হাওরে বজ্রপাত আতঙ্ক

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

হাওরে বজ্রপাত আতঙ্ক

শহীদনুর আহমেদ, সুনামগঞ্জ ৬:৪৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৯

print
হাওরে বজ্রপাত আতঙ্ক

বজ্রপাতের কারণে দিন দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে হাওর। খোলা বিস্তৃত হাওরে সহজেই বজ্রপাতে হতাহত হচ্ছেন হাওরের মানুষ। বিশ্ব জরিপে এর আগেই সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলকে বিশে^র বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হাওরে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। গত ১০ দিনের ব্যবধানে জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলায় পুত্রসহ তিন পিতা বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করেছেন।

সর্বশেষ গত শুক্রবার সকালে জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে নিহত হন ফেনারবাঁক ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের ভানু মিয়া ও তার ছেলে সুমন মিয়া। গত ১০ জুলাই জামালগঞ্জে স্কুল থেকে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে সাবিদুর রহমান ও তার ছেলে অন্তর মারা যান। ১৩ জুলাই তাহিরপুর উপজেলার হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে নিহত হন হারিদুল ইসলাম ও তার ছেলে তারা।

আবহাওয়া অফিস বলছে, দেশের সবচেয়ে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা সুনামগঞ্জ। গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনসহ এ অঞ্চলের ভূপ্রাকৃতিক অবস্থানকেও দায়ী করছেন আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। সরকারিভাবে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি এ প্রকল্পের সুফল পেতে কয়েক যুগ লাগবে বলে মনে করেন স্থানীয় অভিজ্ঞজন।

আবহাওয়াবিদ মোমেনুল ইসলাম জানান, ২০১০ সালের পর দেশে বজ্রপাত বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০১৬ সালে পরপর দুদিনে বজ্রপাতে ৮১ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরপরই বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে মন্ত্রণালয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিবছরে বিশে^র বায়ুমণ্ডলে দুই কোটিবার বজ্রপাত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ২০৫০ সালে গিয়ে বজ্রপাতের সংখ্যা দাঁড়াবে তিন কোটিতে। এ অবস্থায় ক্ষয়ক্ষতিও বাড়বে স্বাভাবিকভাবে।

আবহাওয়া অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মশিউর রহমান জানান, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে মূলত বজ্রপাত বাড়ছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল দ্রুত গরম হয়ে যাওয়ায় মেঘ তৈরির স্বাভাবিক পরিবেশ থাকছে না। আর দ্রুত মেঘ তৈরির সময়ে বাড়ছে বজ্রপাত।

মশিউর রহমান জানান, উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বায়ুমণ্ডল দ্রুত গরম হয়ে যায়। তখন সিভি ক্লাউড বা বজ্রমেঘের পরিমাণও বাড়ে। জলীয় বাস্পগুলোকে নিয়ে ভূমির গরম বাতাস যখন তীব্র বেগে ওপরে ওঠে তখন দ্রুত এ বাস্প শীতল হয়ে যায়। এই শীতল পানির কণাগুলো এরপর মধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে নিচে নামতে থাকে। কিন্তু নিচে থেকে গরম বাতাসের চাপে এগুলো আবার গলে বাষ্প হয়ে ওপরে ওঠে।

এভাবে কয়েকবার এ বাষ্পকণাগুলো ওঠানামা করতে করতে এগুলো বৈদ্যুতিক আয়ন কণায় পরিণত হয়। আর এ কণাগুলোই বিপুল শক্তির বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। তবে আয়ন কণায় পরিণত হওয়ার পর এগুলো স্বাভাবিকভাবেই মেঘের ওপর ভাসে। কিন্তু যখন ভূপৃষ্ঠের আয়ন ধারনের ক্ষমতার কারণে এগুলো আবার মাটির দিকে চলে আসে। আর এ আয়ন কণাগুলো মেঘের ভেতর দিয়ে বজ্রের আকারে নিচে নেমে আসে। এ গবেষকের আশঙ্কা অদূর ভবিষ্যতে বজ্রপাত বাড়বে বই কমবে না। কারণ হিসেবে তিনি বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে দায়ী করেছেন।

তিনি আরও জানান, সাধারণত ১০০-১১০ ভোল্ট বিদ্যুৎ কোনো মানুষের ভেতরে প্রবাহিত হলে ওই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটবে। কিন্তু বজ্রপাতের সময় একজনের শরীরে ৫৫০-৬০০ মেগা ভোল্ট বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। ফলে ওই দেহ পুড়ে যায়।

গবেষকদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে গড় তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে বজ্রপাতের ঝুঁকিও সমান হারে বাড়বে। এছাড়া বজ্রপাতের কারণ হিসেবে বায়ুদূষণকেও দায়ী করেছে তারা।