দিপুদের শহীদ মিনার নির্মাণ

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০ | ২৭ চৈত্র ১৪২৬

দিপুদের শহীদ মিনার নির্মাণ

শরিফুল ইসলাম ৩:৩৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২০

print
দিপুদের শহীদ মিনার নির্মাণ

সময় ফাগুন মাস! ঋতুরাজ বসন্তের ছোঁয়ায় বনে বনে ফুলে ফুলে ভরে উঠছে গাছের কোমল ডগা। মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে সংগ্রহ করছে মধু। ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন বই নিয়ে ঝিনাই খালের বাঁধ পেরিয়ে বিদ্যালয়ের দিকে যাচ্ছে। সকলের মনেই কেমন খুশি খুশি ভাব!

ঝিনাই খালের বাঁধ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় দিপুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দিপুর বয়স এগার বছর, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। পড়ালেখায় খুব একটা ভালো না থাকলেও দিপুর মাথা একদম টাটকা! খুব একটা কথা বলে না দিপু, চুপচাপ স্বভাবের। তাই তো পড়ালেখায়ও চুপচাপ। মুখ চুপচাপ থাকে বলে যে তার হাত স্তব্ধ থাকে তা কিন্তু নয়। দিপুর হাত যথেষ্ট চঞ্চল।

দিপু বেশ ছোটবেলা থেকেই নানারকম ফেলনা জিনিস থেকে অনেক ধরনের খেলনা তৈরি করত, ছবি আঁকত। আবার মাঝে মাঝে ছড়া কাটতো মনের সুখে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ে তার ভাঙা বিমানের এক অংশ দিয়ে একটি ব্যাটারিচালিত ফ্যান তৈরি করে। যা দিয়ে গ্রীষ্মের ঋতুতে ঠাণ্ডা হাওয়া গ্রহণ করছে আবার বাল্বের সাহায্যে আঁধার ঘর আলোকিত করছে। এভাবেই সে একেক সময় একেক জিনিস তৈরি করে।

আজ নতুন শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছে দিপু। সঙ্গে আছে রোহিত, রানু, রাসেল, লালু আর মুন্না। লালু, রাসেল, মুন্না এবার তৃতীয় শ্রেণিতে। রোহিত ও রানু চতুর্থ শ্রেণিতে। এখানে সবার বড় দিপু, তাকে এরা ভাই ডাকে। সকলেই দিপুর কথা মেনে চলে।

ফাগুন মাস মানেই শীতের শেষের দিক। শীতের শেষ দিক মানেই তো ফেব্রুয়ারি মাসের আগমন। ফেব্রুয়ারি মাসেই শুরু হয় শহিদ মিনার সংস্কারের কাজ। দিপুদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বেশ দূরে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে পালন করা হয় মাতৃভাষা দিবস। ছাত্রছাত্রীরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাতে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে খালি পায়ে চলে আসে বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা আসে না। তাদের শহীদ মিনার নেই, কোথায় ফুল দেবে?

দিপুদের বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। যাতায়াতে সময় লাগে একঘণ্টার মতো। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মতোই দিপুদের মনেও সাধ জাগে, ভোরে খালি পায়ে এসে ভাষা শহীদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর। বিদ্যালয় যে যে অনেক দূরে!

তারপর দিপু, রোহিত, রানু, রাসেল, লালু ও মুন্না একসঙ্গে বসে পরামর্শ শুরু করল। কী করা যায়? ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই হবে।
একসময় দিপু বলল- চলো, আমাদের বাড়ির পাশে কোনো এক ফাঁকা স্থানে শহীদ মিনার স্থাপন করি!

রোহিত বলে উঠলো, এত ইট পাথর সিমেন্ট পাবো কোথায়? অনেক টাকা লাগবে তো, আর আমরা কি তৈরি করতে পারব?

দিপু বলল, শুধু কি ইট পাথর দিয়েই শহিদ মিনার বানাতে হবে নাকি? তোমরা যার যার বাড়ি থেকে মোটামোটা পাটকাঠি নিয়ে আসবে। বাকি কাজ আমি করব। শুধু আমাকে সাহায্য করবে। বাড়ি ফিরে তাদের কাজ শুরু করে দিলএ একপর্যায়ে শহউদ মিনার তৈরির কাজও সম্পন্ন হলো।

একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরবেলায় একুশের গান ও স্লোগানে ফুল দিল ভাষাশহীদের স্মৃতির উদ্দেশে নবনির্মিত শহীদ মিনারে।
এভাবেই শেষ হলো দিপুদের ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো।