শতবর্ষী বৃক্ষের শীতল ছায়া

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

শতবর্ষী বৃক্ষের শীতল ছায়া

সাইফ-উদ-দৌলা রুমী ১১:০২ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২০

print
শতবর্ষী বৃক্ষের শীতল ছায়া

প্রখর রোদে বটতলার বাজার পানেই যাচ্ছিলেন পণ্ডিত মশাই। হাতে ছাতাও ছিল। কিন্তু মেলতেই ভুলে গিয়েছিলেন। বটগাছের তলে এসেই তবে মেললেন ছাতাটা। আর এটা দেখেই সবার কৌতুহল, বিষয়টা কি? পণ্ডিত মশাই মুচকি হেসে জবাব দিলেন, প্রখর রোদে তো আর কাক নেই, কিন্তু বটগাছে আছে। নির্লজ্জ এ পাখিটির পায়খানা থেকে মাথা বাঁচাতেই এ ব্যবস্থা। শুনে সবাই বললেন, একেই বলে বটতলার প-িত। একটা সময় ছিল যখন, উকিলরা চেয়ার-টেবিল পেতে বটতলাতে চেম্বার চালাতেন। সে কারণে তাদের বলা হতো বটতলার উকিল।

আবার সন্ধ্যা নামলেই বটের ডালে জ্বিনেদের আনাগোনা শুরু হয়- এমন কল্পকাহিনী কম বেশি সবাই শুনেছি। বটগাছ নিয়ে অনেক লোক কথা থাকলেও আমগাছও কম যায় না। ইংরেজদের কাছে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের সাক্ষী এ গাছটি। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ইংরেজদের সঙ্গে নবাব বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছিল পলাশীর আম্রকাননে। সে যুদ্ধে নবাব বাহিনী পরাজয় বরণ করে।

এর মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়। আবার স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের সাক্ষীও এ আমগাছ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।

শুধু তাই নয়; বাংলাদেশের জাতীয় ফল, ফুল, মাছ, পশু, পাখি, এমনকি জাতীয় উদ্যানও রয়েছে। তবে ছিল না জাতীয় বৃক্ষ। সে অভাবও ঘুচিয়েছে আমগাছ। দীর্ঘ ৩৯ বছর পর ২০১০ সালে জাতীয় বৃক্ষের তকমা পায় আমগাছ।

শতবর্ষী এমন কয়েকটি আম ও বটবৃক্ষ নিয়ে আজকের আয়োজন-

এশিয়ার বৃহত্তম বটগাছ
রাজিব হাসান, ঝিনাইদহ
সুঁইতলা মল্লিকপুর! নামটি শুনলেই শিহরে উঠে শরীর। সেখানে নাকি জ্বীনদের বসবাস। সন্ধ্যা নামলেই বিশাল আকৃতির বটগাছে জ্বীনদের আনাগোনা দেখা যেত। কে দেখেছে সেটা কারও জানা না থাকলেও এমন লোক কথা প্রচলিত আছে ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার সুঁইতলা মল্লিকপুর গ্রামে। জ্বীনদের আনাগোনা লোক কথা হলেও সেখানে যে বিশাল আকৃতির বটগাছ আছে এটা সত্য। প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর পুরনো গাছটি এশিয়ার বৃহত্তম বটগাছ। কালীগঞ্জ শহর থেকে নয় কিলোমিটার পূর্ব দিকে কালীগঞ্জ- আড়পাড়া সড়কের পাশ ঘেঁষে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এ বৃক্ষটি। অতি প্রাচীন এ বৃক্ষটির বড় বড় ডালপালাগুলো বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছে। বৃক্ষটির পূর্ব ও দক্ষিণ দিক দিয়ে বয়ে গেছে কালীগঞ্জ থেকে মাগুরা জেলার আড়পাড়া যাওয়ার পাকা সড়ক। মূল গাছটি এখন না থাকলেও বর্তমানে ৪৫টি ভিন্ন ভিন্ন গাছ তিন একর ৯১ শতক জমিজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে আছে। যার মধ্যে ৩৪৫টি বায়বীয় মূল রয়েছে। যে মূলগুলো মাটির গভীরে প্রবেশ করেছে। আর ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে ৩৮টি মূল। ২০০৯ সাল থেকে যশোর সামাজিক বন বিভাগ বৃক্ষটি রক্ষাণাবেক্ষণের কাজ করে আসছে। বৃক্ষটি কোন স্থানে প্রথম জন্মেছিল তা নিয়ে রয়েছে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে নানা মত। তবে মল্লিকপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দলিল উদ্দীন জানান, পশ্চিম পাশে বর্তমানে যেদিক দিয়ে প্রাচীর দেওয়া হয়েছে, এ প্রাচীরের কোলঘেঁষে মধ্যবর্তী স্থানে একটা কুয়া ছিল। ছোটবেলায় বাপ-দাদার মুখে শুনেছেন এখানেই বৃক্ষটি জন্মেছিল। পরে মূল ছেড়ে চারদিকে বিস্তৃতি লাভ করেছে। যদিও বর্তমানে বৃক্ষটির উৎপত্তি স্থল ও কুয়ার কোনো অস্থিত্ব নেই। কালেরগর্ভে তা বিলীন হয়ে গেছে। বৃক্ষটি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বেথুলী গ্রামের মৌজায় জন্মালেও দেশ বিদেশে এটা সুঁইতলা মল্লিকপুরের বটবৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। কুয়ার পাশে গাছটি জন্মানোর কথা সঠিক বলে ধরা হলেও কে বৃক্ষটি লাগিয়েছিলেন তার সঠিক ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়নি।


হিরণ্যকান্দির শতবর্ষী আমগাছ
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার হিরণ্যকান্দি গ্রামের নাম বেশ পরিচিত। এ পরিচিতির কারণ হচ্ছে শতবর্ষী একটি আমগাছ। হিরণ্যকান্দি গ্রামের বাচ্চু শেখ ও তার দুই ভাইয়ের ৫৪ শতাংশ জমির ওপর শতবর্ষী এ আমগাছটি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। চারদিকে এর বড় বড় ডালপালা, মূলগুলি গাছ থেকে নেমে মাটি স্পর্শ করে আবার উপরের দিকে উঠে গেছে।
আমগাছটির বয়স নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে নানা মত আছে। কেউ বলেন, এর বয়স ১০০ বছরের বেশি। কেউ বলেন ১৫০ বছর। আবার অনেকেই আছেন, বয়স বাড়িয়ে ২০০ ঘরে নিয়ে যান। তবে যত মতভিন্নতা থাকুক, বিশাল আকৃতির যে গাছটি প্রায় দুই বিঘা জমিতে ছড়িয়ে তাকে অন্তত শতবর্ষী না বলে উপায় থাকে না।
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ডে নেমে পূর্ব দিকে ইট বিছানো সর্পিল সড়ক দিয়ে আনুমানিক ৩০০ গজ এগোলেই দেখা মিলবে এ গাছের। ৫৪ শতাংশ জমির উপর রয়েছে অতিকায় এ প্রাচীন গাছটি। এ জায়গার মালিক এখন বাদশা শেখ। তিনি বলেন, দেশি প্রজাতির আমগাছটি আমাদের পূর্ব পুরুষের কেউ রোপণ করেছিলেন। কে করেছেন তা জানা নেই আমার। আমার বাবা, আমার দাদাও এ আকারেই দেখেছেন গাছটি।’
হিরণ্যকান্দির এ গাছে প্রতি বছর প্রচুর আম ধরে। কাঁচা আম টক কিন্তু পাকলে সুমিষ্ট। ফলনভেদে কোনো বছর ৫০০ মণ আবার কোনো বছর ৭০০ মণ আম হয় এ গাছে।
গাছটি দেখতে প্রতিদিন কম করে হলেও ১৫০-২০০ মানুষ আসে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। পিকনিক করতেও আসে অনেকে। বিশেষত নববর্ষ বা দুই ঈদের সময় দর্শনার্থীদের পদভারে মুখর থাকে আমগাছের চত্বরটি।
বিশালকায় গাছটির বিশালতা দেখার মতো। গাছের নয়টি কা- বটগাছের মতো মাটি ছুঁয়ে রয়েছে। গাছের নিচে অন্য কোনো গাছ বা আগাছা নেই। একচু দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ রঙের একটি টিলা দাঁড়িয়ে রয়েছে।


মেহেরপুরের আম্রকানন
মাজেদুল হক মানিক, মেহেরপুর
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মভূমি মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আ¤্রকানন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এ স্থানটিতেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায় সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন।
দক্ষিণে খোলা মাঠ আর পশ্চিমে আবাসন। পূর্ব দিকে বিশালাকৃতির বাংলাদেশের মানচিত্র। এর মাঝে আম বাগান। যেদিকে চোখ যায় সেদিকে আম গাছের সারি। প্রচ- তাপদহ থেকে পরিশ্রান্তি দেয় আমগাছের মায়ামাখা ছায়া। দর্শনার্থী আর স্থানীয় মানুষের কাছে প্রায় দেড়শ বছর ধরে এভাবে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে মেহেরপুরের মুজিবনগর আম্রকানন। স্বাধীনতার পর থেকেই বাগানটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বাগানের মধ্যেই রয়েছে স্মৃতিসৌধ আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগাঁথা গৌরবদিপ্ত স্বাধীনতার ইতিহাস সম্বলিম্ব বিভিন্ন স্থাপনা।
বাগানের ইতিহাস সম্পর্কে স্থানীয়রা বলেন, শপথের সেই সময় থেকে মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় ৫০ বছর। তখন প্রায় আড়াই হাজার আমগাছ ছিল। সেই সময় আমগাছগুলোর বয়স ছিল ৫০ বছরের বেশি। এখন একেকটি গাছের বয়স ১০০ বছরের উপরে। বর্তমানে কয়েক প্রজাতির ছোট বড় এক হাজার ৪৫টি আমগাছ রয়েছে। মারা গেছে অসংখ্য গাছ। বিশালাকৃতির গাছগুলো মাথা উঁচু করে যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে জমিদার চারুবাবুর শাসন আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্তিত্ব সূর্যোদয়ের ঐতিহাসিক ঘটনার। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে স্বেচ্ছায় ৫০ বছর ধরে দশনার্থীদের ইতিহাস শোনাচ্ছেন সুভাষ মল্লিক। তিনি বলেন, অবিভক্ত বাংলার জমিদার কেদারনাথ রায় তার স্ত্রীর আচারের বাগান হিসেবে এ আম বাগানটি তৈরি করেন।


রহস্যে ঘেরা যুগলবৃক্ষ
মিজানুর রহমান, তানোর (রাজশাহী)
তাল, তমাল, জারুল, বট, হিজলের দেশ বাংলাদেশ। দেশের আনাচকানাচে এ গাছগুলো ছড়িয়ে রয়েছে। এর কোনোটি বয়সে নবীন আবার কোনোটি বহু বছরের, বহু ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজশাহীর তানোর উপজেলা সদর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে মু-ুমালা পৌরসভা এলাকার ময়েনপুর গ্রামে রয়েছে এমনই একটি বটগাছ। যেটির বয়স প্রায় ৪০০ বছরের উপরে। গাছটির প্রকৃত বয়স কত, তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও এলাকায় ওই গাছটি ‘রহস্য বটবৃক্ষ’ হিসেবে পরিচিত এবং সমাদৃত। পুরোনো এ গাছ দেখতে বহু দর্শনার্থী ভিড় করেন।
স্থানীয়দের ধারণা প্রায় ৪০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে বটগাছটি। শুধু বটগাছ বললে ভুল হবে বট আর পাকুড় বৃক্ষের দৃষ্টিনন্দন যুগলবন্দি এক রহস্য বৃক্ষ। রাস্তার দুই পাশে ছড়িয়ে পড়েছে গাছটির বিশাল শাখা-প্রশাখা। শিকড়-বাকড়ে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। প্রায় ৪০০ বছরের বট গাছটি আজও রয়েছে তাজা তরুণ আর চিরসবুজ। যেন বার্ধক্যের ছাপ একটুও পড়েনি। আর সে কারণেই এ বটগাছকে ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটি ঘিরে নানা রহস্যেঘেরা এসব কাহিনী বংশ পরম্পরায় চলে এসেছে। এ গাছের ডালপালা যেমন চারদিকে বিছিয়ে গেছে তেমনি কল্পকাহিনী বছরের পর বছর ধরে ডালপালা গজিয়েছে।
এসব কারণে উপজেলার ময়েনপুর গ্রামের এ যুগলবৃক্ষ দেখতে আসে দূর-দূরান্তের অনেক পর্যটকরা। এসব বিবেচনায় দাবি উঠেছে গাছটিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকিয়ে রাখার। এটি একটি মূল্যবান প্রতœসম্পদ হিসেবেও রক্ষণাবেক্ষণের দাবি সচেতন মহলের।


হরিণমারীর সূর্যাপুরি আমগাছ
হাসান বাপ্পি, ঠাকুরগাঁও
দূর থেকে দেখে মনে হতে পারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যেন কোনো বট বা পাকুড় গাছ। আবার অনেকের কাছে মনে হতে পারে এটি কোনো সুসজ্জিত আম বাগান। মনে আসা নানা ধারনা বা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে। সেখানে দেখা যাবে বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ আমগাছ। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার হরিণমারী সীমান্তে অবস্থিত এ আমগাছটি। ধারণা করা হয়, সূর্যাপুরি জাতের এ আমগাছটি প্রায় ২২০ বছরের পুরনো। গাছটি তার বিশাল আকৃতির ডালপালাগুলি ছড়িয়ে দখল করে নিয়েছে প্রায় তিন বিঘা জমি। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ এবং প্রকৃতির অপার এ সৃষ্টিকে দেখতে এখানে ভিড় করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং দেশের বাহির থেকে আসা দর্শনার্থী ও পর্যটকরা। পৈত্রিক সূত্রে বিশাল এ আমগাছটির মালিক সাইদুর রহমান ও নূর ইসলাম। তারা জানান, আমগাছটি তার পূর্ব পুরুষেরা ঠিক কবে লাগিয়েছিলেন তার সঠিক কোনো তথ্য কেউ বলতে পারেনি। তবে এ গাছ সম্পর্কে তারা জেনেছেন দাদার কাছ থেকে। তাদের দাদা আবার জেনেছেন তার দাদার কাছ থেকে।
এভাবেই আনুমানিক ২২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি।
গাছটির আম খুবই সুস্বাদু।
মৌসুমে ১০০ মণের বেশি আম
পাওয়া যায় এটি থেকে।

কেওয়া বাজারের বটবৃক্ষ
তানজেরুল ইসলাম, গাজীপুর
‘কি শোভা কি ছায়াগো, কি স্নেহ কি মায়াগো, কি আঁচল বিছায়েছো বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।’ এ চরণে গ্রামবাংলার অপরূপ শোভা, ছায়া-মায়া ও স্নেহের আঁচল বিছানো স্থান যেন আমাদের বটবৃক্ষের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ছায়াদানকারী বটবৃক্ষ আজরও কেবল গ্রামবাংলার উপমা নয়, ঐতিহ্যের স্বাক্ষীও বটে।
এক সময় গ্রামবাংলার হাটবাজার বটবৃক্ষ কেন্দ্র করে বসানো হতো। দেশের অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত স্থানে কবি-সাহিত্যিকের গল্প-কবিতা-গানে ঐতিহ্যের ধারক বটবৃক্ষের কথাই চলে আসে। বটবৃক্ষ নিয়ে হাজারও রহস্য এবং আষাঢ়ে গল্প এখনও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নিবিড় নির্জন সবুজ গাঁও-গেরামে। রূপকথার রাজকন্যা আর রাজকুমারের মধুময় প্রেমের কালজয়ী সাক্ষীও রাখা হতো বটবৃক্ষকে।
ঠিক তেমনি ৪০০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কেওয়া বাজারের বটগাছটি। ঐতিহ্যবাহী কেওয়া বাজারটিও জন্ম দিয়েছে বটগাছটি। প্রবীণদের মতে, প্রাচীন এ বটগাছটি পাঁচ পীরের আস্তানা বা কেওয়া বটগাছ হিসেবে পরিচিত। এ পাঁচ পীরের একজন হযরত গাউছুল আজম দরবেশ আহাদ আলী আকন্দ। বটগাছটির প্রায় ৭০০ গজ উত্তরে দরবেশ আহাদ আলী আকন্দের সমাধি। এক সময় বটগাছটির নিচে কেওয়া গ্রামের অধিবাসীরা বিশেষ করে শীত মৌসুমে জারি-সারি, ভাটিয়ালি ও লোক সঙ্গীতের আয়োজন করতো।
গাজীপুর মহানগরীর বসুধা গ্রামেও রয়েছে ৩০০ বছরের পুরোন আরও একটি বটগাছ। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা গাছটিকে ‘মা শীতলা’ নামেই ডাকেন। তাদের বিশ্বাস, শীতলা দেবীর প্রভাবেই মানুষের হাম, বসন্তসহ চর্মরোগ হয়। তাই এসব রোগের আরোগ্য লাভের জন্য দেবী শীতলাকে পূজা নিবেদন করা প্রাচীন রীতি। প্রচলিত মূর্তিতে শীতলা দেবীর এক হাতে জলের কলস ও অন্য হাতে ঝাড়– দেখতে পাওয়া যায়। ভক্তদের বিশ্বাস, কলস থেকে তিনি আরোগ্য সুধা দান করেন এবং ঝাড়ু দ্বারা রোগাক্রান্তদের কষ্ট লাঘব করেন।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মালেকেরবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্ব দিকে ও জয়দেবপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে বসুধা গ্রাম। গ্রামটি বিখ্যাত হয়েছে ৩০০ বছরের পুরনো এ বটগাছকে ঘিরেই।