শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারের কবর খুঁজে পেলেন স্বজনরা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ মার্চ ২০২১ | ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারের কবর খুঁজে পেলেন স্বজনরা

রিপন দাস, বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি ৬:৩৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০২১

print
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারের কবর খুঁজে পেলেন স্বজনরা

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের কবরের খোঁজ পেয়েছেন স্বজনরা। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের চাঁনপুর-হাশিমপুর দরিয়ার পীরের মোকামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের কবর পাওয়া গেছে। আনোয়ারের কবরের খোঁজ পেয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে ছুটে এসেছেন তাঁর ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন। ভাইয়ের কবরে নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করে তিনি স্থাপন করেছেন নামফলক।

শুক্রবার (১৫ জানুয়ারি) বিকেলে নামফলক উন্মোচন করা হয়েছে। এ সময় উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তান গণমাধ্যমকর্মী এ.জে লাভলু উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, এলাকাবাসী ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আনোয়ার হোসেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার প্রেমারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদের ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ২১ বছর। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড় ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ডাকে যুদ্ধে যান আনোয়ার ও তার ছোট ভাই একেএম সামছুদ্দিন। ভারতের লোহারবন্দে ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা। ছোটভাই সামছুদ্দিন এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেন। আর আনোয়ার কুকিরথল ক্যাম্পে সাব-সেক্টর কমান্ডার ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট আব্দুল কাদিরের অধীনে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ চলাকালে বাবা-মায়ের সাথে তাদের আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

১৯৭১ সালের ০৩ অক্টোবর প্লাটুন কামান্ডার তজমুল আলীর নেতৃত্বে আনোয়ারসহ কয়েকজন দেশে ঢুকে বড়লেখা থানার হরিপুর-বড়খলা গ্রামের ‘বড়বন্দ’ হয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় পাকিস্তানীদের একটি ক্যাম্প দখল করার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। বড়লেখা থানার ‘বাজনি ছড়া’ রেললাইনের কাছে পৌঁছামাত্র সেখানে থাকা সশস্ত্র রাজাকারবাহিনী তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি করে। তখন পেছনে পড়ে যান আনোয়ার। তার অপেক্ষা না করেই অন্যরা রওয়ানা দেন। এরপর পথ হারিয়ে ফেলেন আনোয়ার। একাই ফেঞ্চুগঞ্জ থানার উদ্দেশে রওয়ানা হন। গাংকুল হয়ে চাঁনপুর এলাকায় পৌঁছান। ০৪ অক্টোবর ভোরে তাকে চাঁনপুর এলাকায় একা পেয়ে রাজাকারবাহিনী ঘিরে ফেলে।

এক পর্যায়ে সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে দরিয়ার পীরের মোকামে দাফন করেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধ শেষে আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন বাড়ি ফিরে এলেও তিনি আর ফেরেননি। বাবা-মা তার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতেন আর কাঁদতেন। কয়েকদিন পর তারা এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারেন আনোয়ার মৌলভীবাজারের বড়লেখায় যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোন এলাকায় তিনি শহীদ হয়েছেন, তা জানতে পারেননি।

ছেলেকে হারানোর ব্যথা নিয়ে ১৯৭৯ সালে তার বাবা মারা যান আর ২০০১ সালে মারা যান মা। এদিকে সম্প্রতি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারের ছোট ভাই একেএম সামছুদ্দিনের মেয়ে এনজিও কর্মী রেহানা আক্তার মনি অফিসের কাজে মৌলভীবাজারের আসেন। এরপর তিনি তার চাচা শহীদ আনোয়ারের কবরের খুঁজে বড়লেখায় যান। পরে তিনি বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিনসহ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাচার কবর খোঁজ পান। বিষয়টি তিনি তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিনকে জানান। পরে তিনি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শামীম আল ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আনোয়ারের কবরের খোঁজ পেয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে ছুটে আসেন তাঁর ছোট ভাই সামছুদ্দিন। এরপর নিজ উদ্যোগে তিনি ভাইয়ের কবরে স্থাপন করেন নামফলক।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন বলেন, দেশ স্বাধীন হলে আমি বাড়ি ফিরে আসি। কিন্তু আমার বড় ভাই আনোয়ার হোসেন আর ফেরেননি। বাবা-মাসহ আমরা তার জন্য অপেক্ষা করতাম। বাবা-মা কাঁদতেন। কয়েকদির পর জানতে পারি যে তিনি মৌলভীবাজারের বড়লেখায় যুদ্ধে রাজাকার বাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছেন। আমার বাবা-মাও ভাইয়ের শোকে মারা গেছেন।

তিনি বলেন, সম্প্রতি আমার মেয়ে মৌলভীবাজারে আসে। সে একটি এনজিওতে কাজ করে। অফিসের কাজেই সে এখানে এসেছিল। তখন সে আমাকে জানায় যে আমার ভাইয়ের কবর খুঁজে বের করবে। তাকে আগে ভাইয়ের কথা বলেছিলাম। পরে বড়লেখায় এসে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সহায়তায় সে কবরের খোঁজ পায়। পরে বিষয়টি আমাকে জানায়। খবর পেয়ে আমি আবার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এখানে ছুটে আসি। এখানে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। যারা আমার ভাইয়ের লাশ দাফন করেছিলেন। এরপর নিশ্চিত হই যে এখানে আমার ভাইয়ের কবর রয়েছে।

আমার ভাইয়ের শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষায় এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে নামফলক নির্মাণ করেছি। এতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পিআইও এবং সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় এলাকাবাসী যতেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।

আবেগাপ্লুত মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন বলেন, জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। আশা ছিল ভাইয়ের কবর খুঁজে পাওয়ার। সেটাও পেয়ে গেছি। ভাইয়ের স্মৃতিটুকু রক্ষায় তার কবরে নামফলক নির্মাণ করতে পেরেছি। এজন্য আমি ভীষণ খুশি। জীবনে আর আমার চাওয়ার কিছুই নেই।

বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন শনিবার (১৬ জানুয়ারি) দুপুরে বলেন, রাজাকার বাহিনীর হাতে চাঁনপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন শহীদ হয়েছেন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে দরিয়ার পীরের মোকামে দাফন করেন। সম্প্রতি আনোয়ারের ভাতিজি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এখানে আসেন। পরে তাকে আমি এবং মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক আলী তাঁর কবর দেখিয়ে দেই। পরে তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এখানে আসেন। পরে তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন কবর সংরক্ষণ করে নামফলক স্থাপন করেছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পিআইও এবং সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় এলাকাবাসী তাকে সহযোগিতা করেছেন। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরে হলেও স্বজনরা আনোয়ারের কবর খুঁজে পেয়েছেন। এর চেয়ে বড় আনন্দের খবর কী হতে পারে?