পুজোর লাল জামা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫ মাঘ ১৪২৭

পুজোর লাল জামা

শিবুকান্তি দাশ ৪:১৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২০

print
পুজোর লাল জামা

একটা বছর ধরে অপেক্ষায় থাকে পায়েল দুর্গাপূজার জন্য। পুজো এলে বাবা প্রতিবার দুই বোনকে নতুন জামা সেলাই করে দেয় পাড়ার মাসিমার টেইলারিং থেকে। এবার পুজো চলে এলেও মা বাবা কিছুই বলছে না। একদিন পরেই পুজো শুরু। ঢ্যাম কুড়া কুড় বাদ্য বাজে মণ্ডপে মণ্ডপে। চারদিকে খুশির জোয়ার। পাড়ার ছেলেমেয়েরা নতুন জামা জুতো পরে দল বেঁধে বেড়াচ্ছে। মা তবু বলছে, বাবা জামা নিয়ে আসবে তো। মায়ের কথাতেই ভরসা রাখতে চায় পায়েল।

পায়েল ক্লাস ফোরে পড়ে। সে আগে থেকেই বন্ধুদের বলে আসছে লাল জরির জামা নেবে এবারের পুজোয়। হিল জুতো নেবে। বিদেশি মেয়েদের মতো হাঁটবে। এখন তার বান্ধবীরা নতুন জামা পরে বেড়াচ্ছে। মুখে হাসির ফোয়ারা। পায়েল মুখ গোমড়া করে ঘরে বসে আছে। কখন বাবা নতুন জামা নিয়ে আসবে। সেই জারির জামা পরে সে ঘুরতে বেরুবে ছোট বোনকে নিয়ে। ছোটবোন প্রেরণা ক্লাস টুতে পড়ে। তার অতো বায়না নেই। তবু সবার গায়ে নতুন জামা দেখে সেও মাকে বলেছে নতুন জামা কিনে দেওয়ার কথা। 

মায়ের মুখ কালো। করোনার কারণে লকডাউন হলো। এতে পায়েলের বাবার চাকরি চলে যায়। একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। তিন মাস বেকার থাকাতে অল্প কিছু জমানো টাকা ছিল তাও খরচ করে ফেলেছেন। মাস দুয়েক হলো নতুন একটা চাকরি নিয়েছেন বটে, বেতন অনেক কম। ফলে টানাটানির সংসারে ধার-দেনা লেগেই আছে।

পায়েলের বাবা পুজোয় বাড়িতে আসবেন বলে ফোনে জানালেও এখন ফোন ধরেন না। নিজে থেকে করেনও না। পায়েলের মা ভাবছে হয়ত বেতন পাননি। পায়েলের বাবা বলে ছিল বেতন না পেলে পুজোতে বাড়িতে আসবেন না।

আজ ষষ্ঠী পুজো। সন্ধ্যা হতেই পুজোমণ্ডপ থেকে ডাকঢোলের শব্দ ভেসে আসছে। মাইকে বাজছে পুজোর গান। শিউলি ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে। পড়তে বসে ওরা দুই বোন। মা তাদের পাশে।

বাবা কখন আসবে মা। পায়েল মাকে জিজ্ঞেস করে।
মা চুপচাপ।
মা, নতুন জামা কখন নেব। প্রেরণাও জিজ্ঞাসা মায়ের কাছে।

তোমরা পড়ো তো। সময় হলে তোমাদের বাবা চলে আসবে। এ কথা বলে মা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। উঠোনের পাশে শিউলিতলায় গিয়ে দাঁড়ায়। চাঁদের আলোয় চারদিকে কাশফুলের মতো কেমন ফকফকা। পায়েলের মা গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। বারবার দুর্গা মাকে ডাকছেন। পায়েলের বাবা যেন ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন। তিনি যেন ভালোই ভালোই বাড়ি ফেরেন। মেয়েদের মুখে যেন হাসি ফোটাতে পারেন।

পেছন থেকে পায়েলের ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়ায় মা। মায়ের চোখে পানি। দেখে নিজের চোখেও পানি চলে আসে পায়েলের। পায়েল বুঝতে পারে মায়ের কষ্ট। বুঝতে পারে সংসারের টানাপোড়েনও।

পায়েল, চলো খাবে। বলেই ঘরের দিকে পা বাড়ায় মা। পায়েল মায়ের শাড়ির আঁচল ধরে রাখে। মা পেছন ফিরে পায়েলের দিকে তাকায়। পায়েলের চোখে পানি দেখে তাকে জড়িয়ে ধরে মা। পায়েল ভ্যা করে কেঁদে দেয়। বলে, মা, আমার নতুন জামা লাগবে না। জন্মদিনে মামার দেওয়া উপহারের লাল জামাটা পরে পুজো দেখতে যাব।

আচ্ছা, অত চিন্তা করো না, দেখবে তোমার বাবা কালকেই চলে আসবে। তোমাদের জন্য বাবা সুন্দর জামাও নিয়ে আসবে। দুর্গতিনাশিনি মা দুর্গা সব কিছু আমাদের ঠিক করে দেবেন। মায়ের বিশ্বাস।

এদিকে ঘরে গিয়ে দেখে প্রেরণা ঘুমিয়ে গেছে। মা ডেকে তুলে পিঁড়িতে বসায়। ডাল আলু ভাজি দিয়ে খাবে না প্রেরণা। প্রতিদিন খেতে খেতে তার আর ভালো লাগে না। তাই রেগে গিয়ে ভাতের থালাটা ফেলে দেয়। মাও রাগের মাথায় একটা চড় মেরে দেয় প্রেরণাকে। চিৎকার করে কেঁদে ওঠে প্রেরণা। সান্ত¡না দিয়ে পায়েল বলে, কালকে তো বাবা আসবে। বাজার থেকে মাছ আনবে। কালকে মাছ দিয়ে খেতে পারবে। মা পায়েস করবে। লুচি বানাবে। কত কিছু হবে দেখিস।
না। কিছুতেই খাবে না। গোঁ ধরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। সে রাতে মাও আর খায়নি।

এদিকে ঘুমাতে গিয়েও ঘুম আসে না পায়েলের। বাবার কথা বারবার মনে পড়ছে। খুব ছোট বেলায় বাবার কোলে চড়ে পুজো দেখতে যাওয়ার কথা মনে পড়ে।
একবার জগন্নাথ মন্দিরে পুজো দেখতে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল পায়েল। তখন আরও ছোট ছিল সে। নতুন লাল জামা পরে মন্দিরে গিয়েছিল। বাবাকে হারিয়ে সে কী কান্না। কত কথা মনে পড়ে তার। মনে মনে দুর্গা মাকে ডাকে আর বলে কাল যেন বাবা নতুন জামা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। মা পিঠা, ফুলি, পায়েস কত কী করবে। বন্ধুদের ডেকে এনে খাওয়াবে দশমীর মিষ্টি, সন্দেশ। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমের ঘোরে ডুবে গেছে জানেই না।

সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙে পায়েল আর প্রেরণার। দেখে বিছানার পাশে লাল জরির কী ঝকঝকে দুটো জামা। ওড়না। জুতো। মায়ের জন্য লাল পাড়ের কী সুন্দর শাড়ি। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না ওরা। মা সামনে দাঁড়িয়ে। মাইকে ভেসে আসছে পুজোর গান। প্রেরণা লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে মাকে জড়িয়ে ধরে।

বাবা কখন এসেছে মা? আমাদের ডাকোনি কেন? পায়েল জিজ্ঞেস করে।

তোদের বাবা আসেননি। ছুটি পাননি। কদিন পরে আসবেন। তার এক বন্ধুকে দিয়ে এগুলো পাঠিয়েছেন। খুব সকালে তিনি দিয়ে গেছেন। তোমরা ঘুমে ছিলে বলে ডাকিনি।

আচ্ছা পরে দেখো তো, তোমাদের গায়ে ঠিক হয় কিনা জামা। এই বলে মা সপ্তমী পুজোর থালাটা সাজাতে বসে। পায়েল জামাটা হাতে নিয়ে দেখছে জরির কাজগুলো। ওর পছন্দ বাবা ঠিক ঠিক জেনেছে। বাবাকে ধন্যবাদ জানায় মনে মনে। প্রেরণা ততক্ষণে ওর জামাটা পরে ‘দেখো, কী সুন্দর জামা পরেছি’ বলে বলে উঠোনে বেরিয়ে পড়ে।