নন্দিরাইয়ের আসমানীরা

ঢাকা, বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯ | ৫ আষাঢ় ১৪২৬

নন্দিরাইয়ের আসমানীরা

কানাইঘাট (সিলেট) প্রতিনিধি ৯:১৫ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০১৯

print
নন্দিরাইয়ের আসমানীরা

‘আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও, রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও। বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি, একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি। একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে, তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।’ পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তার কবিতায় এভাবেই দরিদ্র মানুষের জীবনের কথা তুলে ধরেছিলেন।

পল্লীকবি জসীম উদ্?দীনের সেই আসমানীদের মতো দুর্দশার মধ্যে জীবন পার করছেন সিলেটের কানাইঘাট পৌরসভার নন্দিরাই গ্রামের দুই বোন সালমা ও দুলাই। তবে তাদের ঘরটিতে ভেন্না পাতার ছানি নয়, মরিচা ধরা টিন। স্যাঁতসেঁতে কাদার মাঝে আধুনিক যুগের এ কুঁড়েঘরে চলছে তাদের জীবন। দুমুঠো ভাত জোগাড় করতে প্রতিদিন ভোরে কাজের সন্ধানে তাদের চলে যেতে হয় পৌরসভার বিভিন্ন হোটেল বা রোস্তারাঁয়। সারা দিন কাজ করে যা পান তা দিয়ে রাতের খাবার নিয়ে কুঁড়েঘরে ফেরেন। এভাবে যুগ যুগ ধরে তারা এখানে বসবাস করে আসছেন। তাদের বাবা ছেরাগ আলী ও মা বেলা বিবি বহু আগে মারা গেছেন।

ছেরাগ আলী তার উত্তরাধিকারী হিসেবে দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়েকে রেখে যান। কিন্তু অল্প বয়সে রহমান ও শুক্কুর নামে দুই সন্তান ভাই মারা যান। এর কিছুদিন পর সালমাদের বড় বোন জয়নবও মারা যান। সালমারা হয়ে পড়েন নিরুপায়। মেজো বোন রহিমা স্বামীর সংসার করলেও সালমা, দুলাই ও গুলেনুর স্বামীর সংসার ছেড়ে বাবার রেখে যাওয়া ভিটায় বসবাস করছেন। এর মধ্যে কয়েক বছর আগে ছোট বোন গুলেনুরও মারা যান। তবে গুলেনুরের রেখে যাওয়া দুটি সন্তানসহ বর্তমানে এ কুঁড়েঘরে সালমাদের পাঁচ সদস্যের বসবাস।

হাটু জলে দাঁড়িয়ে কথা হয় সালমার বড় বোন দুলাইয়ের সঙ্গে। তিনি জানান, আমরা অন্ধ মানুষ, লেখাপড়া জানি না। বৃদ্ধ বয়সে ভোর হলেই খাবার জোগাতে কাজের সন্ধানে দুই বোন বের হই। আর সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরি। কই আমাদের খবর তো কেউ রাখে না? নির্বাচন এলে সবাই আসে। এরপর কোনো নেতার খবর নেই। সারা দিন কাজ করে রাতে শুইতে গেলে গায়ের ওপর বৃষ্টির পানি পড়ে। কিন্তু ঘরটি তৈরি করা তো দূরের কথা মেরামতেরও কোনো পয়সা নেই।

আর জলাবদ্ধতার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, একসময় আমাদের বাবা ছিলেন। মা ছিলেন, ভাইয়েরা ছিলেন। সুন্দর একটা উঠানও ছিল। কিন্তু আজ আর তা নেই। তা গাঙ হয়ে গেছে। কোনো দিকে পানি যাওয়ার রাস্তা নেই। আগে যেদিকে পানি যেত তা বন্ধ হয়ে গেছে।