সিসি ক্যামেরায় সত্যতা

ঢাকা, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

সিসি ক্যামেরায় সত্যতা

রায়হানের লাশ তোলার নির্দেশ, ফের ময়নাতদন্ত

সিলেট ব্যুরো ৮:২৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২০

print
সিসি ক্যামেরায় সত্যতা

পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজ ঘেঁটে রায়হান আহমেদকে সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আনা এবং নির্যাতনের বিষয়টির সত্যতা মিলেছে; যদিও শুরু থেকেই মূল অভিযুক্ত উপপরিদর্শক আকবর হোসেন দাবি করছেন রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়িতে আনা হয়নি। কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী তিনি সত্য বলেননি। এ ঘটনার মূল অভিযুক্ত ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়া পলাতক রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করলেও পুলিশ বলছে, অভিযুক্তরা তাদের হেফাজতেই আছেন।

লাশ তোলার নির্দেশ, ফের হবে ময়নাতদন্ত : নিহত রায়হান আহমদের (৩৪) লাশ কবর থেকে তুলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আবারও ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল বুধবার সকালে সিলেটের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এ আদেশ দেন। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিলেট কোতোয়ালি থানার এসআই আবদুল বাতেন আদালতে পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য একটি আবেদন করেন। আর গতকাল বুধবার সকালে শুনানি শেষে আদালত আবেদন মঞ্জুর করেন।

নিহত রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তারের করা মামলায় লাশের পুনরায় ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে নতুন তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই পরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) মহিদুল ইসলাম বলেন, লাশ তুলে আবার ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে পিবিআইয়ের একটি দল হত্যা মামলার তদন্তে নামে। পিবিআই কর্মকর্তারা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে প্রবেশ করেন দুপুর সোয়া ১২টায়।

নগর পুলিশ সূত্র জানায়, গত রোববার সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে লাশের প্রথম দফা ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছিল। হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন অনুযায়ী, ময়নাতদন্ত একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সম্পন্ন করার বিধি থাকলেও পুলিশ সেটি করেনি। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার শুরুতে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনিতে রায়হান নিহত হয়েছেন- এ রকম প্রচার করে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছিল। গত রোববার মধ্যরাতে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা হওয়ায় একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের বিষয়টি সামনে আসে।

গত ১০ অক্টোবর দিবাগত রাতে রায়হানকে ধরে নিয়ে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১১ অক্টোবর সকালে রায়হানকে ওসমানী হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। তিনি সিলেট নগরের নগরের আখালিয়ার নেহারিপাড়া এলাকার তৎকালীন বিডিআরের নায়েক মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে। ঘটনার প্রথম দিকে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ছিনতাইকালে গণপিটুনিতে মারা গেছেন রায়হান।

এর আগে ৬টা ৪০ মিনিটের সময় গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন বন্দরবাজার ফাঁড়ির এএসআই আশেকে এলাহী। মারা যাওয়ার পর রায়হানের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তার হাতের নখও উপড়ানো ছিল। এ ঘটনার পর পুলিশের বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতন করে রায়হানকে মেরে ফেলার অভিযোগ ওঠে। রায়হানের মৃত্যুর জন্য দায়িত্বহীনতার দায়ে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া মঙ্গলবার সকালে পুলিশ লাইন থেকে পালিয়ে গেছেন। তাকে খুঁজছে পুলিশ। বাকি ছয়জন পুলিশ লাইনে রয়েছেন। ময়নাতদন্তের পর গত রোববার বাদ এশা নগরের আখালিয়া জামে মসজিদে জানাজা হয় রায়হান উদ্দিনের। পরে আখালিয়া জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় রোববার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। এ ঘটনার তৃতীয় দিনের মতো গত মঙ্গলবারও সিলেট ছিল প্রতিবাদমুখর। দোষীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে নগরের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, মামলাটি পিবিআইয়ে স্থানান্তরের জন্য আজ (মঙ্গলবার) পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন মামলা তদন্তে পিবিআইয়ের কর্মকর্তা মনোনীত হলে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

ঘটনার সত্যতা মিলল সিসিটিভি ফুটেজে : পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুতে গঠিত তদন্ত কমিটি নির্যাতনের সত্যতা পেয়েছে। বন্দরবাজার ফাঁড়ির পাশঘেঁষা সিলেট পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায়ও ধরা পড়েছে রায়হানকে পুলিশ ফাঁড়িতে আনা-নেওয়ার ছবি। ফুটেজে দেখা গেছে, গত শনিবার রাত ৩টা ৯ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে দুটি অটোরিকশা এসে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে থামে। সামনের অটোরিকশা থেকে তিন পুলিশের সঙ্গে রায়হানকে নামতে দেখা যায়। তিনি হেঁটে ফাঁড়িতে ঢোকেন। এর প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল ৬টা ২২ মিনিটে একটি অটোরিকশা আসে বন্দরবাজার ফাঁড়ির সামনে। এর ঠিক দুই মিনিট পর ৬টা ২৪ মিনিট ২৪ সেকেন্ডে দুই পুলিশের কাঁধে ভর করে রায়হানকে অটোরিকশায় তুলতে দেখা যায়। এরপর তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

স্বাধীন নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট : পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। সিলেটের শাহপরান থানার বাসিন্দা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ ফজলে এলাহী জনস্বার্থে মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আবেদন দাখিল করেন।  বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ রিট আবেদনের ওপর শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন ওই আইনজীবী। এতে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, সিলেটের পুলিশ কমিশনার, সিলেটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবাদী করা হয়েছে। রায়হানের মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে এ রিট আবেদন করা হয়।