পরীর ডানায় বাঘের ছবি

ঢাকা, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ | ২৭ আষাঢ় ১৪২৭

পরীর ডানায় বাঘের ছবি

মালেক মাহমুদ ১২:২৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২০

print
পরীর ডানায় বাঘের ছবি

গ্রামের নাম বাঘমাড়ি। বাঘ মারা গেছে এখানে। তাই বাঘমারা নামে চেনে দশ গ্রামের লোক। বাঘের আনাগোনা এখন আর নেই। বাবুল কখনো বাঘ দ্যাখেনি, বাঘের ছবি দেখে বড় হচ্ছে। বইয়ের পাতায় দেখেছে বাঘের ছবি। বাঘমাড়ি গ্রামের ছেলে বাবুল।

বাবুল জানে, মাড়ি অর্থ মারামারি নয়। মেরে ফেলা নয়। মাড়ি অর্থ মাড়ির দাঁত বা দন্তমূল। শক্ত দাঁত। এই বাঘমাড়ি গ্রামের ছেলে বাবুল। সকালে গিয়েছিল খালাবাড়ি, বিকালে বাড়ির দিকে ফিরছে। পথে যা দেখে, তা দেখে চোখ চড়কগাছ। দেখতেই থাকে, এদিকে সূর্য ডুবুডুবু। হঠাৎ তার মনে পড়ে বাড়ি ফিরতে হবে। আর দেরি নয়, এবার বাড়ির দিকে হাঁটে বাবুল। এখনো বেশ কিছু পথ একা হাঁটতে হবে তাকে। ফাঁকা পথ। আরো ফাঁকা মনে হচ্ছে এখন। পথে মানুষজন নাই বললেই চলে। মাঝ পথে ঝাঁকড়া বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে একা। এই বটগাছের নিচ দিয়ে যেতে হবে বাবুলকে। বটতলা যাওয়ার আগেই সূর্য ডুবে গেল। কালো রাতের হাত ছানি দেখা দিল। কিশোর বাবুল বড্ড সাহসী। থেমে যাওয়ার ছেলে সে নয়। হাঁটছে আরও বেগের সাথে। বাড়ি ফিরতে হবে মায়ের জন্য, মা বাবুলের জন্য বসে আছে। কখন আসবে সোনার ছেলে বাবুল। বটতলা দিয়ে হাঁটছে। আলোহীন পথ আলোকিত হয়ে গেল। বাবুল হাঁটছে, আলোও একা একা হাঁটছে।

আলো কি আর হাঁটতে পারে?
সামনের দিক দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে আলোর কিরণ। আলোতে আলোতে বাড়ি চলে এলো বাবুল।
মা বাবুলকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে। আনন্দে কেঁদে ফেলে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। আর বলতে থাকে, এই ঘুটঘুটে আন্ধারের মধ্যে তুই কি করে এলি বাপ?
কেনো? হেঁটে, আমিতো আলোতেই এলাম, তুমি অন্ধকার কোথায় দেখলে মা?
কি বলিস! আন্ধাকার রাতে আলো পেলি কই?
আমি এলাম, আমার সামনে তো আলোই দেখলাম।
মা, আর কথা বাড়ালো না। বলে, আয় খাবি। তোর ভাত ঠা-া হয়ে যাচ্ছে। মায়ের হাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যায় বাবুল। নরম বিছানায় আরাম করে ঘুমায় প্রতিদিন। আজ আর ঘুম আসছে না। মায়ের কথা কানে বাজতে লাগল। আন্ধার রাতে আলো পেলি কই?
সত্যিতো, আমার কাছে কোনো আলো ছিলো না। টর্সলাইট কিম্বা লন্ঠন! আন্ধারি রাতে আলো এলো কোথা থেকে?
এই কথা ভাবতে গিয়ে বাবুলের মনে ভয় চলে এলো। যে ভয় আসার পথে পায়নি সেই ভয় এখন, বাবুলের মনে সে ভয় বাসা বেঁধেছে। ভীতু মন নিয়ে কখন যেনো ঘুমিয়ে পড়েছে বাবুল।
‘বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়’ বলে একটা প্রবাদ আছে। মনের ভেতর বাঘ বসবাস করতে লাগলো। এই মনের বাঘ তারে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। বাবুলের শরীরে জ্বর এসে গেল। মা বাবুলের শরীরে জ্বর দেখে মাথায় জলপট্টি দিতে লাগল। এতে বাবুলের জ্বরের কোনো উন্নতি দেখে না, মায়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় মা। বাবুলের বেশ ভালোলাগে। মায়ের আদরে মুখে হাসি ফোটে। মাকে প্রশ্ন করে বাবুল- রাতে যে আমি এলাম, আমার আগে আগে যে আলো এলো এ কিসের আলো, মা?
কেনো রে বাপ, তুই কি ভয় পেয়ছিস?
না।
তা হলে আর কি।
আমার কাছে মনে হয়, আমারে ভয় দেখাতো, কেনো যেনো দেখায়নি।
কে তোকে ভয় দেখাতো, তুই কি দেখেছিস?
আলো।
আলো কখনো ভয় দেখায়?
আর কি দেখেছিস?
সেদিন বিকালেবেলা। খালাবাড়ি থেকে আসছি। পথের ধারে বিশাল একটি ছবি দেখে ছিলাম।
কিসের ছবি?
পরির ডানায় বাঘের ছবি।
সে আবার কি বাপ?
খালাবাড়ি থেকে নামছি, হাঁটছি। চোখ আটকে গেলো পরির দিকে। আমার চোখ তো চড়কগাছ। আমি কখনো দেখি নি এমন ছবি। এমন সময় এক মাঝ বয়সি লোক এসে আমাকে বলে, তুমি কি দেখছো?
আমি বলি, পরির ডানায় বাঘের ছবি।
বেশ দেখেছো, তুমি বাঘমাড়ি থাকো না?
হ্যাঁ, থাকি তো।
তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও, রাত ঘনিয়ে আসছে। পরে বাড়ি ফিরতে পারবে না। আমি সেই লোকটির কথা মেনে চলে এলাম।