লোকঐতিহ্য অন্বেষার প্রাজ্ঞ পুরুষ

ঢাকা, সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০ | ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

লোকঐতিহ্য অন্বেষার প্রাজ্ঞ পুরুষ

বাতিঘর ডেস্ক ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০২০

print
লোকঐতিহ্য অন্বেষার প্রাজ্ঞ পুরুষ

প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক রওশন ইজদানী তার কর্ম দিয়ে মানুষের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছেন। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি সত্যের সাধনাকে ক্ষুণ হতে দেননি। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী রওশন ইজদানী সাহিত্যের সব শাখাতেই বিচরণ করেছেন। তিনি সৃজন ও মননে এদেশের লোকসাহিত্যের সম্পদ সম্পর্কে যে প্রীতি ও মমতার পরিচয় দিয়েছেন তা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রখ্যাত এ প্রাবন্ধিককে নিয়ে লিখেছেন সাজন আহম্মেদ পাপন

প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক, লোকসাহিত্যের গবেষক ও সংগ্রাহক রওশন ইজদানী। তিনি ‘মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তানের লোকসাহিত্য’-এ দুটি মৌলিক গবেষণা গ্রন্থের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। তার কর্মের জন্য মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। রওশন ইজদানীর রচনায় তার মানবতা বোধের পরিচয়কে উজ্জ্বল করে রাখবে। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি সত্যের সাধনাকে ক্ষুণ হতে দেননি। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী রওশন ইজদানী সাহিত্যের সব শাখাতেই বিচরণ করেছেন। 

তিনি সৃজন ও মননে এদেশের লোকসাহিত্যের সম্পদ সম্পর্কে যে প্রীতি ও মমতার পরিচয় দিয়েছেন তা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ১৯৬৬ সালের ২১-২৫ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত এশীয় লোকসাহিত্য সম্মেলনের আমন্ত্রণক্রমে ‘পূর্বপাকিস্তানের লোকসাহিত্য’ প্রবন্ধ রচনা করেন। লোকসাহিত্য আমাদের জাতীয় পরিচয়ে একটি বৃহৎ অংশ। তিনি বহু শ্রম স্বীকার করে পল্লীতে পল্লীতে ঘুরে তার নিজের অঞ্চলের লোকসাহিত্যের সন্ধান ও পরিচয় দিয়ে ‘পূর্বপাকিস্তানের লোকসাহিত্য’ গ্রন্থ রচনা করেছেন।

কবি রওশন ইজদানীর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাহিত্য সেবা তার জীবনের মুখ্য ছিল, কর্মজীবন ছিল অনেক খানি গৌণ। সাহিত্যের জন্য তিনি দারিদ্র্যতাকে বরণ করে নিতে কুণ্ঠিত ছিলেন না। দারিদ্র্য-পীড়িত জীবনের দুঃখ-বেদনাকে লোক সমক্ষে প্রকাশও করতেন না। কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সহপাঠী ফয়জুর আহমদের মাধ্যমে তার দারিদ্র্য জর্জড়িত জীবনের কিছুটা ইতিহাস জানা যায়।

কবির মৃত্যুর পর আঠারবাড়ীতে অনুষ্ঠিত স্মরণ সভায় লিখিত ভাষণে ফয়জুর রহমান আহমদ বলেন, ‘দারিদ্র্যতা নজরুলকে দিয়ে ছিল দুরন্ত সাহস, কিন্তু রওশন ইজদানীকে করেছিল বিনয়ী। আর্থিক অসচ্ছলতার সঙ্গে আমরণ বুঝে গেলেন ঋণ সালিশী বোর্ডের কেরানী থেকে ব্রাঞ্চ পোস্ট-অফিসের পোস্ট-মাস্টার পর্যন্ত। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতাও তাকে করতে হয়েছে। এদিক দিয়ে তার রুটি সংস্থানের বেদনাময় ইতিহাস কবি নজরুলের রুটির দোকানের চাকরির ইতিহাসের চাইতে বোধহয় কম মর্মান্তিক হবে না। কবির অনুরোধে এখনো অপ্রকাশিত তার জীবনের দারিদ্র্যতার অনেক কাহিনি।’

সাহিত্যের ওপর রাজনীতির প্রভাব সর্বকালে সর্বদেশেই অনুভূত হয়েছে। বাদ যায়নি কালজয়ী এ কবির বেলাতেও। রাজনীতির শিকার হয়ে একরকম কোণঠাসা ছিল। তার মৃত্যুর পরও তাকে সাহিত্য জগতে আড়াল করে রাখা হয়েছে। কিন্তু তার কর্মকে মুছে দেওয়া যায়নি। কবির জীবদ্দশায় একান্ত আদর্শবাদী জাতীয় ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ আদর্শের সংগ্রামে ছিলেন আপসহীন। তার সৃষ্টিতে সকল প্রকারের সেই আদর্শেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। শিক্ষা বিস্তারেও তার আগ্রহ কম ছিল না। রওশন ইজদানী সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন তার গ্রামকে। সেই জন্য দেখা যায় কাছাকাছি স্কুল থাকা সত্ত্বে¡ও স্বগ্রামে আরও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাকে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে। কবির বন্ধু তৎকালীন ময়মনসিংহ শহরের এনাম প্রেসের প্রাক্তন মালিক এবং সাহিত্যমোদী তাহেরউদ্দিন মল্লিককে এ প্রসঙ্গে একটি চিঠি লিখেন। পরবর্তীতে ১৯৬২ বিদ্যাবল্লভ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১৯৬৬ সালে রওশন ইজদানী একাডেমি (উচ্চ বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠিত হয়।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও সহযোগিতা ছাড়াই রওশন ইজদানী ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যের সংগ্রহে ও বিশ্লেষণে যে বিশাল কাজ সম্পন্ন করেছেন তাতে তার একনিষ্ঠ সাধনাই জয় লাভ করেছে। বাংলা একাডেমি থেকে এখন প্রতিবছর ফোকলোর সিরিজ প্রকাশিত হয়, ‘মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য’ ছিল সে সিরিজের প্রথম প্রকাশনা। তিনি ময়মনসিংহের বিখ্যাত বাউলদের সম্পর্কেও ‘আজাদ’ ও ‘মোহাম্মাদী’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ রচনা করেছেন। বাউল কবি আব্বাছ, বাউল সাধক রশিদ উদ্দিন ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ। লোকসাহিত্যের আঙ্গিকে কাব্যরচনা করে যিনি সর্বাপেক্ষা খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি সেই লোক-ঐতিহ্য অন্বেষার প্রাজ্ঞ পুরুষ রওশন ইজদানী।

ইসলামী ঐতিহ্য আর বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সমন্বয় লক্ষ্য করা যায় ‘খাতামুন নবীঈন’ কাব্যগ্রন্থে। হজরত মোহাম্মদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলিকে সাধারণ বাংলা ভাষায় বর্ণনা করতে গিয়ে পুরো কাহিনিটিকেই বাংলার গ্রামীণ জীবনের ছবি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ভাষা, শব্দ, রূপক, বর্ণনাভঙ্গি সবকিছুই গ্রাম্য। কাব্যটিতে হজরত মোহাম্মদ যেন আরব জাহানের বাসিন্দা নন, তিনি বাংলাদেশেরই মাটির মানুষ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছেন। কাব্যের ‘আরজ’ অংশে কবি এই বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে বলেছেন, ‘পল্লী ভাষায় পল্লী মাটির প্রাণের সুরে বিরচিত নবীজীর জীবন কাব্য’।

১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কাছে মাসিক সাহিত্য ভাতা মঞ্জুরী চেয়ে দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যব্রতীদের সুপারিশসহ আবেদন করেছিলেন। এ আবেদনের প্রেক্ষিতে কবির নামে সরকারি ভাতা মঞ্জুর করা হয়। কবিপুত্রের ভাষ্যমতে, রওশন ইজদানী লেখেননি এমন দিন তার জীবনে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তিরিশের দশক থেকে ষাট দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল তার ছত্রিশ বছরের সৃষ্টিশীল সাহিত্য-জীবন। এর মধ্যে তিনি বিস্তর পল্লীগীতি রচনা করেছেন, গ্রাম্য কিস্সা-কাহিনি, গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, জীবনী, গাঁথাকাব্য লিখেছেন- গ্রামে গ্রামে ঘুরে লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেছেন- সেগুলোর গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে মূল্য নির্ধারণ- এমনি অনেক কিছু। প্রায় মৃত্যু পর্যন্ত তার এই সাহিত্য প্রয়াস অব্যাহত ছিল।

আর এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্তব্যনিষ্ঠ, যদিও দৈনন্দিন সংসার জীবনে তার উদাসীনতা সম্পর্কে অনেক কথাই শোনা যেত। তার প্রতিটি রচনারই তিনি হিসাব রেখেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সমস্ত রচনা, বইপত্রাদি দুটি আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানায়। মৃত্যুর আগে তার বিশিষ্ট বন্ধু ও সাহিত্যরসিক আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাকের উদ্দেশ্যে তার শেষ কথাটি ছিল- ‘কিশোরগঞ্জের একটি প্রেসে একটি বই যন্ত্রস্থ রয়েছে- উনি যেন তা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।’ রওশন ইজদানীর কর্ম ও সাহিত্য জীবনের পর্যালোচনায় তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোও আমাদের নজরে পড়ে।

প্রকাশনা ও কাব্যগ্রন্থ
কবির পরিবারে অনেক আগে থাকতেই পুঁথি ও লোকসাহিত্যের চর্চা ছিল। তাই সঙ্গত কারণেই তিনি পুঁথিসাহিত্য ও লোকসাহিত্যের দিকে আকৃষ্ট হন। পল্লী সাহিত্যের মধ্যেও ইসলামি বিষয়বস্তুর আধিক্য দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন এ ধারায় কবিতা ও গান রচনা করতে প্রয়াসী হন। এগুলো ছাড়াও তিনি ২টি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন এবং পুঁথি, গাঁথা, প্রবন্ধ এবং জীবনী গ্রন্থও রচনা করেন। কবি রওশন ইজদানীর প্রকাশিত গ্রন্থ ২৬টি এবং অপ্রকাশিত গ্রন্থ ১৮টি। পাঠ্যপুস্তক প্রকাশনার সংখ্যা ৬টি।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো- নীল দরিয়া, মরুর কাফেলা, হৃদয় বীণা, চলতি দুনিয়া, ফুলপরী, ভাঙ্গা বীণা, বন্ধের বাঁশী, বজ্রবাণী, রাহগীর, চিনুবিবি, ফরিয়াদ, ইসলাম জাহানের দুই সেতারা, ইউসুফ জুলায়খা, বীনা ও রগিনী, সৃষ্টিকাব্য, মোমেনশাহীর প্রাচীন পল্লী ও সমাজ জীবন, জাতীয় উন্নয়নমূলক ধারাবাহিক পল্লীগাঁথা নয়া জামানা, নাটক সরোজিনী, কলঙ্কিনীরুপী, পালাগান মণিমালা, জমিলা সুন্দরী, পাঠ্যপুস্তক রচনা নতুন পড়া, কচিপাঠ, ফুলকলি, খোলাফায়ে রাশেদীন ইত্যাদি। স্কুলে পড়ার সময়ে কিশোর মাসিক ‘পাঠশালা’য় কবির প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। তিন দশককাল সাহিত্য সাধনার সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশের মানুষের বিভিন্নমুখী সমস্যা-সংকট, দুর্ভিক্ষ, ইসলামি দুনিয়ার বীর নায়কদের কথা, পূর্বপাকিস্তানের লোকসাহিত্যের পরিচয় করিয়েছেন।

১৩৫২ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা মাসিক মোহাম্মদীতে ‘বাংলার দুর্ভিক্ষের কারণ ও তার প্রতিকার’ শীর্ষক প্রবন্ধে পঞ্চাশের মন্বস্তর সৃষ্টির পেছনে কি কি ঘটনা ক্রিয়াশীল ছিল তার বিশদ বর্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কম উৎপাদন, সরকারের গাফিলতি, কুটির শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেকারত্ব, ব্যাপক কাগুজে মুদ্রা চালু, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ধনতান্ত্রিক শাসনের সংকট ইত্যাদিকে দুর্ভিক্ষের কারণরুপে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের জন্য তিনি ১৮টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও এই প্রবন্ধে উপস্থিত করেন। একই বছরের পৌষ সংখ্যা মাসিক মোহাম্মদীতে ‘সমবায় ও ব্যবসা’ নামে তার আরেকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন উন্নত দেশে সমবায়ের মাধ্যমে অগ্রগতি অর্জনের আলোচনা করে তিনি প্রবন্ধের উপসংহারে আমাদের দেশেও সমবায় চালু করার প্রস্তাব করেন। ১৩৫৮ সালে মাসিক মোহাম্মদীর কয়েকটি সংখ্যায় ‘আল্লাহর অসি’ নামক প্রবন্ধে মুসলিম জাহানের বীর যোদ্ধা খালেদের বীরপনার কথা আলোচিত হয়েছে। ‘ইসলাম জাহানের দুই সেতারা হজরত ওমর ও খালেদ’ ও অনুরূপ একটি গ্রন্থ।

জন্ম ও পারিবারিক জীবন
রওশন ইজদানী ১৯১৭ সালে নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার বিদ্যাবল্লভ গ্রামে এক মধ্যবিত্ত অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ আলী কবির। কবির পিতা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। তিনি পীর ফকিরদের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। নিজেও ফকিরালী করতেন। ইজদানী ছিলেন একমাত্র পুত্র এবং সন্তান-সন্তদির মধ্যে চতুর্থ। তার বড় ছিলেন তার তিন বোন। তার বড় দুই বোন ছিলেন অত্যন্ত মেধা শক্তির অধিকারিণী এবং তৎকালীন ছাত্র বৃত্তি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ ও বহু সরকারি পুরস্কারপ্রাপ্ত।

কবিপত্নী জুবায়দা আখতার খাতুন ছিলেন কবির গ্রাম দুই মাইল দূরের ওয়াই গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। সুন্দর কণ্ঠের অধিকারিণী ছিলেন তিনি। জানা যায়, আব্বাসউদ্দীন তার গান রেকর্ডের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। কবি পরিবারের রক্ষণশীলতার জন্য তা হয়নি। জুবায়দা আখতার খাতুন কবিকে পাঁচটি পুত্র ও দুটি কন্যা সন্তান উপহার দেন। কবিপত্নী ১৯৮১ সালে মারা যান। রওশন ইজদানীর বাড়ি দক্ষিণমুখী। বাড়ির সামনে ছোট একটি পুকুর। কবির পরিবারের বর্তমান আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়।

রওশন ইজদানী সম্পর্কে মূল্যায়ন
১. Raoshan Izdani is a popular poet, a really devoted literature, unassuming, simple and social in private life.
-‘পূর্বপাকিস্তানের লোকসাহিত্য’ গ্রন্থের প্রকাশক : ১৯৬৬।
২. তিনি (রওশন ইজদানী) একান্ত যুক্তিবাদী, রুচিবান, হাস্যরসিক ছিলেন। তাহার শ্লেষাত্মক কবিতা সাধারণের কাছে উপভোগ্য ছিল। ...কবির মাতৃভক্তি আদর্শনীয়। মাতার জীবদ্দশায় কবি তাহাকে ছাড়িয়া দীর্ঘদিনের জন্য কোথাও গমন করেন নাই- কারণ, বিদেশ যাত্রার প্রতি মাতার একান্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল।
-কবি রওশন ইজদানী -(জীবনী) : এম. ইয়াসিন।
৩. ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। তাহার বিনয় নম্র ও মধুর ব্যবহার লোককে সহজেই আকর্ষণ করিতে পারিত।
-সম্পাদকীয়, আজাদ, ২৩ জুন, ১৯৬৭।
৪. তার রচনায় যে মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা তার মানবতাবোধের পরিচয়কে বহুকাল আমাদের নিকট উজ্জ্বল করিয়া রাখিবে। জীবনের সহিত যুদ্ধ পদে পদে তাকে অগ্রসর হইতে হইয়াছে- প্রতি মুহূর্তে তার জীবনীশক্তি ফুরাইয়া আসিয়াছে... কিন্তু তিনি যে মনোবল, পৌরুষ ও সত্যের সাধনাকে কখনো ক্ষুণ হইতে দেন নাই, এটাই তার জীবনযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিষয়।
-সম্পাদকীয়, ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ২৩ জুন ১৯৬৭।
৫. তার মৃত্যু আমাদের বিচলিত করিয়াছে। আমাদের সঙ্গে তার আকর্ষণ ছিন্ন হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তার মধুর ব্যবহার এবং বন্ধুবাৎসল্য আমাদের স্মৃতিপটে চিরজাগ্রত হইয়া থাকিবে।
-আব্দুল মালেক, ‘আজাদ’ ২ জুলাই ১৯৬৭।
৬. ...কবি রওশন ইজদানী সত্যি একজন সহজ সরল নিরহঙ্কার মানুষ। আমাদের লোকসাহিত্যের মতোই অকৃত্রিম আর মমতা ভরা তার মন।... তিনি ছিলেন মৃদুভাষী, অমায়িক প্রকৃতির লোক। কোনো বিষয়ে মতান্তর হলেও এ কারণেই তার সঙ্গে মনান্তর হতো না।
-‘রওশন ইজদানী: তার স্মৃতি’: মোহাম্মদ মহফুজউল্লাহ।
৭. লেখার ব্যাপারে রওশন ইজদানী ছিলেন খুবই সচেতন ও বাস্তববাদী। এবং একই সঙ্গে সুরসিকও। আমার ‘চেনা মানুষের জারী’ পুস্তকের ইব্রাহীম খাঁ সম্পর্কিত পদ্যের একটি পংক্তির রচয়িতা তিনি। আমি লিখেছিলাম-
প্রথমে চোখেতে পড়ে ইব্রাহিম খান...
এর পরের লাইন
‘রসে ভরা টসটসে তরতাজা প্রাণ’
লিখেছিলেন রওশন ইজদানী। তিনি ছিলেন এমনই সহজ সুন্দর স্বভাব কবিত্বগুণের অধিকারী।
-তাহেরুদ্দীন মল্লিক
৮. গ্রামের মানুষের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। গ্রামের অনেক সেবামূলক কাজ করতেন তিনি। রওশন ইজদানী ছিলেন আসলেই একজন শিল্পী। তার গৃহটি ছিল বাঁশের সুন্দর কারুকাজম-িত। ঘরের দরজা-জানালায় সুন্দর নকশা ছিল তারই শিল্পীমনের রচনা। অতিথিপরায়ণতা-অসাম্প্রদায়িকতা ছিল তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। আমার সঙ্গে তার বয়স ও চিন্তা-চেতনাগত বিস্তর ফারাক সত্ত্বেও আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ।
-অধ্যাপক যতীন সরকার।

শিক্ষা
১০ বছর বয়সে পিতার মৃত্যু হলে স্থানীয় ওল্ড স্কিম মাদ্রাসায় রওশন ইজদানীর বিদ্যাশিক্ষার হাতে খড়ি। পরে আশুজিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হন কবি। কবির মাতা আতাফুন্নিসা ছিলেন একজন মিষ্টভাষিণী, সরলা ও ধর্মপরায়ণ গ্রাম্য মহিলা। কবির মাতৃভক্তি আদর্শ স্থানীয়। কবি বাল্যকালে মৌলভী আনসার আলী তালুকদারের কাছ থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘কাছাছুল আম্বিয়া’ ও ‘তাযকেরাতুল আওলিয়ার’ কাহিনি শুনে সূফী মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি একজন সত্যিকারের কামেল পুরুষের সন্ধানে ব্যাকুল হন। দীর্ঘদিন পর তিনি সেই পরশ পাথরের সন্ধান লাভ করেন। পীর-ই-কামেল মৌলভী হাফেজ সিরাজ উদ্দীন ছিলেন সেই কষ্টি পাথর। রওশন ইজদানীর মুর্শিদের নির্দেশনানুযায়ীই হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর ওপর একটি পুরো কাব্য ‘খাতামুন নবীঈন’ রচনা করেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা
রওশন ইজদানী ‘খাতামুন নবীঈন’ লিখে ১৯৬০ সালে সাহিত্যকর্মের জন্য ‘আদমজী সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেছিলেন। ‘খাতামুন নবীঈন’ সম্পর্কে কবি বলেছিলেন- এ লেখা সার্থক হয়েছে। অশেষ শোকর গোজার যে, আল্লাহ পাক এ সৎ নিয়ত ও কর্মের জন্য শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করেছেন এবং এর বদৌলতে আখেরের পুরস্কার প্রত্যাশা করি।

কর্মজীবন
১৯৪৮ সালে ‘দৈনিক আজাদের’ রিডিং সেকশনে যোগ দেন তিনি। এরপর ১৯৫৮ সালে ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনের প্রুফ রিডার, গ্রেড-১ পদে যোগদান করেন। ভগ্ন স্বাস্থ্যের জন্য ১৯৫৯ সালে প্রুফ রিডারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেন।

সহায়ক তথ্যপঞ্জি

১. রওশন ইজদানী : ১৯৮০
ইমামুর রশীদ : বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

২. মোমেনশাহীর লোকসাহিত্য : ১৯৫৮
রওশন ইজদানী : বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৩. পূর্বপাকিস্তানের লোকসাহিত্য : ১৯৬৬ : রওশন ইজদানী।

৪. কবি রওশন ইজদানীর জ্যেষ্ঠ পুত্র জনাব জুলফিকার ইজদানীর কাছ থেকে প্রাপ্ত কবির পা-ুুলিপি।