এএফসি’র স্বীকৃতিতেআবেগে আপ্লুত চুন্নু

ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০ | ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

এএফসি’র স্বীকৃতিতেআবেগে আপ্লুত চুন্নু

বদরুল আলম চৌধুরী ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২০

print
এএফসি’র স্বীকৃতিতেআবেগে আপ্লুত চুন্নু

বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম গোলটি করেছেন কে? কিংবা প্রথম হ্যাটট্রিক দাতার নাম কী? এমন প্রশ্নের উত্তর জানা নেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে)। তথ্য নেই, বাফুফের অফিসিয়াল সাইডেও। অথচ দু’দিন আগে এএফসি সোস্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের সেই ফুটবলারের কৃতিত্বকে দিয়েছে স্বীকৃতি, জানিয়েছে শ্রদ্ধা। তিনি হচ্ছেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু।

সত্তর দশকের মাঠ কাঁপানো ফুটবলার ছিলেন নারায়ণগঞ্জে জন্ম নেওয়া চুন্নু। যাকে বলা হতো ড্রিবলিং মাস্টার। জীবনের এতটি বছর পর এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) স্বীকৃতি পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠেছেন তিনি। 

ফোন করতেই ওপার থেকে জানালেন, বুঝেছি কেন ফোন করেছ। দৈনিক খোলা কাগজের পক্ষ থেকে চুন্নু ভাইকে জানানো হলো অভিনন্দন। এরপর এক নিমিষেই নিজের আবেগ তুলে ধরেছেন আশরাফ উদ্দিন চুন্নু। তিনি বলেন, এত বড় জায়গা থেকে স্বীকৃতি পেয়ে আমি সত্যি আপ্লুত। এটি জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি। আমি তোমাকে তা বলে বোঝাতে পারব না আমার ভেতরে কেমন আবেগ বইছে। এটি আমার জন্য চাট্টিখানি কথা না, আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা থেকে স্বীকৃতি প্রদান। অথচ বাফুফে আমাকে সে স্বীকৃতি দিতে পারেনি।

এ নিয়ে আমি বাফুফেকে অনেক জানিয়েছি। এমনও বলেছি দেখুন, আমিই হলাম বাংলাদেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচের গোলদাতা এবং হ্যাটট্রিকটিও আমি করেছিলাম। কিন্তু তাদের কেমন যেন একটা অনীহা ভাব। আমিও বাফুফে’র কার্যনির্বাহী কমিটিতে ছিলাম। তখনো এ নিয়ে কথা বলেছিলাম কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। যাক এবার এএফসি’ই সে স্বীকৃতি আমাকে দিয়েছে। এজন্য এএফসি’র কাছে আমি কৃতজ্ঞ এবং তাদের ধন্যবাদ জানাই।’

আশরাফ উদ্দিন চুন্নুরা যখন খেলতেন তখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের আলাদা কোনো ভবন কিংবা স্টেডিয়াম ছিল না। জাতীয় স্টেডিয়াম বলতে আজকের বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামেই ভাগাভাগি করে হতো সব ধরনের খেলা। তারপরও নব্বইয়ের দশকে ফুটবল র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১০।

সময় বদলেছে, আধুনিক হয়েছে বাফুফে ভবন। বেড়েছে ভবনের চাকচিক্যও। বাফুফের কার্যনির্বাহী কমিটিতে রয়েছে সাবেক একঝাঁক তারকা ফুটবলার। এমনকি ভবনের নিরাপত্তাতেও বেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন আর হুট করেই বাফুফে ভবনে প্রবেশ করা যায় না। আগের চেয়ে অনেক বেশি পেশাদারিত্ব ভাব। ফুটবল উন্নয়নে চড়া দামে ভিনদেশি কোচও রয়েছে। গত ১২ বছর ধরে এক ব্যক্তি সভাপতি। আবারও তার সম্ভাবনার দুয়ার খোলা।

এত কিছুর পরও বাংলাদেশের ফুটবলে কোথায় যেন হাহাকার। বাহ্যিক চাকচিক্যে অনেক কিছু আছে, কিন্তু ভিতরটা সদরঘাট। ফুটবলে নেই সেই নব্বই দশকের র‌্যাংকিংও। ফুটবল আলাদা করে মাঠ, ভবন সরকারি সমর্থন পাওয়ার পরও ফুটবল উন্নতি একটু হয়নি। নারী ফুটবলে যা কিছু প্রাপ্তি। পুরুষ ফুটবলে অবনতিটা হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক। র‌্যাংকিংয়ের তলানীতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৭’তে। অথচ বাফুফেতে রয়েছে বেতনধারী একজন সিইও সমতুল সাধারণ সম্পাদক। ফুটবলের খেলার মানই শুধু নয়, কাড়ি কাড়ি টাকা দিয়ে কর্মচারী নিয়োগের ফসলটাও তারা আদায় করতে পারেনি।

একটি অফিসিয়াল সাইডও বাফুফের বর্তমান কমিটি উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বুলবাল গোলের পরিসংখ্যান উপস্থাপনে বিব্রতকর দশা। এ নিয়ে আশরাফ উদ্দিন চুন্নু এই প্রতিবেদককে দুঃখ প্রকাশ করে জানান, অবাক লাগে তারা আমার নামের পাশে আন্তর্জাতিক গোল সংখ্যা লিখেছে ৫টি। এটা বিশ্বাস করা যায়!

আসলাম, এমেলি সবার গোল সংখ্যা ভুল উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক ফুটবলাঙ্গনে আমি শুধু প্রথম গোলদাতা কিংবা হ্যাটট্রিক দাতাই নই, আমি সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলাম। আন্তর্জাতিক ফুটবলাঙ্গনে আমি মোট ১৭টি গোল করেছি। আমার পরেই আছে এমেলি ১৫টি এবং আসলাম করেছে ১৩টি। এই তথ্যটিও বাফুফে এতদিনে ঠিক করতে পারেনি। আমি সত্যিই ভাগ্যবান এই বলে যে, এখন বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস লিখতে গেলে আমাকে দিয়েই শুরু করতে হবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে শুকরিয়া, আল্লাহ আমাকে এই সম্মান দিয়েছেন। কারণ বাংলাদেশের হয়ে এই রেকর্ড আর কারও নেই। ভাঙলেও প্রথম গোল, গোল সংখ্যা এবং প্রথম হ্যাটট্রিক লিখতে গেলে আমাকে দিয়েই লিখতে হবে।’

আশরাফ উদ্দিন চুন্নু ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে খেলেছেন। পেশাদারি ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় তিনি কাটিয়েছেন দেশের ঘরোয়া ফুটবলের অন্যতম ক্লাব আবাহনীর জার্সিতে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হ্যাটট্রিক এবং এশিয়ান কাপেও দেশের হয়ে চুন্নুর গোলের কথা ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেছে এএফসি। বাংলাদেশের জার্সিতে প্রথম বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশি হিসেবে প্রথম গোল করেন ভারতের বিপক্ষে, ১৯৮৫ সালে। ৩০ মার্চের ওই ম্যাচে বাংলাদেশ যদিও হেরেছিল ২-১ ব্যবধানে। এক গোল পিছিয়ে থাকা দলকে ৪২ মিনিটের সময় গোল করে সমতায় ফিরিয়েছিলেন চুন্নু। শেষ মুহূর্তে অবশ্য বাংলাদেশ আরেকটি গোল হজম করে। ওই বাছাই পর্বে ২ এপ্রিল বাংলাদেশ প্রথম জয় পায় ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানে। কায়সার হামিদ ও চুন্নু গোল দুটি করেছিলেন। তারও আগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ফুটবলকে দারুণ এক জয় উপহার দিয়েছিলেন চুন্নু। ১৯৮৩ সালে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে নেপালকে ৪-২ গোলে হারানোর ম্যাচে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হ্যাটট্রিক করেন তিনি।

তারও আগে ১৯৭৯ সালে ঢাকায় এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে আফগানিস্তানকে ৪-১ গোলে পরাজিত করার ম্যাচে দলের হয়ে প্রথম গোলটি করেছিলেন চুন্নু এবং একই বছর বাংলাদেশ এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। যা এখন শুধুই স্মৃতি। সেবার কাতারের সঙ্গে ড্র করে কুয়েতে অনুষ্ঠেয় মূল পর্বে খেলেছিল বাংলাদেশ। এরপর এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বেও চুন্নু উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে দারুণ এক গোল করেছিলেন।

বাংলাদেশে ফুটবলের এই ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকা আশরাফ উদ্দিন চুন্নুর বাফুফের কাছে একটাই অনুরোধ, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন যেন খেলোয়াড়দের প্রাপ্তির এই স্বীকৃতিগুলো দেয়। তাতে নতুন প্রজন্ম সঠিক তথ্য জানার মাধ্যমে ফুটবলের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হবে।’