সাকিবময় আফগান বধ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯ | ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

সাকিবময় আফগান বধ

ক্রীড়া প্রতিবেদক ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৫, ২০১৯

print
সাকিবময় আফগান বধ

ক্রিকেটের রাজপুত্র ও ঈশ্বর উপাধি দুটি ভাগাভাগি হয়ে গেছে কিংবদন্তী ব্রায়ার লারা ও শচীন টেন্ডুলকারের নামে। সেটা তারা ডিজার্ভও করেন নিঃসন্দেহে। কিন্তু ক্রিকেটকে সাকিব আল হাসান যা দিয়েছেন বা দিচ্ছেন, তুলনীয় না হলেও সেটা কি তাদের চেয়ে খুব কম? এই প্রশ্নে স্পর্দ্ধা খুঁজতে পারেন অনেকেই, তাতে সাকিবের অবদান এতটুকু ম্লান হবে না। তিনি যে ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, সেটা বুঝতে হলে বোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন নেই, স্প্রেফে পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। অন্তত আমরা তাই সাকিবকে বলতে পারি ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটের রাজপুত্র’।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাউদাম্পটনের মাঠে সাকিব হাজির হলেন জীবন্ত কিংবদন্তীরূপে। অন্য সব ক্রিকেটাররা পারফরম্যান্স দিয়ে রেকর্ডকে ধাওয়া করেন আর স্বয়ং রেকর্ডই যেন সাকিবকে ধাওয়া করছে। গতকাল একা সাকিবের রেকর্ডের কাছেই হেরে গেছে টিম আফগান। ভারতকে নাস্তানাবুদ করার পর টাইগারদের বিরুদ্ধে আফগানদের হুমকি-ধমকি যেন হয়ে রইল স্প্রেফ কথার কথা।

আফগানদের হারানোর দিনে গতকাল সাকিবের গড়া কীর্তির যেন কোনো শেষ নেই। ব্যক্তিগত ২৩ রানে সাকিব আবারও উঠে গেলেন চলতি বিশ্বকাপের শীর্ষ রান সংগ্রাহকদের তালিকায়। এরপর ব্যক্তিগত ৩৫ রান করে ১৯তম ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বকাপের মঞ্চে এক হাজার রান করেন। আর অলরাউন্ডার নৈপুন্য সে তো ইতিহাস! প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বকাপে নিলেন ৫ উইকেট। তাছাড়া একই আসরে সেঞ্চুরি ও ৫ উইকেট নেওয়া এলিট ক্লাবে যোগ দিলেন তিনি, যেখানে আছেন যুবরাজ সিং ও কপিল দেবের মতো খেলোয়াড়রা। আর যুবরাজের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসাবে বিশ্বকাপের একই ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি ও পাঁচ উইকেট নিলেন সাকিব।

এখানেই শেষ নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে ১০০০ রান ও ৩০ উইকেটের ‘ডাবল’ এর মালিক হয়ে গেলেন সাকিব আল হাসান। সবমিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই টাইগারদের গতকালের জয়টি হয়ে রইল ‘সাকিবময়’। এর মধ্য দিয়ে সেমিফাইনালের স্বপ্নটা বেশ ভালোভাবেই ঝুলে থাকলো টাইগারদের দিকে।

সাউদাম্পটনে গতকাল টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন আফগান দলপতি গুলবাদিন নাইব। নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে টাইগাররা তুলেছে ২৬২ রান। ফিফটি হাঁকিয়েছেন ইনফর্ম দুই টাইগার ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম এবং সাকিব আল হাসান।

ইনিংসের পঞ্চম ওভারের দ্বিতীয় বলে বিদায় নেন লিটন দাস। মুজিব উর রহমানের বলে শর্ট কাভারে হাশমতউল্লাহ শহিদির তালুতে বন্দি হন লিটন। মাঠের আম্পায়ার আউটের সফট সিগন্যাল দিয়ে তৃতীয় আম্পায়ারের কাছে পাঠান। টিভি রিপ্লে দেখে থার্ড আম্পায়ার পাকিস্তানের আলিম দার লিটনকে আউট বলে ঘোষণা করেন। যদিও আউটটি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিদায়ের আগে ১৭ বলে দুই বাউন্ডারিতে ১৬ রান করেন লিটন। বাংলাদেশ দলীয় ২৩ রানের মাথায় প্রথম উইকেট হারায়।

ইনিংসের ১৭তম ওভারের শেষ বলে ৩৬ রান করা তামিমকে বোল্ড করেন মোহাম্মদ নবী। দলীয় ৮২ রানের মাথায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় উইকেট হারায়। ১৮তম ওভারের প্রথম বলে সাকিবকে এলবির ফাঁদে ফেলেন রশিদ খান। বাংলাদেশ রিভিউ নিলে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে বেঁচে যান সাকিব। ব্যক্তিগত ২৩ রানে সাকিব আবারো সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় শীর্ষে উঠেন। আর ব্যক্তিগত ৩৫ রান করে সাকিব ১৯তম ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে এক হাজার রান করেন। ইনিংসের ৩০তম ওভারে মুজিব উর রহমানের বলে এলবির ফাঁদে পড়েন সাকিব। তার আগে ৬৯ বলে এক বাউন্ডারিতে করেন ৫১ রান।

ইনিংসের ৩২তম ওভারের শেষ বলে মুজিব এলবির ফাঁদে ফেলেন সৌম্য সরকারকে। এরপর জুটি গড়েন মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ। এই জুটিতে আসে ৫৬ রান। দলীয় ২০৭ রানের মাথায় বিদায় নেন মাহমুদউল্লাহ। গুলবাদিন নাইবের বলে মোহাম্মদ নবীর হাতে ধরা পড়ার আগে তিনি ৩৮ বলে দুই বাউন্ডারিতে করেন ২৭ রান।

মুশফিক টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরির পিছনেই ছুটছিলেন। ইনিংসের ৪৯তম ওভারে বিদায় নেন ব্যক্তিগত ৮৩ রানে। চারটি চার আর একটি ছক্কায় মুশফিক তার ইনিংসটি সাজান ৮৭ বলে। মোসাদ্দেক হোসেন ২৪ বলে চারটি চারের সাহায্যে ৩৫ রান করে ইনিংসের শেষ বলে বোল্ড হন। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ২ রানে অপরাজিত থাকেন।

মুজিব উর রহমান ১০ ওভারে ৩৯ রান দিয়ে পান তিনটি উইকেট। দৌলত জাদরান ৯ ওভারে ৬৪ রান দিয়ে পান একটি। মোহাম্মদ নবী ১০ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে পান এক উইকেট। গুলবাদিন নাইব ১০ ওভারে ৫৬ রান দিয়ে দুটি উইকেট তুলে নেন। রশিদ খান ৯ ওভারে ৫২ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। ১ ওভারে ৭ রান দিয়ে রহমত শাহও ছিলেন উইকেটশূন্য।

২৬৩ রানের টার্গেটে নেমে শুরুটা ভালোই করে আফগানরা। ইনিংসের ১১তম ওভারে এসে বাংলাদেশ প্রথম উইকেটের দেখা পায়। সাকিব নিজের প্রথম ওভারেই ফিরিয়ে দেন ওপেনার রহমত শাহকে। ২১তম ওভারে এসে মোসাদ্দেক ফিরিয়ে দেন তিন নম্বরে নামা হাসমতউল্লাহ শহিদিকে। এরপর ইনিংসের ২৯তম ওভারে জোড়া আঘাত হানেন সাকিব। ৪৭ রান করা গুলবাদিন নাইবকে ফিরিয়ে দেওয়ার এক বল পরে বোল্ড করেন মোহাম্মদ নবীকে। ১০৪ রানের মাথায় চতুর্থ উইকেট হারানোর পর ম্যাচ শতভাগই চলে আসে বাংলাদেশের দিকে। বাকিটা ছিল স্প্রেফ সময়ক্ষেপণ।

সাকিব ১০ ওভারে ২৯ রান দিয়ে পান পাঁচ উইকেট। মোস্তাফিজ ৮ ওভারে ৩২ রান দিয়ে নেন দুটি উইকেট। মাশরাফি ৭ ওভারে ৩৭ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। মিরাজ ৮ ওভারে ৩৭ রান দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। সাইফ ৮ ওভারে ৩৩ রান দিয়ে একটি উইকেট পান। মোসাদ্দেক ৬ ওভারে ২৫ রান দিয়ে পান একটি।