খাঁ ও চৌধুরীদের পরম্পরা দ্বন্দ্ব

ঢাকা, সোমবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২১ | ৫ মাঘ ১৪২৭

খাঁ ও চৌধুরীদের পরম্পরা দ্বন্দ্ব

শহীদনূর আহমেদ ১০:২১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০২০

print
খাঁ ও চৌধুরীদের পরম্পরা দ্বন্দ্ব

দুই যুগ ধরে চৌধুরী পরিবার আর খাঁ পরিবারের দ্বন্দ্ব। জলমহাল নিয়ে শুরু হওয়া দ্বন্দ্বের জেরে বছর বছর ঘটে সংঘর্ষ, লুটপাট হয় গ্রাম। হয় খুন। গ্রামছাড়া হয় শতাধিক পরিবার। বার বার চেষ্টা করেও দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব নিরসন করা যাচ্ছে না।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের মধুরাপুর গ্রামে এই দুটি গোষ্ঠী। পুরো গ্রামটিই উপজেলাবাসীর কাছে ভয়ঙ্কর এক নাম। এই গ্রামে সংঘর্ষ মানেই ভয়াবহ নৃশংসতা, হত্যা, লুটপাট, ভাঙচুর। ২৫ বছর ধরে গ্রামের চৌধুরী আর খাঁ গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে চারটি খুন হয়েছে। 

সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর দুপক্ষের সংঘর্ষে খান গোষ্ঠীর নূর মোহাম্মদ (৫০) নামে একজন খুন হন। আহত হন দুই পক্ষের অর্ধশত। সংঘর্ষের সময় ঘটে গ্রামে ভয়াবহ তাণ্ডব, বাড়িঘর ভাঙচুর আর লুটের ঘটনা। দুপক্ষের মধ্যে মামলা হয়। এরপর চৌধুরী গোষ্ঠীর শতাধিক পরিবারের নারী পুরুষ ও শিশু গ্রামছাড়া। প্রতিপক্ষের হামলার ভয় আর গ্রেফতার এড়াতে তারা ফিরতে পারছেন না বাড়িঘরে। দুই গোষ্ঠীর এমন দ্বন্দ্বে এলাকায় বিঘিœত হচ্ছে প্রাত্যহিক জীবন ব্যবস্থা। আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়।

সরেজমিন মধুরাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বসত ঘরে লোকশূন্য। ঘরে দরজা-জানালা আসবাবপত্র ভাঙা। কোনো কোনো ঘরের চাল ও বেড়া খুলে নেওয়া হয়েছে। দালান ঘরে ছাদ, ইটের দেয়াল ভেঙে স্তূপ হয়ে আছে। অনেক নলকূপের উপরিভাগ খুলে নেওয়া হয়েছে। বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাসহ নানাভাবে ক্ষতিসাধন করা হয়েছে ঘরবাড়ির।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের মধুরাপুর গ্রামের আশপাশের কয়েকটি হাওরের জলমহালের আয়ের টাকায় স্থানীয় মসজিদ, ঈদগাহ ও মাদ্রাসার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো। আজ থেকে ২৫ বছর আগে জলমহালের টাকা নিয়ে গ্রামের চৌধুরী ও খাঁ গোষ্ঠীর নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। চৌধুরী পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন দিলহক ও আমজদ চৌধুরী। খাঁ গোষ্ঠীর নেতৃত্বে তোফায়েল খাঁ, আব্দুল খালেক, নূর জালাল গং। ১৯৯৫ সালে তসলিমা নামে সাত বছরের এক শিশু হত্যাকাণ্ড ঘটে। ২০০০ সালের পর লোকমান নামে এক জেলে খুন হন। এই দুজনই খাঁ গোষ্ঠীর পক্ষের লোক। ২০০৬ সালে ঘটে মুক্তিযোদ্ধা আকিক মিয়া হত্যাকাণ্ড। তিনি চৌধুরী গোষ্ঠীর। এই তিন খুন নিয়ে দীর্ঘদিন মামলা চলার পর শালিসের মাধ্যমে আপস মীমাংসায় আসে দুপক্ষ। এসব ঘটনার নেপথ্যে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন দুই গোষ্ঠীর প্রবাসী ও প্রভাবশালীরা। মামলা হামলার অর্থের জোগান দিচ্ছেন তারাই।

এ ছাড়া সংঘর্ষ, ভাঙচুর, লুটপাট, ঘর জ¦ালানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত ৩০টি মামলা হয়। যা কয়েক বছর আাগে স্থানীয় শালিসের মাধ্যমে আপস নিষ্পত্তি করা হয়। পুরনো দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নেয় চলতি বছরের মে মাসের শেষের দিকে। ২২ মে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ৪০ জন। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলা হয়। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে খুন হন নূর মোহাম্মদ নামে আরেকজন।

চৌধুরী গোষ্ঠীর মো. মামুন চৌধুরী বলেন, গত ১৩ অক্টোবর সংঘর্ষে একজন নিহত হলেও এতে আমাদের লোকজন জড়িত নন। সংঘর্ষের পর প্রতিপক্ষের লোকেরা আমাদের দুই শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট করেছে। হাজার মন ধান, ১৫০টি গরু, শতাধিক ভেড়া, ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে খাঁন গোষ্ঠীর লোকেরা। দুটি ঘর জ¦ালিয়ে দিয়েছে। তাদের ভয়ে আমাদের তিন শতাধিক পরিবারের মানুষ গ্রামছাড়া।

খাঁ গোষ্ঠীর নূর জালাল বলেন, আমরা নিরীহ মানুষ। ১৩ অক্টোবর নূর মোহাম্মদকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে চৌধুরী গোষ্ঠীর লোকেরা। এর আগে আমাদের অনেক বাড়ি-ঘর ভাঙচুর করেছে তারা। সংঘর্ষের দিন কিছু ঘরবাড়ি ভাঙা হয়েছে। আমরা এই হত্যাকা-ের ন্যায়বিচার চাই।

ভাটিপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান কাজি বলেন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষদের নিয়েই বার বার এসব ঘটনা সমাধানের চেষ্টা করেছি আমরা। পূর্বপুরুষদের চলে আসা দ্বন্দ্ব আর বিচার না হওয়ায় এর সমাধান হচ্ছে না।

পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, এসব ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, হত্যা এবং বাড়ি-ঘর ভাঙচুরের ঘটনা দুপক্ষের মামলাই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সামজিকভাবে এসব দ্বন্দ্বের সমাধান না হলে এসব বিরোধ বাড়বেই।