অনামিকার অনলাইন ক্লাস

ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

অনামিকার অনলাইন ক্লাস

রণজিৎ সরকার ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ০৬, ২০২০

print
অনামিকার অনলাইন ক্লাস

করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। হঠাৎ অনামিকাদের স্কুল কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অনামিকা চিন্তায় পড়ে যায়। কীভাবে সে সপ্তম শ্রেণির ক্লাস করবে। বাসায় স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার নেই। ক্লাস না করতে পারলে বন্ধুদের কাছ থেকে পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়বে। অনামিকা বাবা বলে, একটা স্মার্ট ফোন কেনার জন্য। কিন্তু বাবার তো স্মার্ট ফোন কেনার সামর্থ্য নেই। লকডাউনের জন্য কাজকর্ম বন্ধ। ফলে তিন বেলা ঠিকমতো খেতে পারছে না। তার বাবা যে হাত দিয়ে দিনমজুরের কাজ করতেন, সে হাত পেতে রাখতে হচ্ছে এখন ত্রাণ হিসেবে দেওয়া খাবারের অপেক্ষায়। সে খাবার দিয়েই কোনো রকমভাবে দিন পার করছেন।

অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়ে যায়। অনামিকা অনলাইন ক্লাস করার জন্য তার কাছের ধনী বান্ধবী রচনার বাসায় যেতে চায়। কিন্তু রচনার বাবা-মা লকডাউন অবস্থায় তাদের বাসায় কাউকে ঢুকতে দেবে না।

অনামিকা হতাশ হয়ে পড়ে। অনামিকা মাকে বলে, ‘স্কুল থেকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্তটা কি সবার জন্য ঠিক হলো মা?’

মা বললেন, ‘অনলাইনে সবাই যেন ক্লাস করতে পারে। সেটা নিশ্চিত করা উচিত ছিল স্কুল কর্তৃপক্ষের। যাদের বাসায় স্মার্ট ফোন নেই, তাদের স্মার্ট ফোন দেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা করেনি। সিদ্ধান্তটা ঠিক হয়নি।’ অনামিকা রাগে ক্ষোভে বলে, ‘আমি গরিব বলে অনলাইন ক্লাস থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বন্ধুদের থেকে পিছিয়ে যাচ্ছি। সিদ্ধান্তটা আমি মানতে পারছি না মা।’

মা আদর করে আশা দিয়ে বলেন, ‘এই তো আর কয়েক দিন মাত্র। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আবার স্কুলড্রেস পরে স্কুলে যাবে। চিন্তা করো না। মনোযোগ দিয়ে বাসাতেই পড়।’

অনামিকা মায়ের কথা মতো বাসায় মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগে। কিন্তু আবার যখন মনে পড়ে বন্ধুরা অনলাইনে ক্লাস করছে, সে করতে পারছে না, সেটা ভেবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। গরিব বলে বঞ্চিত হচ্ছে এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না। বাসায় আর তার পড়ালেখায় মন বসে না। সবার অজান্তে বাসা থেকে বের হয় অনামিকা।

বাসার লোকজন অনামিকাকে খুঁজে পায় না। কোথায় গেল। মা ভাবেন, অনলাইনে ক্লাস করার জন্য তার বান্ধবী রচনার বাসায় গিয়েছে হয়তো। সেখানে খোঁজ নিয়ে দেখে অনামিকা যায়নি রচনার বাসায়। স্কুলের পাশের বাসার রাশি দৌড়ে এসে অনামিকার মায়ের কাছে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘অনামিকাকে তো স্কুলে দেখলাম।’

কান্না শুনে বুঝতে পারল অনামিকার কিছু একটা হয়েছে। বাবা-মা দৌড়ে গেলেন স্কুলে। স্কুলে গিয়ে দেখে আমগাছের ডালে অনামিকার মৃতদেহ ঝুলছে। সন্তান হারানো মা-বাবার আর্তনাদে স্কুলে অনেকে এসে উপস্থিত হলেন। অনামিকার মৃতদেহ নামানো হয়। অনামিকার বাম হাতে একটা সাদা কাগজ। হাত থেকে কাগজ বের করলেন প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান। তিনি কাগজে কালো কালি দিয়ে লেখাটা পড়লেন। পড়ার পর অপরাধ বোধের জায়গায় থেকে অঝোর ধারায় চোখের পানি ফেলতে লাগলেন। সুইসাইড নোটে লেখাÑ ‘আপনারা শিক্ষার বৈষম্য দূর করুন।’
পাঁচ শব্দের একটা বাক্য শোনার পর স্তব্ধ হয়ে গেলেন সবাই।