ওভারলোডেড ট্রেনে দ্রুতগতি

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

কালভার্ট ভেঙে উপবনের বগি খালে

ওভারলোডেড ট্রেনে দ্রুতগতি

নিজস্ব প্রতিবেদক ও কুলাউড়া প্রতিনিধি ১০:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ২৪, ২০১৯

print
ওভারলোডেড ট্রেনে দ্রুতগতি

বাংলাদেশের সড়কে যখন মৃত্যুর মিছিল তখন নিরাপদ যাতায়াতের প্রতীক ট্রেন। সেই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ হলো মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় কালভার্ট ভেঙে উপবন এক্সপ্রেসের বগি খালে ছিটকে পড়ার পর। স্মরণকালের ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ছিল যাত্রীদের কাছে এক বিভীষিকার অভিজ্ঞতা। দ্রুতগতির ট্রেনটির ছয়টি বগি কালভার্ট পার হতে পারলেও মাঝখানের বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়।

এ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। তাদের কারও হাত ভেঙেছে, কারোর পা, কারও আবার ফেটেছে মাথা। এদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থা কয়েকজনের।

দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনে আশপাশ থেকে ছুটে আসেন স্থানীয়রা। তারা হতাহতদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা এসে উদ্ধার অভিযানে নামেন। কাত হয়ে পড়ে যাওয়া ট্রেনের বগিতে আটকা পড়েন যাত্রীরা। তাদের আর্তচিৎকার আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ট্রেনের বগির নিচেও আটকা পড়েন কয়েকজন। অ্যাম্বুলেন্সে করে উদ্ধার হওয়া মানুষদের আশপাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

সিলেট-আখাউড়া সেকশনের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল স্টেশন সংলগ্ন বড়ছড়া ৯নং রেল ব্রিজে রোববার রাত পৌনে ১২টার দিকে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন। যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রেনটিতে অতিরিক্ত যাত্রী ছিল আর দুর্ঘটনার সময় সেটি অতি দ্রুতগতিতে চলছিল। পুরনো কালভার্টটি ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো কি তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

এ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তবে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন উপবনের তিন বগি ছিটকে পড়ার পেছনে অতিরিক্ত যাত্রী বহনকে দায়ী করেছেন। এ ছাড়া গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রেন দুর্ঘটনার বিষয়টি আলোচিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছেন, পুরনো ব্রিজগুলো রিপ্লেস করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। ট্রেনটিতে অতিরিক্ত যাত্রী (ওভারলোডেড) ছিল বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

এদিকে দুর্ঘটনার পর সিলেটের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামের সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ভোররাত ৩টার পর দুর্ঘটনাস্থলে সাতটি বগি রেখে বাকি ছয়টি বগি নিয়ে উপবন ট্রেনটি কুলাউড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সোমবার সকালে সেখানে পরিদর্শনে যান রেলসচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন। বগি উদ্ধার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্রিজটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট সরাসরি ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে সোমবার সন্ধ্যা থেকে কুলাউড়া-ঢাকা ও কুলাউড়া-চট্টগ্রামে ট্রেন চলাচল শুরু হবে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত চার যাত্রীর মধ্যে তিনজন নারী ও একজন পুরুষ। এর মধ্যে একজন কুলাউড়া পৌরসভার টিটিডিসি এলাকার বাসিন্দা ও ঠিকাদার আব্দুল বারির স্ত্রী মানোয়ারা পারভীন (৪৮)। এ ছাড়া সিলেটের মোগলাবাজারের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের আব্দুল বারির মেয়ে ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা (২০) ও বাগেরহাট জেলার মোল্লারহাট থানার ভান্ডারখোলা গ্রামের আকরাম মোল্লার মেয়ে সানজিদা আক্তার (২০)। তারা দুজন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের নার্সিং ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী। নিহত পুরুষ যাত্রী মো. কাউছার আহমদ (২৬) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাছিরনগর উপজেলার ধরমণ্ডল গ্রামের মৃত নুর হোসেনের ছেলে। চারজনের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আহতরা কুলাউড়া হাসপাতাল ব্রাহ্মণবাজার মুসলিম এইড হাসপাতাল, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল ও সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

কুলাউড়া হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নূরুল হক জানান, রোববার রাত ১২টা থেকে সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ৬৭ জনকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। এদের মধ্যে চারজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

তদন্তে দুটি কমিটি : এদিকে উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ায় দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেল সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, রেলওয়ের চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (পূর্বাঞ্চল) মো. মিজানুর রহমানকে কমিটির প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- চিফ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জলিল, চিফ পিএসপি মইনুল ইসলাম, চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) সুজিত কুমার।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটির পাঁচ সদস্য হলেন- চিফ সিগন্যাল অ্যান্ড কমিউনিকেশন মঈনুল ইসলাম, সিওপিএস সুজিত কুমার, রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলম, অতিরিক্ত সচিব মো. মুজিবুর রহমান, চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মিজানুর রহমান। দুই কমিটিকেই তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা : নূরুল ইসলাম সুজন
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অব্যবস্থাপনার কারণে রেলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মন্ত্রিপরিষদকে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত বৈঠকে তিনি এই তথ্য জানান। পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে ব্রিফ করেন।

এ সময় শফিউল আলম জানান, বৈঠকের শুরুতেই রেলমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদকে বলেছেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হবে। মন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ হুমড়ি খেয়ে রেলে ওঠে। তাই এই দুর্ঘটনা। রেল সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন ঘটনাস্থলে আছেন। ঢাকা থেকে সামগ্রিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দ্রুতই ঢাকা ও সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে।’

মৌলভীবাজারের দুর্ঘটনায় চার জন নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে মন্ত্রিপরিষদকে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী। তবে তিনি আরও জানান, হেলেপড়া রেলের বগির নিচে আরও লাশ থাকতে পারে। এই দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দেশনা আছে কিনা জানতে চাইলে সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী রেলের নাজুক ও দুর্বল সেতুগুলো শনাক্ত করে নতুন করে নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত রোববার রাতে সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে রাত সাড়ে ১১টার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল রেলক্রসিং এলাকার কাছেই সেতু ভেঙে আন্তঃনগর ‘উপবন এক্সপ্রেস’ ট্রেনের কয়েকটি বগি খালে পড়ে যায়। এ ছাড়া আরও তিনটি বগি স্থলভাগের সীমানায় লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। মোট পাঁচটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট কাজ শুরু করে। পুলিশ, বিজিবি ও স্থানীয় লোকজনও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।

মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন শাজাহান কবীর চৌধুরী বলেন, এই ঘটনায় চার জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন জন পুরুষ ও একজন নারী। কুলাউড়া ও মৌলভীবাজার হাসপাতালে মোট ৬৭ জন আহত ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ২০ জনকে সিলেট ওসমানী মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।

কুলাউড়া রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল মালেক জানান, গতকাল সোমবার ভোরে সাতটি সচল বগি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় দুর্ঘটনাকবলিত উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি। এ ছাড়া সেতু ভেঙে লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।