মৃত্যুও আলাদা করতে পারেনি যে বন্ধুত্ব

ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

চুড়িহাট্টা ট্রাজেডির অজানা এক গল্প

মৃত্যুও আলাদা করতে পারেনি যে বন্ধুত্ব

খোলা কাগজ ডেক্স ৩:৫৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২০

print
মৃত্যুও আলাদা করতে পারেনি যে বন্ধুত্ব

“সময় আর ফুরাচ্ছে না, যতদিন যাচ্ছে কষ্টও বয়ে যাচ্ছে। এই যন্ত্রণা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহন করতে হবে। বললেন, দোলার মা। “দোলার বাবা এখন আর দলিল লেখার কাজ করে না। মেয়েকে হারিয়ে উদাসীন হয়ে গেছেন। সারাদিন বাসায় কম্পিউটারে মেয়ের পুরনো স্মৃতি দেখেন আর বাসার ছাদে উঠে গাছে পানি দেন। কোথাও তেমন একটা বের হন না।” এত কষ্ট ঘোচাবে কে?

বৃষ্টি আর দোলা।  দু’জনের সম্পর্কটাও যেন ছিল আত্মার। মৃত্যুতেও আলগা হয়নি সেই বন্ধন।  প্রকৃতির কি অদ্ভুত অথচ নির্মম খেয়াল। একইদিনে, একসাথে হারিয়ে গেল দুজন। যেতে হয়েছে দু’জনকে।

আর তাদের অন্তিম শেষ শয্যা আজিমপুর কবরস্থানের একই মাটিতে।

একবছর আগে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ের ভয়াবহ আগুন দুই বান্ধবী ফাতেমাতুজ জোহরা বৃষ্টি ও রেহনুমা তারান্নুম দোলাকে কেড়ে নিয়ে মুছে দিয়েছে দুই পরিবারের আনন্দ।

স্বজনরা দু’জনের স্মৃতিমাখা জিনিসগুলো হাতড়ে তাদের ছোঁয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু বারবারই সেসব হয়ে ওঠে একরাশ কষ্টের কারণ।

শৈশবে অগ্রণী স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার সময়ই দুইজনের  বন্ধুত্ব,পথচলা।সেই শুরু..

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের চাইল্ড কেয়ার বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন বৃষ্টি। তার বাসা হাজি রহিম বক্স লেনে।  আর ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের আইনে পড়ুয়া দোলার বাসা শেখ সাহেব বাজার রোডে।

 চুড়িহাট্টার কাছেই দু’জনের বাসা।

গতবছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে শিল্পকলা একাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রিকশায় করে চুড়িহাট্টা মোড় দিয়ে বাসায় ফিরছিল বৃষ্টি আর দোলা। কিন্তু চুড়িহাট্টার লেলিহান শিখা তাদেরকেও টেনে নেয় মৃত্যুর দুয়ারে।

আগুনেই তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে, সেখানেই।

তাদের বাড়ী চুড়িহাট্টার  একটু দুরে থাকার কারনে সেদিন তাদের নিখোজ হবার পরও শুরুতে দুই পরিবার নিশ্চিত ছিল না, তাদের মেয়েরা মারা গেছে নাকি নিখোঁজ হয়েছে।

দোলার বাবা দলিলুর রহমান দুলাল প্রথমে লালবাগ থানায় নিখোঁজ হওয়ার সাধারণ ডায়েরিও করেছিলেন। পরে ৭ মার্চ সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বৃষ্টির এবং ১২ মার্চ দোলার মরদেহ শনাক্ত করে।

 “দুই পরিবার তো একই ধরনের ভুক্তভোগী। আর এই বেদনা কি ভোলা যায়? যতদিন বেঁচে থাকব বয়ে বেড়াতে হবে এই বেদনা।”

তবে বৃষ্টির বাবা জসিম উদ্দিন মেয়ে হারানোর কষ্টকে চাপা দিয়ে বলেন, “বেদনা বাড়বে, তাই মনে করতে চাই না। যখন মেয়ে নিখোঁজ ছিল তখন মনে নানা প্রশ্ন ছিল যে, মেয়েকে কোনো চক্র ধরে নিয়ে গেছে কিনা। যখন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হলাম যে আমাদের মেয়ে দুর্ভাগ্যের শিকার, তখনই কষ্ট চলে গেছে। তাদেরকে কবর দিয়ে দিয়েছি। এখন আর মনে করতেও চাই না সেই স্মৃতি।”

কিন্তু দোলার মা সুফিয়া রহমান ছোট মেয়ে মালিয়া মেহবীন নুসাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করলেও হারিয়ে যাওয়া মেয়ের কথা কিছুতেই ভুলতে পারছেন না।

বৃষ্টি-দোলা ছাড়াও রানা-মাসুদ, আনোয়ারের মতো সেদিন হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্বজনরা কেমন আছেন- তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে মেলে কিছু বুকচাপা কষ্টের কথা।

এর কোনও উত্তর মেলেনা।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ