টেডি বিয়ারটি কথা বলে

ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১১ আশ্বিন ১৪২৭

টেডি বিয়ারটি কথা বলে

মুমতাহিনা জাহান ১২:২৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০২০

print
টেডি বিয়ারটি কথা বলে

ধসকাল থেকে তীনু কান্না করছে। আজ ওর প্রথম স্কুল। সকাল সাতটায় রওনা দিতে হবে, আর এখন বাজে ছয়টা বিশ। মা তীনুকে বলছেন, ‘তাড়াতাড়ি করো, বাবা। স্কুল থেকে এসে তোমার সব কথা শুনব।’

তীনু কোনো কথা কানেই নিচ্ছে না। শুধু বলেই চলেছে, ‘আমার টেডি বিয়ারটি কথা বলে না কেন?’
বাবা বললেন, ‘ধুর বোকা, টেডি বিয়ার কোনোদিন কথা বলে?’
এরপর মাকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তাবিনের মা, ছেলে স্বপ্নে এমন কী দেখেছে?’
তীনু মানতে নারাজ। তার ভাষ্যমতে, টেডি বিয়ার কথা বলতে পারে এবং তার হলুদ টেডিটাও বলতে পারবে। আসলে হলুদ টেডিটা ওর খুব প্রিয়। গেলবার জন্মদিনে কোনো এক আত্মীয় দিয়েছিল। সারাক্ষণ টেডি নিয়ে থাকে। টেডিটার একটা নামও রেখেছেÑ পিনু। তীনুর টেডি পিনু। টেডিটাকে স্কুলেও নিয়ে যাবে বলছিল, তবে ওর বড় ভাইয়ের কথা শুনে সিদ্ধান্ত বদলেছে। দীনু বলেছে, স্কুলে খেলনা, পুতুল এসব নিয়ে গেলে নাকি টিচাররা নিয়ে নেন। সেগুলো আর কোনোদিন ফেরত পাওয়া যায় না।
তীনুর কান্না এখনো থামেনি। সবাই অনেক বোঝানোর চেষ্টা করছে, কোনো লাভই হচ্ছে না। হঠাৎ করেই পাশের ঘর থেকে শরীফ বলে উঠল, ‘তীনু, তোমার টেডি কথা বলবে, তুমি স্কুল শেষ করে এলে তারপর।’
তীনু বলল, ‘সত্যি?’
শরীফ উত্তর করল, ‘হ্যাঁ’।
এবার কান্না থামল। শরীফ যেহেতু বলেছে, টেডি বিয়ার কথা বলবেÑ তার মানে বলবেই।
শরীফ হচ্ছে তীনুদের নতুন কাজের ছেলে। ওর সঙ্গে তীনুর খুব ভাব। আগের কাজের লোকগুলোর সঙ্গে তীনুর ইতিহাস খুব একটা আনন্দদায়ক ছিল না। একটা উদাহরণ দিই। নসিমন নামে এক কাজের মেয়ে তীনুকে একবার চোখ উল্টিয়ে ভূত সেজে দেখিয়েছিল। আর যায় কই? তীনু বেচারিকে সারাদিন ভূত বানিয়ে রাখল। চোখ স্বাভাবিক করলেই শুরু হতো কান্না। পরের দিন সকালে নসিমনের আর দেখা পাওয়া যায়নি।
এই একমাত্র শরীফই তীনুর মন জয় করতে পেরেছে। শরীফ এসেছে তীনুর নানাবাড়ি বালিহাটি থেকে। বাপ মরা ছেলে। বাড়িতে আছে কেবল মা আর একটা বিধবা বোন। বোনটাও বাড়ি বাড়ি কাজ করে। তবে বালিহাটিতেই। বলে, ‘আমি যদি দূরে কাজ করতে যাই তবে মাকে দেখবে কে?’
শরীফের বয়স তের-চৌদ্দ হবে। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছে। সে তীনুকে তার স্কুলের গল্প শোনায়। তীনু নানুবাড়ি গিয়ে শরীফের স্কুল দেখেছে। এল আকৃতির লম্বা টিনশেড ঘর, তবে পাশে একটা দোতলা বিল্ডিং। অসমাপ্ত পড়ে আছে। স্কুলের মাঠটা বিশাল। পুরো মাঠ সবুজ ঘাসে ঢাকা। মাঠের এক কোণে শিমুল গাছ, আরেক কোণে একটা পলাশ গাছ। শিমুল আর পলাশ ফুলের মাঝে তীনু এখনো পার্থক্য করতে পারে না। তার কাছে দুটো ফুল একই মনে হয়। তবে তীনু এটা জানে শিমুল গাছ থেকে স্নো ফল হয়। বাতাসে যখন শিমুল গাছ থেকে মেঘের মতন সাদা সাদা তুলা পড়তে থাকে, তখন তাকে বরফবৃষ্টি বা স্নো ফলই মনে হয়।
এবার টেডিবিয়ারের আলোচনায় আসি। জীবনের প্রথম স্কুল শেষ করে তীনু হাসি হাসি মুখে বাড়ি ফিরে এল।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে টেডি বিয়ারকে নিয়ে চলে গেল বারান্দায়। প্রতিদিন ওটাকে নিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিমান দেখে। বিমান দেখে ও কখনো ক্লান্ত হয় না। আজও যথারীতি বারান্দায় দাঁড়িয়েছে। শরীফকে ডেকে বলল, ‘শরীফ ভাই, পিনু কখন কথা বলবে?’
শরীফ তখন আরেক বারান্দার গ্রিল পরিষ্কারে ব্যস্ত ছিল। তীনুকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘এই তো কিছুক্ষণের মধ্যেই বলবে।’
তারপর হঠাৎ করেই, একটা অদ্ভুত গলায় কে যেন বলে উঠল, ‘তীনু, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? আমি পিনু।’
তীনু তো অবাক। সে টেডিটাকে কোলে নিয়ে বলল, ‘সত্যি পিনু, তুই কথা বলছিস!’ পিনু বলল, ‘হ্যাঁ।’
তারপর তীনু আনন্দ রাখে কোথায়? সারাবাড়ি মাথায় তোলে চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘আমার টেডি কথা বলে। টেডি বিয়ারটা কথা বলে।’
পরেরদিন স্কুলে গিয়ে নতুন বন্ধুদের টেডি বিয়ারের গল্পটা বলল। বন্ধুরা বলল, ‘এ আবার হয় নাকি?’
তীনু বলল, স্কুলে আনলে টেডি বিয়ারটা টিচার নিয়ে নিতে পারেন। তাই আনতে পারছে না। তা নাহলে ওর টেডি কীভাবে কথা বলে, তা সবাইকে দেখিয়ে দিত।
স্কুল থেকে মুখে হাসির পরিমাণটা আগের দিনের থেকে একটু বাড়িয়ে তীনু বাড়ি ফিরে এল। বাসায় এসে না খেয়েই টেডি বিয়ার নিয়ে বারান্দায় ছুটছে। মা বললেন, ‘আগে খেয়ে যাও।’
ও বলল, ‘তাহলে পিনুর সঙ্গে গল্প করতে করতেই খেয়ে ফেলি।’
পাশের ঘর থেকে দীনু বলল, ‘তোর পিনু আর কথা বলবে না। শরীফ ভাই চলে গেছে।’ শরীফ ভাইয়ের চলে যাওয়ার সঙ্গে টেডির কথা বলার কী সম্পর্ক? তীনু বিষয়টা বুঝতে পারল না। কিন্তু সে হঠাৎ করেই কেঁদে ফেলল। মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো, ‘মামণি, শরীফ ভাই কেন চলে গেল?’
মা বললেন, ‘ওর মা মারা গেছেন।’
তীনু বলল, ‘কীভাবে মারা যায়, মামণি?’
মা বললেন, ‘যখন কেউ সবার সঙ্গে আড়ি নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে, তখন চিরজীবনের জন্য ঘুমিয়ে পড়ে। তখন সে মারা যায়। মারা গেলেই তাকে লুকিয়ে ফেলতে হয়। কেউ মাটির তলায় লুকিয়ে ফেলে, কেউ আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, কেউবা আবার পানিতে ভাসিয়ে দেয়।’
‘আমার পিনু মনে হয় মারা গেছে, তাই ও কথা বলবে না!’
‘হয়ত, তাই হবে।’
‘কিন্তু, ওকে লুকাবো কোথায়?’
‘তাই তো? কী করা যায়? ভেবে দেখো, বাড়িতে লুকোবার মতো সবচেয়ে ভালো জায়গা কোনটি?’
তীনু অনেক ভেবেচিন্তে কিছুই বের করতে পারল না। অবশেষে দীনুর পরামর্শে স্টোররুমে একটা লাল রঙের বাক্সে টেডিটার শেষ ঠিকানা নির্ধারিত হল।
আস্তে আস্তে তীনুর স্মৃতি থেকে টেডি বিয়ারটা একদম সরে গেল। এখন সে ফিজিক্সের সূত্র আর কেমেস্ট্রির বিক্রিয়াকে মনে জায়গা দিয়েছে। সেখানে আর টেডি বিয়ারের কোনো স্থান নেই। তবে শরীফের কথা ওর প্রায়ই মনে পড়ত। ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তীনুরা নানাবাড়ি যাচ্ছে। তীনুর আনন্দের সীমা নেই। ওর নানি কল দিয়েছেন। কথা বলা শেষ করে মা তীনুর বাবাকে বললেন, ‘আরেক খবর শোনো নাই, শরীফ নাকি কাল রাতে স্ট্রোক করে মারা গেছে!’
‘শরীফ ভাই, এবার তোমাকেও লুকিয়ে ফেলবে!’ বলেই কাঁদতে কাঁদতে তীনু স্টোররুমে চলে এল। লাল বাক্সটা খুলে টেডিটাকে ধরে কাঁদতে লাগল। ছোটবেলায় বুঝতে না পারলেও এখন সে জানে টেডির কথা বলার পেছনে আসল রহস্যটা কী।
শুনেছে শরীফ ভাইয়ের নাকি পাঁচ বছর বয়সের একটা ছেলে আছে। তীনু নানাবাড়ি গিয়ে টেডিটা শরীফ ভাইয়ের ছেলেকে উপহার দেবে।