হাওর যেন মৃত্যুপুরী

ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০ | ১০ কার্তিক ১৪২৭

হাওর যেন মৃত্যুপুরী

এক বছরে অর্ধশত মৃত্যু

শহীদ নূর আহমেদ, সুনামগঞ্জ ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২০

print
হাওর যেন মৃত্যুপুরী

বর্ষার পানিতে টইটম্বুর হাওর ক্রমেই মৃত্যুপুরী হয়ে উঠছে। বারবার ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা। সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা হাওরে চলতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ মাসে নৌ দুর্ঘটনায় ৩৬ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরের সুনামগঞ্জের কালিয়াকোটা হাওরের নৌকাডুবিতে নিহত হন ১০ জন। গত এক বছরে হাওরে নিভেছে প্রায় অর্ধশত প্রাণ। প্রতিকূল আবহাওয়া, ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন, নৌ ব্যবস্থাপনা না মানাসহ কিছু কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন হাওর পাড়ের মানুষ। এসব দুর্ঘটনা রুখতে ১৪ দফা নির্দেশনা মানার বাধ্যবাধ্যকতা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এসব নির্দেশনা ভাঙলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

জানা যায়, এ বছরের ২৭ জুন দিরাই উপজেলার কালনী নদীতে নৌকা ডুবিতে শিশুসহ ২ জনের মৃত্যু হয়। জুলাই-আগস্ট মাসে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও ছাতক উপজেলায় নৌ-ডুবিতে ৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। এদের মধ্যে ৩ জন তাহিরপুর উপজেলার। ৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলার হাওরে নৌকা ডুবে ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। চলতি মাসের ৯ তারিখ সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনার মধ্যবর্তী গুমাই নদীতে নৌকা ডুবিতে ১২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর দিরাইয়ের কালিয়াকোটা হাওরে নৌকা ডুবে ৬ শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন হাওরে বিচ্ছিন্নভাবে নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

এসব দুর্ঘটনার বিষয়ে হাওরপাড়ের বাসিন্দারা মনে করেন, সড়কপথে পরিবহন চলাচল করার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মনীতি থাকলেও নৌপথে চলাচলে কোনো নিয়মনীতি নেই। এ কারণে ট্রলার বা নৌকাচালকরা ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করেন। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে নৌ দুর্ঘটনার ঘটনা । নৌপথে এরকম দুর্ঘটনারোধ করতে ট্রলার বা নৌকার ফিটনেস যাচাই, যাত্রী ধারণ ক্ষমতা, যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট নিশ্চত করা প্রয়োজন।

তারা বলছেন, নৌঘাট থেকে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি যাত্রী সুরক্ষার জন্য নিয়মনীতি প্রণয়ন করাও জরুরি। অন্যথায় নৌপথে প্রাণহানির ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন হাওর বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, হাওরের জনপদ সুনামগঞ্জ ৬ মাসই পানি নিচে থাকে। হাওরের বৈরী আবহাওয়া ও নৌকা চলাচলে নৌ চলাচলে নির্দিষ্ট নিয়ম না মানায় প্রতিনিয়ত ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা। চালক ও যাত্রীরা সচেতন হলেই নৌ দুর্ঘটনা অনেকটা রোধ করা সম্ভব। সড়ক পথের মত নৌপথে নিয়ম-নীতির দরকার। যেসব মাঝি এসব মানবেন না তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

এদিকে নৌপথে চলাচলকারী নৌ চলাচলে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে প্রচলিত আইন ও বিধি বিধানসহ বিভিন্ন নির্দেশাবলী মেনে চলতে ১৪টি নির্দেশনা প্রদান করেছে জেলা প্রশাসন। এতে বলা হয়েছে- অভ্যন্তরীণ নৌযানসমূহকে সার্ভে এবং নিবন্ধন করতে হবে, সার্ভে সার্টিফিকেট (ফিটনেস) নৌযানের প্রকাশ্য স্থানে ঝুলিয়ে রাখতে হবে, নিবন্ধন সনদপত্র নৌযানে রাখতে হবে, রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রকাশ্য স্থানে উৎকীর্ণ থাকবে, প্রতিটি নৌযানে আসন সংখ্যা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইফ জ্যাকেট/বয়া যাত্রী সাধারণের হাতের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে, আসন সংখ্যার চেয়ে অধিক যাত্রী বহন করা যাবে না, দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক এবং সহকারী দ্বারা নৌযান চালানো নিশ্চিত করতে হবে; সাইরেন ও সার্চ লাইট/সিগন্যাল লাইট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, মালবাহী নৌযানে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত মালামাল পরিবহন করা যাবে না, নৌযান চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সনদ গ্রহণ করতে এবং তা নৌযান চালনাকালে সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়া আবহাওয়া পূর্বাভাস মেনে নৌযান চালাতে হবে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযান চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে, সকল প্রকার সংঘর্ষ ও দুর্ঘটনা এড়িয়ে নৌযান চালাতে হবে, কোনোভাবেই ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী/মালামাল বা পণ্য পরিবহন করা যাবে না মর্মে নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ বলেন, নৌ দুর্ঘটনা রোধে আমরা ইতোমধ্যেই ১৪টি নির্দেশনা প্রধান করেছি। ট্রলারঘাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এসব নির্দেশনা টানিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

যারা এসব নির্দেশনা অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ ও বাংলাদেশ বাণিজ্যিক নৌ-চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ এবং প্রচলিত আইন ও বিধি মোতাবেক মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।