পোষা মাছের পাঁচ ভাই

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

পোষা মাছের পাঁচ ভাই

গল্প

চন্দন চৌধুরী ১:১৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৫, ২০১৯

print
পোষা মাছের পাঁচ ভাই

মিনতারাকে ধরার জন্য জাল ফেলতে হয় না। হাতটা শুধু জলের নিচে রাখলেই চলে আসে মুঠোয়। সবার হাতে আসে না। শুধু সারির হাতটাই বেশি পরিচিত। এই পোষা মাছটার কথা শুধু সারিই জানে। মিনতারাকে নিয়ে সে মাঝে মাঝেই ভয় পায়, কে জানি আবার এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়! সারি যখন মিনতারার জীবিত চোখের দিকে তাকায় মনে হয় বাঁচার জন্য সে কী আকুতি! যদিও সে কোনো মরা মাছের চোখে কোনোদিন এমন বাঁচার আকুতি দেখেইনি। তো সেই মিনতারার পাঁচ ভাই বেড়াতে এলো একবার।

নদীর ঘাটে মিনতারাকে সারির হাতে উঠতে দেখে ভাইয়েরা তো ভীষণ অবাক! এরপর সে যে বেঁচে ফিরেছে এতে তারা আরও অবাক! বড় ভাই রসক বলল, ‘তুই এত বোকা বোন, ওই মানুষটা যদি তোকে নিয়ে যেত। এরপর কেটে রেঁধে খেত।’ মিনতারা বলল, ‘দেখো, তোমরা আমাকে দেখতে এসেছ। এখন সবাই চুপ করো। আগামীকাল আমার বন্ধু সারি যখন আসবে, তোমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব।’ পরের দিন সারি আসতেই মিনতারা বলল, ‘এই যে দেখো, আমার পাঁচ ভাই বেড়াতে এসেছে। এত দিন ওরা পণ্ডিতের পাঠশালায় ছিল। অনেক লেখাপড়া শিখেছে। এরা এখন মাছ সমাজের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী।’

পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সারি বলল, তোমাদের বোনকে যদি কোনো মানুষ ধরে নিয়ে যায় তবে কি ছাড়িয়ে আনতে পারবে?’ রসক বলল, ‘দেখো, এটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু পাঁচ ভাইয়ের পক্ষে সম্ভব।’ এমন কথায় কিছুটা আশ্চর্য হলো সারি। জানতে চাইল, ‘সেটা কীভাবে সম্ভব?’ তখন রসক বলল, ‘আমাদের পাঁচ ভাইয়ের পাঁচ রকমের ক্ষমতা আছে।

যেমন, আমি পিঁপড়ে হয়ে যেতে পারি। আমি অনেক দূর থেকেই বলতে পারি কে কোথায় আছে। কসক হতে পারে প্রজাপতি। সিরক হতে পারে ব্যাঙ। বুলক হতে পারে সাপ। তবে তার কোনো বিষ নেই। আর মসক হতে পারে কাক।’ মাছদের এমন কথা শুনে অবাক হওয়ার আর বাকি থাকল না সারির। কিন্তু তাদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য এরই মধ্যে সময়ও এসে গেল। দুই দিন পর সত্যি সত্যিই এক জেলের জালে ধরা পড়ল মিনতারা। একমাত্র বোনকে হারিয়ে পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। তখন সারি বলল, ‘এখন তোমরা তোমাদের বিদ্যা ফলিয়ে তোমাদের বোনকে বের করে আনো।’ রসক দ্বিতীয় ভাই কসককে বলল, ‘আমি পিঁপড়ে হচ্ছি।

তুই প্রজাপতি হয়ে আমাকে আশপাশের বিভিন্ন বাড়ির সামনে নিয়ে চল। আমি ঘ্রাণ শুঁকেই বলে দিতে পারব কোন ঘরে আমার বোন আছে। তারপর পিঁপড়ে হয়ে সেই ঘরে ঢুকে অবস্থাটা দেখেও আসতে পারব।’ প্রজাপতি হয়ে গেল কসক। তার ডানায় চড়ে ছুটল রসক। তিনটি বাড়ি পেরোতেই রসক বলল, ‘শোন, এখানে আমি মিনতারার গন্ধ পাচ্ছি। এ বাড়ির কোনো একটা ঘরেই আছে আমাদের বোনটি।’

রসককে ডানা থেকে নামিয়ে দিয়ে বাগানে বসে রইল কসক। রসক ঘরে ঢুকে দেখল একটা ঝুড়িতে অনেক মাছের সঙ্গে তাদের বোন মিনতারাও আছে। বাঁচার জন্য ছটফট করছে তাদের বোনটি। অবস্থা পুরোপুরি দেখে ফিরে এলো রসক। তারপর পাঁচ ভাই পরামর্শ করল। ঠিক হলো সিরক ব্যাঙ হয়ে চতুর্থ বাড়িতে যাবে, তাকে সাপ হয়ে তাড়া করবে বুলক।

মানুষগুলো যখন সাপ ও ব্যাঙের দৌড়াদৌড়ি দেখবে সেই ফাঁকেই কাক হয়ে মসক তার বোন মিনতারাকে নিয়ে উড়ে চলে আসবে। তবে সাপকে যদি কেউ মারতে আসে তবে সে যেন অবশ্যই ব্যাঙকে ছেড়ে দিয়ে মানুষকে ভয় দেখায়। পরামর্শ অনুযায়ী কাজ। ঢুকতেই দেখল একজন মহিলা মাছ কাটতে বসেছে দা নিয়ে। সেই মাছগুলোর মধ্যে অর্ধমৃত নিজের বোনটাকেও দেখতে পেল সে। আর দেরি করল না মসক। ছোঁ মেরে দুই পায়ে নিজের বোনটাকে নিয়ে উড়ে পালাল।

মিনতারাকে নিয়ে নিরাপদে চলে এসেছে মসক। নদীর কাছে গিয়ে মিনতারাকে জলে রাখতেই প্রাণ ফিরে পেল সে। রসক আর কসক জড়িয়ে ধরল বোনকে। এদিকে মসকও আবার মাছ হয়ে গেল। মাছের রূপে ফিরে এলো সিরক ও বুলক। পাঁচ ভাইয়ের কারণেই বেঁচে গেল মিনতারা।