শিশু সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫ মাঘ ১৪২৭

শিশু সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ

অলোক আচার্য ১:১৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১০, ২০২০

print
শিশু সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে/ বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি, ও ভাই/ আজ আমাদের ছুটি। মেঘের পরে বৃষ্টি হয়ে রৌদ্র ভাসা সময়ে স্কুল ছুটির যে আনন্দ তা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের শৈশবেই এনে দিয়েছেন। ছুটির আনন্দ এর থেকে আর ভালোভাবে প্রকাশ করা যায় না। আজো যখন মেঘ-বৃষ্টি-রোদের খেলা হয় তখন মনের অজান্তেই কবিতাটি মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। ছুটির সে আনন্দ কেউ কি ভুলতে পারে! আবার মাকে নিয়ে বিদেশ ঘুরতে যাওয়া সেই ছেলেটির কথা।

বিদেশ ঘুরতে গিয়ে যখন তারা ডাকাতের হাতে পড়ে খোকা বলেছিল, তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে/ ঠাকুর দেবতা স্মরণ করছ মনে/ বেয়ারাগুলো পাশের কাঁটাবনে/ পালকি ছেড়ে কাঁপছে থরো থরো।/ আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে/ আমি আছি, ভয় কেন মা কর। তখন খোকা একাই ডাকাতের সঙ্গে লড়াই করে বীরের মতো মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। মা তখন তার ছোট্ট খোকার কপালে চুমু খেয়ে কোলে তুলে নেয়। সব খোকাদের চোখে আজ মাকে বিপদমুক্ত করার এমন প্রত্যয়।

এমন সব কবিতা, খোকার মতো বীরপুরুষ সৃষ্টি যিনি করেছেন তিনি আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন সব্যসাচী লেখক। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ সাহিত্যের যে শাখাতেই তিনি হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে আজো তা অলংকার হয়ে চূড়ায় অবস্থান করছে। মুক্তার মতো উজ্জ্বল সেই সাহিত্য নিয়ে আমরা হৃদয়ের খোরাক মিটিয়ে চলেছি। তিনি শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছেন। তাকে নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানে একটি সাহিত্য যুগ, একটি কাল। তিনি কবিদের কবি। যা কাল থেকে কালে প্রবাহমাণ। একটি, দুটি লেখায় লিখে যার গুরুত্ব প্রকাশ করার চেষ্টা বোকামি মাত্র। বাংলা সাহিত্যে শিশুদের জন্য যে সাহিত্য রয়েছে মানে শিশু উপযোগী গল্প, ছড়া বা কবিতা এসব কবি গুরুর যুগেও হয়েছে এবং আজো হচ্ছে। শিশুসাহিত্য সৃষ্টি সহজ কথা নয়। এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো লেখাটি কতটা শিশু উপযুক্ত হয়েছে তা বিবেচনা করা। শিশু মনকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম সফল সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি তাই চ্যালেঞ্জের। শিশুদের জন্য লিখতে হলে নিজেকেও শিশুমনের হতে হয়।

শিশুদের মন, চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ বেদনা, হাসি-কান্নার উৎস বুঝতে হয়। এগুলো বুঝতে পারলেই সার্থক শিশুতোষ রচনা সম্ভব। কবিগুরুও শিশুদের জন্য লিখতে গিয়ে নিজের প্রাণকে সেই সময়ে নিয়ে গেছেন। এমনিতেই সারল্য ছিল তার বৈশিষ্ট্য। আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য হলো শিশুকালে যা পাঠ করি তার অনেকটা আবার আমরা কৈশোর-যৌবন-বার্ধক্যেও মনের কোণে ঠাঁই নেয়। এটাই সৃষ্টির সার্থকতা।

এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টির বিশালতা সাহিত্যভাণ্ডারকে পূর্ণতা দিয়েছে। আজো আমরা সেই কবিতা, ছড়া আবৃত্তি করি। তিনি শিশুদের জন্য কবিতা, ছড়া, গল্প, ভ্রমণকাহিনী বা জীবনীও লিখেছেন। ছাত্রাবস্থায় কিশোর চরিত্র ফটিকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছুটি গল্পে। ফটিকের কৈশোরের উচ্ছলতা, গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে শহরের জীবনে গিয়ে ফটিকের বন্দিত্ব, মায়ের কাছে যাওয়ার আকুল আবেদন, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখা ফটিকের শেষ পরিণতি আমাদের চোখে জল এনে দেয়। তার কাবুলিওয়ালা গল্পটি যা চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে সেখানে অন্যতম প্রধান চরিত্র মিনি। ভিনদেশি কাবুলিওয়ালার মিনির প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমে কাহিনী এগিয়েছে। মিনি নামের ছোট্ট মেয়েটির চরিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার ডাকঘর নাটকের অমলের চরিত্রও আমাদের মন কেড়ে নেয়।

আবার ফিরে আসি কবিতার কথায়। আজ যখন আমাদের পরিচিত কোনো গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে যাই তখন তালগাছের দিকে দৃষ্টি পড়লেই মনের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে- তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে...। যখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে আমাদের মুখ থেকে আজো বেরিয়ে আসে বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর/ নদে এলো বান। আবার আষাঢ় নিয়েই তিনি লিখেছেন, নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে/ তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

শিশুতোষ মিষ্টি ছড়াটি হলো কবিগুরুর বিখ্যাত বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর। কবিগুরু চাঁদকে নিয়ে লিখেছেন চাঁদের আলো নিভে এলো/ সুয্যি ডোবে ডোবে/ আকাশ জুড়ে মেঘ জমেছে/ চাঁদের লোভে লোভে। এভাবে চাঁদ, সূর্য, বৃষ্টি, ফুল, পাখি অর্থাৎ প্রকৃতির সন্নিধ্যে এসে অসংখ্যা শিশু উপযোগী ছড়া, কবিতা লিখেছেন। শিশুরা এসবই অর্থাৎ প্রকৃতির উপাদান নিয়ে মেতে থাকতে পছন্দ করে। নিজের দেখা নদীটাকে এঁকেছেন মনে মনে। লিখেছেন কবিতা। তিনি লিখেছেন- আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/ পার হয়ে যায় গরু/ পার হয় গাড়ি/ দুই ধার উঁচু তার/ ঢালু তার পাড়ি। আমাদের একটি প্রজন্মের প্রত্যেকেরই নদীর সঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

এমন কবিতায় চোখের সামনে সেই নদী পাড়ের দিনগুলোকে সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আবার এই নদী নিয়েই তার দুই তীর কবিতায় লিখেছেন, আমি ভালোবাসি আমার/ নদীর বালুচর/ শরৎকাল যে নির্জনে/ চকাচকির ঘর। শিশুসাহিত্যে আরও অনেক সাহিত্যকর্ম রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যা কোনো একটি নির্দিষ্ট লেখায় তুলে আনা কষ্টসাধ্য। যা যুগ যুগ ধরে আমাদের শিশুসাহিত্যে অমর হয়ে রয়েছে।