ঢাকা, বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৯ মাঘ ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

শিক্ষক দম্পতির সন্তানরা আলো ছড়াচ্ছেন দেশ-বিদেশে

সাজেদ রোমেল
🕐 ৮:৩৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৫, ২০২২

শিক্ষক দম্পতির সন্তানরা আলো ছড়াচ্ছেন দেশ-বিদেশে

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের কয়েক দশক আগের অনুন্নত মধুপুর গ্রাম। সে গ্রামের সন্তান আব্দুল হান্নান এবং তার স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন। কত মানুষের সন্তানকে গড়ে তুলেছেন, সেই সঙ্গে নিজের তিন ছেলে ও এক মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আরও বড় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে। এখন তার সন্তানরা দেশ-বিদেশে শিক্ষার আলো যেমন ছড়াচ্ছেন, তেমনি করে অনুন্নত সেই মধুপুর গ্রামের দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন সপরিবারে।

সফল এই দম্পতির তিন ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে শাখাওয়াত হোসেন। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে। সেখান থেকে উচ্চ শিক্ষা শেষ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন। এখন তিনি দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।

মেঝো ছেলে ফয়সাল হোসেন পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগে। পড়াশোনা শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করার পর যুক্ত হয়েছেন সেদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায়। এখন তিনি ভার্জিনিয়ার এপিলিশিয়ান স্কুল অব ফার্মাসির সহকারী অধ্যাপক।

সবার ছোট ছেলে আফজাল হোসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনিও যোগ দিয়েছেন শিক্ষকতায়। এখন তিনি আশুগঞ্জের আব্বাস উদ্দিন খান সোহাগপুর মডেল কলেজের প্রভাষক।

আব্দুল হান্নান-মনোয়ারা দম্পতির সবচেয়ে ছোট সন্তান মেয়ে, তিনিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মাসি বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। একটি নামকরা ওষুধ কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও তিনি সন্তান নেওয়ার পর এখন গৃহিনী।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতির সব ছেলে দেশ-বিদেশে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তবে তারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন।

এমন প্রতিষ্ঠিত পরিবারতো অনেকেই আছে, এই পরিবারের বিশেষ করে বলার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তারা নিজেরা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করলেও এক জায়গায় খুব মিল। সবাই সুতোর টানটা তাদের সাফল্যের পেছনে মূল কারিগর তাদের মা-বাবার প্রতি। সেখানে সমাজ ও মানবিক কাজে সব ভাইবোন এক হয়ে কাজ করছেন, কাজ করছেন মানুষের জন্য। আশুগঞ্জ সদরে তাদের নিজেদের বাড়ি করেছেন, আর মধুপুরে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে স্কুল খুলে পশ্চাদৎপদ মানুষের সন্তানদের সুশিক্ষার আয়োজন শুরু করেছেন।

এছাড়া একটি মাদ্রাসা ও এতিমখানা গড়ে তুলেছন বাবা আব্দুল হান্নান। ছোট ছেলে সেই মাদ্রাসা ও এতিমখানাটি পরিচালনা করছেন স্থানীয় কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি। সেখানে অর্ধেক শিশুকে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তারা। ভবিষ্যতে গ্রামের প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের শিশুকে সাহায্য করার প্রত্যয় জানান আফজাল হোসেন। অন্য দুইভাই, সেই সঙ্গে তাদের বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী ও সহকর্মীদের সহায়তায় আরও বড় কিছু করতে চান হান্নান-মনোয়ারা দম্পতির সোনার ছেলেরা।

আফজাল হোসেন বলেন, করোনা মহামারিতে আমরা বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করেছি। সামনে আরও অনেক পরিকল্পনা রয়েছে মানুষের কিছু করার।

এই প্রতিবেদকের কথা হয় মা মনোয়ারা খাতুনের সঙ্গে। প্রশ্ন ছিল, সবগুলো ছেলে-মেয়ের এই সাফল্যের পেছনে মূল কারণ কী। উত্তরে তিনি বললেন, ছোট বেলা থেকেই আমি আমার সন্তানদের যা বলেছি, ওরা শুনেছে। যখন বলছি, এদিকে যেও না, ওরা যায়নি। ওরা আমার প্রতিটি কথা শুনেছে বলেই আজ সবাই ভাল করেছে।

দুজনেই চাকরিজীবী, চার সন্তানকে কীভাবে মানুষ করলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে মনোয়ারা খাতুন বলেন, চারটার সময় স্কুল ছুটি হয়ে যেত। আমি বাসায় এসে ওদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতাম। খাওয়ার পর ওদের পড়তে বসিয়ে আমি রান্না করতাম। আবার খুব ভোরে ওদের উঠিয়ে দিতাম। পড়ানোর পর সকাল নয়টার আগে গোসল করিয়ে স্কুলে চলে যেতাম। আর দুপুরের খাবার খেতে দিত কাজের সহকারী একটি মেয়ে।

মনোয়ারা খাতুন জানান, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সন্তানদের কাউকে শিক্ষক দেননি। নিজেরা দুজন পড়িয়েছেন। অংক ও ইংরেজি বাবা আব্দুল হান্নান এবং অন্য বিষয়গুলো মনোয়ারা খাতুন নিজেই পড়াতেন প্রাথমিক পর্যায়ে।

সন্তানরাতো প্রতিষ্ঠিত, এখন কী চান, এমন প্রশ্নে মনোয়ারা বেগম বলেন, আমি একটি কথাই বলে দিয়েছি সন্তানদের। কোনোভাবেই অসৎ টাকা উপার্জন করো না। কোনোদিন বেকায়দায় পড়লেও না, হালাল পয়সা ছাড়া কোনো কিছু দাবি নেই তোমাদের কাছে। এটাই আমার ও তোমাদের বাবার একমাত্র চাওয়া।

 

 

 
Electronic Paper