন। সঙ্গে পায়েস। জমিয়ে খাওয়া হলো। গ্রামে এলে জিসানের ক্ষিদে দ্বিগুণ হয়ে যায়। দাদি বলে, ‘গ্রামময় টো টো করে বেড়ালে ক্ষিদে তো হবেই। বাসায় তো থাকো পাখির খাঁচার মতো ফ্ল্যাটে। নড়াচড়া হয় না, তাই ক্ষিদেও লাগে না। উঠতি বয়সে ক্ষিদে হওয়া ভালো।’

খাওয়া শেষে ওরা ছুট লাগাল স্কুলের মাঠের দিকে। বেশ কিছু ছেলে, অল্প কিছু ছোট মেয়ে মাঠে এসেছে। উত্তরপাড়া আর দক্ষিণ পাড়া নামে দুদলের মধ্যে ম্যাচ হবে। প্রত্যেক দলে ৭ জন করে প্লেয়ার। মহি, রানারা আগেই সব ঠিক করে রেখেছে। দর্শকরাও দুই দলে ভাগ। ক্রিকেট খেলাটা খুব জমল। জিসানদের দল দক্ষিণপাড়া প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৫১ রানে অল আউট হলো। অন্যদিকে উত্তর পাড়া দল তিন উইকেটে ৩৬ রান করে প্রায় জিতেই যাচ্ছিল। পরে অবশ্য জিসানরা ওদের ৪৮ রানে আটকে দিয়ে জয়ের আনন্দ নিয়ে মাঠ ছাড়ল।

ফেরার পথে আবার সেই মহিলা কণ্ঠের চিৎকার শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল জিসান। জিজ্ঞেস করল, ‘যে মহিলা চিৎকার করছে তাকে তোরা চিনিস?’

ওর কথা শুনে রানা হাসে, ‘ও আবার মহিলা! হি হি হি! ও তো জুহি পাগলি।’

জুহি পাগলিকে মহিলা বলা ওদের কাছে খুবই হাসির কথা। কিন্তু জিসানকে ওরা চেনে, এনিয়ে হাসছে জানলে ও মন খারাপ করবে। রাগ হবে। তাই বেশি হাসল না।
জিসান জিজ্ঞেস করল, ‘এমন চিৎকার করছে কেন?’
বলল, ‘মারছে মনে হয়।’
‘মারছে কেন?’
‘তা মারবে না? নিজের গু নিজে খায়, এমন খবিস পাগল।’
জিসান বলল, ‘তুই নিজে দেখেছিস?’
‘না, আমি দেখিনি। ওর বাড়ির লোকেরা দেখে। তারাই মারছে। শুধু কি গু? ও লুকিয়ে পাথরও খায়।’
জিসান বলল, ‘চল তো ওখানে’
কারও যেতে উৎসাহ নেই। জিসান জিদ করায় বলল, ‘ও মেয়েলোকের পাগলামির তুই কি করবি?’
জিসান বলল, ‘জানি না। তবে একটা কথা ওদের বলতে হবে।’
‘তোর আমার মতো পুচকে ছোড়ার কথা শুনতে ওদের বয়ে গেছে।’
‘চেষ্টা তো করি।’ জিসান নাছোড়বান্দার মতো বলে।
প্রাচীর ঘেরা টিনের বাড়ি। মহিরা সরাসরি বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল। গ্রামে এই রকমটাই নিয়ম। বেশিরভাগ বাড়ির দরজা নেই। আর থাকলেও সেই দরজা দিনে খোলা থাকে। খুব অপরিচিত না হলে বাড়ি ঢোকায় বারণ নেই।
মহি উঠোনে দাঁড়িয়ে ডাক দিল, ‘ও সেজমা, দেখো কারে নিয়ে আসিছি।’
এক বয়স্কা মহিলা এগিয়ে এসে বিরক্ত গলায় বলল, ‘কারে নিয়ে আসিছ? কী দরকার?’
মহি বলল, ‘এ সাহেব বাড়ির ছেলে। ওই জুহি বু’র কথা কী যেন বলবে বলে এসেছে। জিসান নে, কী বলবি বল।’
ততক্ষণে বাড়ির অন্যরা সেখানে এসে জড়ো হয়েছে। জিসানকে তারা চেনে। ছেলেটা কিছু বলতে এসেছে শুনে তারা অবাক। একজন ঘরের বারান্দায় খেজুর পাতার পাটি বিছিয়ে দিয়ে বলল, ‘বসো, বাবা।’
জিসান বসে সবার দিকে তাকিয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘আমি ছোট মানুষ। হয়ত আপনারা আমার কথায় ভরসা করবেন না। কিন্তু তবু কথাটা বলছি। বলছি যে— জুহি বু পাগল না।’
সকলে বিরক্ত হলো। কেউ একজন একটু খুকখুক করে হাসলও। বলল, ‘পাগল না তা কী, বাবা?’
জিসানের নার্ভাস লাগছে কিছুটা। তবু বেশ দৃঢ়ভাবে বলল, ‘উনি অসুস্থ। অসুখ হয়েছে উনার।’
‘তা বাবা, মানুষ কি অসুস্থ হলে গু খায়? তোমাদের কারও হইছিল?’

শেষের কথাটা অপমান করার জন্যেই জিজ্ঞেস করা। বুঝে জিসানের কান লাল হলো। তবু সে হাসতে হাসতেই বলল, ‘হ্যাঁ, এরকম অসুখ হলে সবাই ওরকম করে। আরও অনেক রকম জিনিস খায়। এরকম করে বলে সকলে এদের পাগল মনে করে। কিন্তু তাতে উল্টো হয়। অসুখটা না সেরে বরং বাড়তে থাকে। এদের দরকার চিকিৎসা। চিকিৎসা করলে ভালো হয়ে যাবে।’
‘তা বাবা, অসুখের নাম কী? ওষুধ কী?’

‘অসুখের নাম ‘পাইকা’। ছোট-বড় যে কোন মানুষের হতে পারে। সাধারণত এরা লুকিয়ে লুকিয়ে আজে-বাজে জিনিস খায়। কেউ দেখে ফেললে ঝামেলা শুরু হয়। এ রোগের ওষুধ কী তা জানি না। তবে আমার ডাক্তার মামাকে জিজ্ঞেস করে জানাতে পারব। আপনারা ওনাকে না মেরে ডাক্তার দেখান আর খুব ভালো করে বোঝান। এভাবে মারলে সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যেতে পারে।’

জিসান খুব দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলো বলল। দেখল সবাই বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বেশ অবাক হয়েছে। তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করতে থাকল। জিসান বুঝতে পারল না তার কথা ওরা বিশ্বাস করল কিনা। আসলে রোগটা সম্পর্কে ও নিজেও বেশি কিছু জানে না। পত্রিকায় মাঝে মাঝে লোকের পাথর, কাচ জাতীয় জিনিস খাওয়ার সংবাদ পড়ে মামার কাছে জেনেছিল রোগটার নাম। আপাতত আব্বু আম্মুকে একবার এদের কাছে পাঠাতে হবে। আরও একবার বুঝিয়ে বলার জন্য। বড়দের কাছে শুনলে হয়ত বিশ্বাস করবে। যদি আব্বু-আম্মুর কথাও বিশ্বাস না করে তবে মামাকে ধরতে হবে আসার জন্যে। একজন ডাক্তারের কথা নিশ্চয় বিশ্বাস হবে সবার। তবে কিনা মামা যা ব্যস্ত মানুষ আসতে পারে কিনা সন্দেহ। জিসান আশা করল, আজ তার কথা শুনে অসুখটা নিয়ে নিশ্চয় ভাববে সবাই। নিজের বাড়ির লোকের অসুখ ভালো হোক তা তো সবাই চায়। বেচারা জুহি বু! কত না অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে তাকে।

জুহি বুণ্ডদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে জিসান ভাবছিল— বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, যাদের সাধারণ মানুষ পাগল বলে, তাদের মারধর করা খুব অন্যায়। তাদের দরকার সহানুভূতি আর সাহায্য। পাইকা রোগীর বেলায়ও একই কথা। সাধারণ মানুষকে এ কথাগুলো বোঝানো দরকার। ওকে আনমনে হাঁটতে দেখে মহির কানে কানে রানা বলল, ‘আমাদের জিসানও কিন্তু পাগলা আছে। দেখ, জুহি বু’কে দেখে কেমন মন খারাপ হয়েছে ওর!’