নাড়ির টান

ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০ | ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭

নাড়ির টান

মোহাম্মদ আবদুর রহমান ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০২০

print
নাড়ির টান

-মা, ঘুম আসে না।
-কেন সোনা?
-তুমি তো সব জানো মা।
-কী জানি বাবা?
-তুমি জেনেও না জানার অভিনয় করছ মা। এ কথা আমি কিছুতেই ভাবতে পারছি না।
-না সোনা। আমি কী করে বুঝব তোমার মনের কথা। খুলে বল।
-না। কিছু না। বলে সোহেল রাগে মুখ ঘুরিয়ে অন্য পাশে শুয়ে পড়ল।

মা আশ্চর্য হয়ে যায়। বুঝতে পারে না সোহেল কেন এমন করছে? কী হয়েছে তার। এসব কথা নিয়ে বারবার ভাবছে কিন্তু কারণ খুঁজে পায় না।
সোহেলকে তার মা বুকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলেও সে কোনো মতেই ঘুরতে চায়না। অভিমান করে আছে। অভিমান হল, মা তো আমার জীবনের সব কিছুই হিসাব করে রাখে। আমি কী পছন্দ করি আর কী পছন্দ করি না। কোনো দিন হঠাৎ করে মাকে আমার কত বয়স জিজ্ঞাসা করলে সেকেন্ডের মধ্যে বলে দিতে পারে। কোনো দিন ভারাক্রান্ত হয়ে বসে থাকলে বলে দেয় আমার কী হয়েছে। অথচ আজ মা কিছুই বলতে পারে না। মা তো আমাকে খুব ভালোবাসে। যদিও আমি মার থেকে বাবাকে বেশি ভালোবাসি। তাহলে মা কি সত্যিই বুঝতে পারে না?
মামাবাড়ি এসে কি মা সব ভুলে গেছে। আজ দুপুরে তো মামাবাড়ি আমি আর মা এসেছি। বাবা অফিসের কাজে রাজধানী যাবে। তাই এই প্রথম বাবাকে ছাড়া আমরা মামাবাড়ি এসেছি।
আর বাবা ছাড়া এই প্রথম রাত ঘুমাতে হবে আমাকে। তাই বুকের ওপর যেন ব্যথার পাহাড় চেপে বসেছে।
মা ভালো করেই জানে খুব জোর করে সোহেলকে বুকে টেনে নিলে বরং ক্ষতিই হবে। তাই জোর না করে ছেড়ে দিল। সোহেল ছোট থেকে যেটা জেদ ধরে তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চুপ থাকে। কয়েক দিন আগে তার সপ্তম জন্মদিবস পালনের দিন জেদ ধরেছিল নতুন সাইকেলের জন্য। ওর ছোট কাকু বলেছিল, কাল এনে দেব। এখন আমার ঘাড়ে চড়, ঘুরে আসি।
জোর করে ঘাড়ে করে উঠানের দিকে নিয়ে যায়। তখন ও কামড়ে দিয়েছিল ওর কাকুকে। আর শেষপর্যন্ত তা না পাওয়া পর্যন্ত কোনো কিছু খায়নি। শুধু চিৎকার করে কেঁদে ছিল। তার বাবা বাড়ি ফিরে এসে বাধ্য হয়ে রাত আটটার সময় তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে সাইকেল কিনে দিলে সে এসে কেক কাটে। তাই তার মার চিন্তা অনেক বেড়ে গেল। সোহেলের কেন ঘুম আসে না বলতে না পারলে সে তো আর কোনো কথা বলবে না। এখন রাত এগারটা। সোহেলের বাবাকে কল করা ঠিক হবে না। কারণ তার আজ তাড়াতাড়ি ঘুমানোর কথা। খুব সকাল সকাল অফিসের কাজে রাজধানী যাবে। তাই কী করবে ভেবে পায় না। নিরুপায় হয়ে জেগে রয়েছে। আর এপাশ-ওপাশ করছে।
রাত বারটায় হঠাৎ মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। সোহেলের বাবা ফোন করেছে। মা দ্রুত রিসিভ করে বললÑ এখনও ঘুমাওনি?
-কী করে ঘুম আসবে।
-কেন তুমি তো সব জানো। তারপর জিজ্ঞাসা করছ!
মা রেগে বলে- তোমরা আমাকে কি পেয়েছ বলো তো?
-আমরা বলতে?
-তুমি ও তোমার ছেলে।
-সোহেল কী বলেছে তোমাকে!
-তার নাকি ঘুম আসে না। আর কেন আসে না আমি নাকি জানি। তোমাদের নাটক আর ভালো লাগে না। ছেলে এখনও ঘুমায়নি।
-তুমি লাইট জ্বালো। আমি ভিডিও কল করছি।
মা লাইট জ্বালল। তখন সোহেল রেগে বলল, কী করছ তুমি?
-কেন, কী হল তোর!
তখনই আবার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। মা রিসিভ করল। বলল, কী বলছ, বলো।
-মোবাইল ফোনটা সোহেলের চোখের সামনে ধর।
মা ফোনটা সোহেলের দিকে রাখল। বাবা সোহেলকে বলল, তোমার জন্য আমারও ঘুম আসে না, বাবা। তুমি তো জানো, রাতে তোমাকে বুকে নিয়ে চুমু না খেলে ঘুম আসে না। তাই তোমার কথা জানার জন্য ফোন করেছি। সোহেল ফোনটা তাড়াতাড়ি হাতে নিয়ে বলল, সেই জন্য আমারও আসে না আব্বা। দুজনে পরস্পরকে ফোনের পর্দায় চুমু খেল। এসব দৃশ্য দেখছিল মা। বুঝতে পারে, বাবা ছেলের পরস্পরের প্রতি টান কত। এও বুঝতে পারে, তারা কী বলতে চাইছিল। তার মানে আমি আগে ঘুমিয়ে গেলে বাবা ছেলে এভাবে ঘুমায় রোজ! কী নাড়ির টান রে বাবা।