ফুল

ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৬ আশ্বিন ১৪২৭

ফুল

বিশ্বজিৎ দাস ১২:২৪ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০

print
ফুল

ছাদের উপর উঠে ছোট্ট মেয়েটি খুশি হয়ে উঠল।
‘আব্বু, দেখেছ, দুটি গোলাপ গাছ।’
‘আগে যারা ভাড়া ছিল এ বাসাতে তারা বোধহয় রেখে গেছে।’
ছোট্ট মেয়েটি গাছ দুটির গায়ে হাত বুলিয়ে দিল।
ফিসফিস করে বলল, ‘আমি এসে গেছি। আমি গাছ খুব ভালোবাসি। তোমাদের নিশ্চয়ই একা একা লাগে।’
‘লাগে তো।’ একটি গোলাপ গাছ বলল।

ছোট্ট মেয়েটি বলল, ‘আমি কালই তোমাদের নতুন নতুন অনেকগুলো সঙ্গী এনে দেব।’
গাছগুলো খুশি হলো। এই খোলা আকাশের নিচে একা একা দিন কাটাতে ভালো লাগে না গাছ দুটির।
মেয়েটি তার কথা রাখল। পরদিনই অনেকগুলো টবসহ গাছ নিয়ে এলো।
গোলাপ গাছ দুটি তো খুশিতে ডগমগ। নতুনদের স্বাগত জানিয়ে গোলাপ গাছগুলো বলল, ‘শোনো ভাই ও বোনরা, ছোট্ট খুকি আমাদের খুব ভালোবাসে। আদর করে। তাই আমাদেরও কিছু একটা করা দরকার।’
শুনে সব গাছ রাজি হল। গাছে গাছে হরেক রকম ফুল ফুটল। ফুলের টানে প্রজাপতি এলো। আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরল। সূয্যি মামা তাপ আর আলো দিল। দিনে দিনে বাগানটা আরও ভরপুর হয়ে উঠল।
সকালে স্কুল যাওয়ার আগে, স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত মেয়েটি ফুলের বাগানে এসে বসে থাকে।
ওদের সঙ্গে কথা বলে। আদর করে। আগাছা পরিষ্কার করে দেয়। কম ফুল দিলে কোনো কোনো গাছকে বকা দেয়।
গাছগুলো মেয়েটির সঙ্গ খুব পছন্দ করে। মেয়েটির বাড়িতে যারা বেড়াতে আসে, তারা ছাদের উপর বাগান দেখে মুগ্ধ হয়।
বলে, ‘এত সুন্দর বাগান! কিবরিয়া সাহেব, আপনি ভালোই পরিশ্রম করেন দেখছি।’
বাবা হেসে বলেন, ‘সব আমার পাগলি মেয়েটার কাজ। ওইই বাগানটা দেখাশোনা করে।’
অতিথিরা মুগ্ধ হয়। সেলফি তোলে। ফেসবুকে দেয়।
ছোট মেয়েটি এসব কিছুই করে না। শুধু বই পড়ে আর বাগানে গাছদের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটায়।
হঠাৎ একদিন গাছরা দেখল মেয়েটির মন ভীষণ খারাপ। সেদিন মেয়েটি কোনো গাছকে আদর করল না। পানি দিল না। আগাছা পরিষ্কার করল না। কোনো গাছকে বকাও দিল না। মেয়েটি তাড়াতাড়ি তার ঘরে চলে গেল।
গাছরা সেদিন পানির অভাবে ভীষণ কষ্ট পেল। পরদিন সকালেও মেয়েটি ছাদে এল না। সারাদিন প্রচ- রোদে পুড়ল গাছগুলি। ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকল কোনোমতে।
বিকেটে ছাদে এল ছোট মেয়েটি।
তার চোখমুখ ফোলা।
‘কী হয়েছে খুকুমনি?’ গোলাপ গাছ জানতে চাইল।
জবাবে মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। তার কান্না শুনে ভীষণ আহত হলো গাছরা। কান্না থামলে মেয়েটি বলল, ‘আমার আব্বু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কাল থেকে জ্ঞান ফেরেনি।’
শুনে দুঃখ পেল সব গাছ। গোলাপ গাছ বলল, ‘খুকু, আমরা সবাই বলছি, তোমার আব্বুর জ্ঞান ফিরবে।’
‘ফিরবে? তুমি বলছ!’
‘হ্যাঁ ফিরবে। কিন্তু তুমি কি জানো কাল থেকে আমরা আধমরা হয়ে আছি পানির অভাবে?’
‘ও তাই তো।’ ছোট্ট মেয়েটির যেন হঠাৎ মনে পড়ল। তাড়াতাড়ি করে পানি এনে গাছে দিতে শুরু করল।
গাছগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেল। সবাই ফিসফিস করে বলল, ‘তোমার আব্বু ভালো হয়ে যাবে। ভালো হয়ে যাবে।’
খুকুমনির মন ভালো হয়ে গেল।
আব্বুর অসুখের জন্য বাসায় ওর খালাম্মা এসেছেন। ছাদ থেকে নামতেই তিনি বললেন, ‘কী করছিলে খুকু?’
‘গাছে পানি দিচ্ছিলাম।’
‘তোমার আব্বু অসুস্থ। আর তুমি গাছে পানি দিচ্ছ!’
‘আব্বু ভালো হয়ে যাবে।’
‘কীভাবে জানলে? তুমি কি ডাক্তার?’
‘আমার মন বলছে খালা।’
তখনই খালার মোবাইল ফোন বেজে উঠল।
‘কী বললি? জ্ঞান ফিরেছে?’
আরও কিছুক্ষণ কথা বলে খালাম্মা ফোন অফ করলেন।
‘খুকু, তুমি কীভাবে বুঝলে আব্বুর জ্ঞান ফিরবে?’ চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
খুকু জবাব দিল না।
হাসল। মিটিমিটি হাসি।
ছাদের গাছগুলোর কথা খুকু বুঝতে পারে- খালাকে বললে কি সেটা বিশ্বাস করবে?
করবে না।