লাল ফড়িঙের মন খারাপ

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গল্প

লাল ফড়িঙের মন খারাপ

সাধন সরকার ১২:০৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৯, ২০১৯

print
লাল ফড়িঙের মন খারাপ

বুড়ো লাল ফড়িংটা বেশ চিন্তিত! চিন্তাটা বেশ কয়েক মাস ধরেই। ধীরে ধীরে চারপাশের চিরচেনা পরিবেশটা যেন বদলে যাচ্ছে! আগের মতো সবুজ ঘাসের ওপর লুটোপটি করতে পারে না লাল ফড়িং। সবুজ ঘাসগুলো যেন উধাও হয়ে যাচ্ছে! তৈরি হচ্ছে বিশালাকার দৈত্যের মতো বাড়ি। মাটির বুক চিড়ে যা ইচ্ছে তাই করা হচ্ছে! নিঃশ^াস নিয়েও লাল ফড়িং মজা পাচ্ছে না। বাতাস যেন আগের মতো মনে দোলা দেয় না। চারদিকে শব্দের মাত্রা আগের থেকে বাড়ছে ছাড়া কমছে না। বেচারা লাল ফড়িং কোনো কূলকিনারা খুঁজে পায় না!

লাল ফড়িং গেল তার বন্ধু প্রজাপতির কাছে। প্রজাপতির কাছে লাল ফড়িং তার মনের সব কথা খুলে বলল। প্রজাপতি বলল, ‘বন্ধু, আমিও আগের মতো এখন আর শান্তিতে নেই। চারদিকে শুধু দূষণ। বন-জঙ্গল, ঝোঁপঝাড় দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। প্রাণভরে নিঃশ^াস নিতে পারি না। চারদিকে কান ফাটা শব্দ, খুব খারাপ লাগে। দূরে কোথাও চলে যাব; যেখানে কোনো শব্দ নেই, অনেক দূরে।’ বন্ধুর মুখে এসব কথা শুনে লাল ফড়িঙের মন আরও খারাপ হয়ে যায়। চারপাশের অনেক কিছুই যে বদলে যাচ্ছে তা ঠিকই বুঝতে পারছে লাল ফড়িং! লাল ফড়িং এবার গেল তার আরেক বন্ধু পিঁপড়ার কাছে। পিঁপড়ার কাছে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বলল। পিঁপড়া বলল, ‘আমি তো তোমাদের মতো উড়ে বেড়াতে পারি না। তবে এখন মাটির অনেক পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে। চারদিকে কেবল শক্ত ইট আর ইট।

মাঝে মাঝে হঠাৎ আমরা বিশাল পানির কারণে ভেসে যায় একূল থেকে ওকূলে। জানি না আরও কত কী ঘটবে!’ পিঁপড়া বন্ধুর কাছে এসব শোনার পর লাল ফড়িঙের মধ্যে কিছু করার চিন্তা ঘুরপাক করতে থাকে। এবার লাল ফড়িং গেল তার আরেক বন্ধু ঝিঁঝিপোকার কাছে। ঝিঁঝিপোকা সব শোনার পর বলল, ‘আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ। তোমাদের তো জায়গা-টায়গা আছে, আমাদের বসবাসের জায়গা নেই বললেই চলে!

মাঝে মাঝে যখন সন্ধ্যায় ডাকতে বের হই তখন চারদিকে শুধু হইচই। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অন্ধকারে আমাদের আলো দেখে খুব মজা পায়। অনেকে আবার আদরও করে। দুষ্টুমির ছলে অনেকে আবার বোতলে ভরে আমাদের রেখে দেয়, তখন খুব কষ্ট পায়। আর চারদিকে নানাবিধ দূষণের যন্ত্রণা তো আছেই।’ পিঁপড়ার বুঝতে কষ্ট হলো না যে, ঝিঁঝিপোকাও ভালো নেই। লাল ফড়িং এবার গেল ব্যাঙের কাছে। গিয়ে সব ঘটনা খুলে বলল। ব্যাঙ বলল, ‘আমাদের বসবাসের ও ঘুরে বেড়ানোর জায়গা ছোট হয়ে আসছে। খাল-বিল, নদী-নালায় সবখানেই আমাদের বিপদ বাড়ছে। পানিও দিন দিন দূষিত হয়ে যাচ্ছে, কী যে করি!’ কী করা যায়, এই বিষয়ে চিন্তা করতে শুরু করে দেয় ব্যাঙ ও লাল ফড়িং। হঠাৎ চড়ুই পাখি এসেছে লাল ফড়িঙের সাথে দেখা করতে। চড়ুই বলল, ‘গাছপালা এখন অনেক কমে গেছে, বাসাবাড়িতে থাকতে হয়। চারদিকে অজানা ভয়, কোলাহল।’ বাসাবাড়ির মধ্যেও আমরা দূষণের শিকার হচ্ছি! এবার লাল ফড়িঙের সাথে দেখা হয় ইঁদুর মশাইয়ের। ইঁদুর মশাই সব শুনে বলল, ‘ভাই লাল ফড়িং, আমি গ্রামের রাসায়নিক দূষণ আর ফাঁদ থেকে বাঁচতে শহরে চলে এসেছি। এখানে এসেও দেখি শান্তি নাই! সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়, কে জানি খপ করে ধরে ফেলে! শহরের ছেলেমেয়েরা আবার আমাদের মতো মোটা ইঁদুর দেখে ভয়ও পায়! তবে খেয়েদুয়ে আগের থেকে মোটা হয়েছি বেশ। শব্দের যন্ত্রণায় দিনে-রাতে ভালো মতো ঘুমাতে পারি না। তবে শহরের নালাগুলোর মধ্যে অনেক খাবার পাওয়া যায়!’ পাশের একটা গাছে বসে চুপে চুপে লাল ফড়িং ও ইঁদুরের গল্প শুনে কাঠবিড়ালি বেশ মজা পায়।

উপর থেকে কাঠবিড়ালি বলে, ‘শহরে আর এখন আগের মতো শান্তি নেই। গাছগাছালি এখন দিন দিন কমে যাচ্ছে। চারদিকে মানুষ আর মানুষ। কোলাহল, দূষণ আগের থেকে বেড়ে যাচ্ছে।’ লাল ফড়িংসহ সব বন্ধুরা মিলে কী করা যায় চিন্তা করতে থাকে। কেউ বলে, আমরা শহর ছেড়ে চলে গেলেই তো পারি।’ আবার কেউ বলে, ‘বায়ুদূষণের যন্ত্রণা তো শুধু আমাদের না, মানুষও তো এ নিয়ে অতিষ্ঠ। অচিরেই সব ঠিক হয়ে যাবে!’ ব্যাঙ বলে, ‘খাল-বিল-নালার পানি কমে যাচ্ছে। শব্দদূষণ সহ্য করা যায়, কিন্তু পানি না থাকলে আমরা কোথায় যাব!’ ইঁদুর ও পিঁপড়া বলে, ‘মাটি দূষণ হলে আমরা টিকটে পারব না।’

এমন সময় হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। কিছুক্ষণের মধ্যে অঝোর বর্ষণ! লাল ফড়িংসহ সব বন্ধুরা খুশি হয়। প্রজাপতি দূষণমুক্ত পরিবেশে উড়ে যায়। পিঁপড়া বন্ধু চড়ুই পাখির পিঠে চড়ে নিরাপদে চলে যায়। ব্যাঙ মনের সুখে ডাকতে শুরু করে। ঝিঁঝিপোকাও খুশি মনে বাসায় ফিরে। একসময় বৃষ্টি শেষ হয়। চারপাশ ধুঁয়ে-পরিষ্কার হয়ে নতুন করে জেগে ওঠে।