তিন বার হাঁচলেই

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর ২০২২ | ১৯ আশ্বিন ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

তিন বার হাঁচলেই

সিদ্ধার্থ সিংহ
🕐 ১২:৪৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৩, ২০১৯

তিন বার হাঁচলেই

এক ছিল চাষি। তার ছিল অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। ছেলেমেয়েরা বড় হলো। তাদের বিয়ে হলো। মেয়েরা চলে গেল শ্বশুরবাড়ি। ছেলেরা রইল বাবার কাছে। চাষিও বুড়ো হলো। বড় ছেলে আর ছেলের বউ চাইল চাষি এবার খামার তদারকি করার ভার তাদের ওপরে ছেড়ে দিক। বুড়ো হলেও চাষি ছিল তখনো বেশ শক্তসমর্থ। ছেলে আর ছেলে-বউয়ের হাতে সে খামারের দায়িত্ব ছাড়তে চাইল না। যদিও সে বুঝতে পারত, তার বয়স হয়েছে, এবার তার চলে যাওয়ার পালা। ফলে আজ হোক আর কাল, খামার দেখাশোনার ভার গিয়ে পড়বে বড় ছেলে আর ছেলে-বউয়ের হাতেই। কথাটা ভাবতে তার মোটেই ভালো লাগত না।

একদিন এক সাধুবাবার কাছে গিয়ে বুড়ো চাষি জানতে চাইল, বাবা, দেখুন তো, আমি আর কত দিন বাঁচব?

বুড়োর দিকে তাকিয়ে সাধুবাবা একটু হাসলেন। বললেন, তুমি তিনবার হাঁচলেই বুঝবে যে, তোমার মরণ দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাধুবাবাকে প্রণাম করে বুড়ো চাষি বিষণ্ন মনে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। ভাবতে লাগল, একবারও না হেঁচে কী করে থাকা যায়। ভাবতে ভাবতে সবে সে বাড়ির উঠোনে পা দিয়েছে, ঠিক তখনই নাকের ভিতরটা সুড়সুড় করে উঠল। হ্যাচ্চো! শত চেষ্টা করেও হাঁচি আটকাতে পারল না বুড়ো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বুড়ো বলল। হায় ভগবান, আর মোটে দুটো হাঁচি বাকি!

পরদিন ফসলের দানা ভাঙানোর জন্য বুড়ো পেষাই মিলে গেল। সেখানে হঠাৎ হাওয়ায় উড়ে ময়দার গুঁড়ো নাকের মধ্যে ঢুকে যেতেই আবারও হ্যাচ্চো! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুড়ো ভাবল, আর মাত্র একটা হাঁচি বাকি! পাছে আবার হাঁচি পায়, সেই ভয়ে বুড়ো এক দৌড়ে মিল থেকে বেরিয়ে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই গম পেষাই করে ময়দা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং ময়দার বস্তা আনার জন্য বুড়ো চাষিকে আবার মিলের ভিতরে ঢুকতে হলো। ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই দামাল বাতাসে বস্তার গায়ে লেগে থাকা ময়দার গুঁড়ো উড়ে এসে তার নাকের মধ্যে ঢুকে গেল। নাক আবার সুড়সুড় করে উঠল। সামলাবার জন্য অনেক চেষ্টা করল বুড়ো। কিন্তু কিছুতেই পারল না। তিন নম্বর হাঁচিটাও হেঁচে ফেলল সে, হ্যাচ্চো!

হায় ভগবান! আর রক্ষে নেই আমার। ভাবা মাত্রই তার শরীর অবশ হয়ে এলো। গায়ে যেন আর কোনো জোর নেই তার। ময়দায় বস্তাটাকে রেখে মেঝের ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল বুড়ো। মেঝেতে ময়দার বস্তা দেখে মিলওয়ালার শুয়োরগুলো ছুটে এসে দাঁত দিয়ে বস্তাগুলো কাটতে লাগল।
শুয়োরগুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল বুড়ো। করুণ সুরে বলল, আরে হতচ্ছাড়া, পাঁজি। আমি যদি বেঁচে থাকতাম, তা হলে তোদের উচিত শিক্ষা দিতে পারতাম। কিন্তু একটা মরা মানুষ আর কীই বা করতে পারে! এমন সময় মিলের মালিক এসে পড়ল সেখানে। সে অবাক হয়ে দেখল, একটা লোক হাত-পা ছড়িয়ে মেঝের ওপরে শুয়ে আছে আর শুয়োরগুলো তার ময়দার বস্তা ছিঁড়ছে। তাই মিলের মালিক বলল, এখানে শুয়ে আছ কেন বুড়ো? বুড়ো চাষি বলল, কী আর করব! শুয়ে আছি। মরা মানুষ আর কীই বা করতে পারে! বেঁচে থাকলে না হয় আমি তোমার ওই শুয়োর আর শুয়োরের বাচ্চাগুলোকে তাড়িয়ে দিতে পারতাম। তুমি ভাই দয়া করে আমার একটা কাজ করে দেবে?

এ কথা শুনে মিল-মালিক আরও অবাক হয়ে গেল। হাসি চেপে গম্ভীর মুখে সে বলল, ও হ্যাঁ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, তুমি মরে গিয়েছ। খুবই দুঃখের ব্যাপার... খুবই শোকের ব্যাপার... তবু তুমি যখন বলছ, ঠিক আছে, তোমার কাজ আমি করে দিচ্ছি। ওদের তাড়িয়ে দিচ্ছি। বলেই, মিলের মালিক নিমিষের মধ্যে ভেতরের ঘর থেকে একটা চাবুক নিয়ে এলো। তারপর সপাসপ চাবুক চালাতে লাগল শুয়োরগুলোর ওপরে। একটা দৌড় লাগাতেই বাকি শুয়োরগুলোও ছুটে পালিয়ে গেল। এর পর মিলের মালিক বুড়োকে লক্ষ্য করে চাবুক নাচাতে লাগল।

সঙ্গে সঙ্গে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল বুড়ো। আর যেই উঠল, বুড়ো বুঝতে পারল, সে শুধু বেঁচে নেই, ভীষণভাবে বেঁচে আছে। মিলের মালিককে বলল, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তুমি আমাকে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছ। তুমি না এলে আমি হয়তো এখানেই মরে পড়ে থাকতাম। বলেই, ময়দার বস্তাটা ঘাড়ে নিয়ে বুড়ো বাড়ির দিকে পা চালাল। এর পর থেকে সে আর কোনো দিন তার মরার কথা তো ভাবেইনি, কোনো সাধুবাবার কাছে গিয়ে জানতেও চায়নি, সে আর কত দিন বাঁচবে। সেই বুড়ো চাষি বোধহয় আজও বেঁচে আছে বহাল তবিয়তে।

 
Electronic Paper