শিকারি দাদু

ঢাকা, রবিবার, ৭ জুন ২০২০ | ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

শিকারি দাদু

আলোক আচার্য ৭:১৬ অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২০

print
শিকারি দাদু

ফাহাদের দাদু বেড়াতে এসেছেন আজ সকালে। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। মাথার সব চুলে পাক ধরেছে। তিনি কলপও করেন না। ফলে কাঁচা চুলগুলোই আলাদা করে চেনা যায়। ফাহাদ দাদুকে খুব ভালোবাসে। দাদু যখন গ্রাম থেকে বেড়াতে আসেন তখন আসার সময় সঙ্গে নিয়ে আসেন একগাদা দেশি ফল। দাদু বলেন, এসব দেশি ফলে প্রচুর ভিটামিন থাকে। ফাহাদ সেগুলো একা খায় না। তার স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে খায়।

এবারও এনেছেন। গ্রামের বাড়িতে প্রচুর গাছপালা আছে। আর শহরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা। দাদুর সঙ্গে তার অনেক গল্পও হয়। যে কয়দিন দাদু থাকেন ফাহাদ দাদুর সঙ্গেই ঘুমায়। দাদুই তখন তার দিনরাত্রি হয়ে ওঠে। একদিন স্কুলে না গেলেও মা-বাবা কিছুই বলেন না। বিষয়টা ফাহাদের বেশ লাগে। তবে তার দাদু নাকি ভালো শিকার করতে পারতেন। তার পাখি মারার একটা বিশাল বন্দুক সে গ্রামের বাড়িতে দেখেছে। একবার সে দাদুকে বলেছিল, ‘এটা দিয়ে তুমি কী কর দাদু?’

দাদু শুধু উত্তরে বলেছিলেন, ‘কিছু না। একসময় করতাম।’

‘একসময় কী করতে দাদু?’

‘পাখি শিকার করতাম।’

‘তবে যে তুমি বল পাখি মারা ভালো কাজ না। তাহলে তুমি যে মারতে?’

‘সে অনেক কথা দাদু। তোমাকে অন্য একদিন বলব।’ফাহাদ মনে মনে ভেবে রেখেছিল এরপর যখন দাদু আসবেন তখন পাখি মারার গল্প শুনবে। আজ তাই দাদুর কাছ থেকে এই গল্প শুনতেই হবে। রাতে খাওয়ার পরই সাধারণত দাদুর কাছে গল্প শুনতে বসে সে। আজও রাতে খাওয়া শেষ করেই দাদুর ঘরে এসে হাজির হয়। ফাহাদকে দেখেই তার দাদু বুঝে যান কেন এসেছে।

‘এসো দাদু। তোমার জন্যই বসেছিলাম। গল্প না শুনলে তো তোমার ঘুমই হবে না। তাই না?’

‘হু। তবে আজ তোমার পাখি শিকারের গল্প শুনতে চাই, দাদু।’

‘কিন্তু ওসব কাজ তো ভালো না দাদু। তুমি অন্য গল্প শোনো।’

‘একদিনই তো শুনব দাদু। তুমি নাকি খুব বড় পাখি শিকারি ছিলে?’

‘তা ছিলাম। কিন্তু পরে তো ছেড়ে দিয়েছি। বন্দুকটাও আলমারিতে তোলা রয়েছে। তা তো নিজ চোখেই দেখেছ। পাখি মারা ভালো কাজ না। কখনো পাখি মারবে না।’

‘তুমি পাখি শিকার বাদ দিলে কেন?’

‘সে এক ঘটনা আছে। সেই ঘটনার পর থেকে আমি আর পাখি শিকার করি না।’

‘সেই ঘটনাটাই না হয় বল আজকে।’

‘ঠিক আছে, শোনো তাহলে। আমি একদিন পাখি শিকার করার জন্য বন্দুক নিয়ে বের হয়েছি। জলার ধারে কয়েকটা পানকৌড়ি শিকার করেছিও। তারপর যখন বাড়ির দিকে ফিরছি তখন হঠাৎ এক ডালে জোড়া ঘুঘু দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম।

বন্দুকের নল তাক করলাম একটার দিকে। জানি বন্দুকের গুলি লেগে একটা ঘুঘু মারা যাবে। একটা যাবে উড়ে। গুলি লেগে একটা ঘুঘু ঠিকই পড়ে গেল। কিন্তু...?’

‘কিন্তু কী দাদু?’

‘আরেকটি ঘুঘু উড়ে না গিয়ে অদ্ভুত কা- করল। পাশের ডালে তার মাথা ঠোকরাতে লাগল। আমি তো দেখে অবাক। তার দিকে বন্দুক তাক করাও ভুলে গেছি। ডালে নিজের মাথা ঠুকতে ঠুকতে একসময় সেও তার সঙ্গী ঘুঘুর পাশে মরে পড়ে রইল। আমি এই ঘটনায় খুবই কষ্ট পেলাম।’

‘সেদিন থেকেই পাখি শিকার বন্ধ করলে?’

‘হু। সেদিন থেকেই আমি প্রতিজ্ঞা করলাম আর বন্দুক হাতে তুলব না।

তারপর থেকে আর কোনোদিন বন্দুক হাতে নিইনি। কোনোদিন পাখিও শিকার করিনি। যাদের পাখি শিকার করতে দেখি তাদের নিষেধ করি। এই যেমন তোমাকেও নিষেধ করলাম। পাখিদেরও জীবন আছে। ভালোবাসা আছে। ওরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তাই পাখি শিকার মোটেই ভালো কাজ না। তুমি জীবনেও পাখি শিকার করবে না। গায়ে ঢিল ছুড়বে না। এমনকি খাঁচায় ভরেও রাখবে না। এসবই খারাপ কাজ। বুঝলে?’

বুঝলাম দাদু। ফাহাদ দাদুর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে, তাদের বাসার সামনে একঝাঁক পাখি ওড়াওড়ি করছে। নানা রকম পাখি দেখে আনন্দে হাততালি দিচ্ছে অনেক শিশু।