নিবিড়ের রাগ কোরবানি

ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২০ | ২২ শ্রাবণ ১৪২৭

নিবিড়ের রাগ কোরবানি

আব্দুল্লাহ আল মাছুম ১২:১১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১১, ২০২০

print
নিবিড়ের রাগ কোরবানি

দিগন্ত জোড়া মাঠের পূর্ব কোনায় দাঁড়িয়ে রয়েছে নিবিড়। আশপাশে হৈ-হুল্লোড় চলছে। কিন্তু নিবিড় নিশ্চল। কী যেন দেখছে। কিছু দূরের কী একটা দেখার চেষ্টা করছে। অনেক বড় বড় মানুষ একটি গরুকে ঘিরে দাঁড়ানো। গরুটি চেনা চেনা লাগছে। আধো আধো দেখা গরুটির ওপর মনোযোগ দেয় নিবিড়। ধীরে ধীরে চিনতে পারে। ‘ওমা! আমার লাল গরু?’ নিবিড়ের আব্বু ও চাচারা কাল দুপুরে কোরবানির জন্য গরুটি কিনে এনেছেন।

গরুটি এখনো মাঠের শুকনো ঘাস চিবুচ্ছে। বারবার নিবিড়ের দিকে তাকাচ্ছে। দু’চোখে পানি। ‘আমার লাল্লু কাঁদছে’Ñ নিবিড় ফুঁপিয়ে ওঠে। নিবিড় লাল গরুর নাম লাল্লু দিয়েছে। লাল্লু শুনতে পায়। লাল্লু একজনকে গুঁতো দিয়ে সরিয়ে দেয়। লাল্লুও নিবিড়কে দেখে। লাল্লু যেন এতক্ষণ নিবিড়ের অপেক্ষাতেই ছিল। নিবিড়কে দেখে বাঁধন ছিড়ে ছুটে আসতে চায়। নিবিড়কে কী যেন বলতে চায়। মায়া লাগে নিবিড়ের। আকাশে মেঘ ডেকে ওঠল। সবাই বলল, বৃষ্টি আসছে।

তাড়াতাড়ি কোরবানি সারতে হবে। লাল্লুকে বেঁধে ফেলল কয়েকজন। নিবিড়ের সে কী চিৎকার! কিন্তু কেউ যেন শুনলই না। নিবিড় চারপাশে তাকিয়ে দেখল এখানে আম্মু নেই। আম্মু থাকলে নিবিড়ের কান্না কেউ না শুনে থাকতে পারত? নিবিড় দিল ছুট। আম্মুকে সব জানিয়ে লাল্লুকে বাঁচাতে অনুরোধ করল। কিন্তু আম্মুকে মাঠে যেতে রাজি করানো গেল না। আম্মু নিবিড়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললেন, লাল্লুর মালিক সাতজন। তিনি চাইলেই লাল্লুকে বাঁচাতে পারবেন না। কিন্তু নিবিড় কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না। এরপর এক প্রশ্ন। বাকি মালিকরা রাজি হলে কী সমস্যা? আম্মু নিবিড়কে প্রথম কোরবানির গল্প শোনালেন। এরপর নিবিড়কে চুমু খেয়ে আরেকটি সুন্দর গল্প শোনালেন।

গল্প শেষে বললেন, ‘তোমার আব্বু যদি কোরবানি না দেয় তাহলে গল্পের শিশুদের গোশত খাওয়াবে কে? ওদের তো মা-বাবা নেই।’ তবু নিবিড়ের মন শান্ত হয় না। তার আব্বু কাল রাতেও বলেছে লাল্লু নিবিড়ের কাছেই থাকবে। কিন্তু আজ আব্বুও লাল্লুর পা বেঁধেছে। নিবিড় দেখেছে। কোনার কক্ষটাতে জানালার দিকে মুখ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল সারাদিন নিবিড়। কিছুতেই কিছু বুঝাতে পারল না কেউ। কত মজার মজার খাবার। কিছুই খেল না। উপোস করে তেমনি গাল ফুলিয়ে বসে থাকল। দুপুরে আব্বু সব কাজ ঘুচিয়ে বাসায় এসে দেখলেন নিবিড় রাগ করেছে। নিবিড়কে জোর করে কোলে তুলে নিলেন।

কত মজার মজার কথা বললেন। এতে নিবিড়ের রাগ যেন আরো বেড়ে গেল। সব অভিযোগ, অভিমান তো আব্বুর বিরুদ্ধেই! অবশেষে আব্বু ভীষণ জোর করে নিবিড়কে বাড়ির ফটকের কাছে নিয়ে এলেন। নিবিড় অবাক! আম্মু তাহলে সত্যি কথাই বলেছে। নিবিড়ের মতোই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এসেছে। আম্মু তাদের রান্না করা গোশত খেতে দিয়েছেন। কিছুক্ষণ পরপরই কেউ কেউ আসছে হাতে থালা বা বাজারের ব্যাগ বা পলিথিন নিয়ে। আম্মু তাদেরও খেতে দিচ্ছেন।

খাওয়া শেষে আম্মু কাঁচা গোশতের কয়েকটি টুকরো তাদের দিয়ে বিদায় দিচ্ছেন। তাদের কারো গায়ে ঈদের পোশাক নেই। কিন্তু গোশত পেয়ে সবাই কী খুশি! ঠিক যেমনটি আম্মু গল্পে বলেছেন। নিবিড় ভাবে, লাল্লুকে কোরবানি না দিলে এরা আজও গোশত খেতে পেত না। ওদের কতই না মন খারাপ হত, ঠিক আমার মতোই। নিবিড় আব্বু-আম্মুর সঙ্গে রাগ করায় লজ্জাবোধ করে। নিবিড় বলে, ‘আমার আব্বু-আম্মু অনেক ভালো। আমি আর কখনো রাগ করব না। রাগকে কোরবানি দিলাম!’