রয়েছ নয়নে নয়নে...

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

হুমায়ূন আহমেদ

রয়েছ নয়নে নয়নে...

বাতিঘর ডেস্ক ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২০

print
রয়েছ নয়নে নয়নে...

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাশিল্পী, নাট্যকার ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের গতকাল ছিল অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তার নিজ জেলা নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন ভক্তরা। বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক গণ্য করা হয়। একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার ও গীতিকার। তাকে আরও বলা হয়, আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও সমাদৃত। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ফয়েজুর রহমান, মা আয়েশা ফয়েজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তার লেখালেখির শুরু। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’। বই দুটি প্রকাশের পর শক্তিশালী লেখক হিসেবে পাঠকমহলে সমাদৃত হন। হুমায়ূন আহমেদ দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার লেখায় বাঙালি সমাজ ও জীবনধারার গল্প ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। সৃষ্টি করেছিলেন গল্প বলার এক নিজস্ব ভাষাভঙ্গি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন, নির্মাণ করেছেন নাটক ও চলচ্চিত্র।

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট হিমু ও মিসির আলি চরিত্র দুটি বাংলাদেশের যুবক শ্রেণিকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। তার নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। তবে টেলিভিশন নাটকগুলো ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয়। সংখ্যায় বেশি না হলেও তার রচিত গানগুলো সবিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। অন্যতম উপন্যাস- নন্দিত নরকে, মধ্যাহ্ন, জোছনা ও জননীর গল্প, মাতাল হাওয়া, দেয়াল, কোথাও কেউ নেই ইত্যাদি। নির্মিত চলচ্চিত্র হল- দুই দুয়ারী, শ্রাবণ মেঘের দিন, ঘেটুপুত্র কমলা, আমার আছে জল, চন্দ্রকথা, ইত্যাদি।

হুমায়ূন আহমেদ শিক্ষকতা করেছেন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ছিলেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন।

লেখালিখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বার্থে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদকসহ অনেক পুরস্কার লাভ করেন।

জীবনের শেষভাগে ঢাকা শহরের অভিজাত আবাসিক এলাকা ধানমন্ডির ৩/এ রোডে নির্মিত দখিন হাওয়া ভবনের একটি ফ্লাটে বসবাস করতেন। খুব ভোর বেলা ওঠা অভ্যাস ছিল তার, ভোর থেকে সকাল ১০-১১টা অবধি লিখতেন। মাটিতে বসে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কখনো অবসর পেলে ছবি আঁকতেন।

২০১১-এর সেপ্টেম্বের মাসে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার সময় তার দেহে মলাশয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। তবে টিউমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সমস্যা দেখা দেয়। সহজে তার চিকিৎসা প্রাথমিকভাবে সম্ভব হলেও অল্প সময়ের মাঝেই জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

১২ দফায় তাকে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের পর কিছুটা শারীরিক উন্নতি হলেও, শেষ মুহূর্তে শরীরে অজ্ঞাত ভাইরাস আক্রমণ করে। এতে তার অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। মলাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। কৃত্রিমভাবে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে তিনি নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে তারই প্রতিষ্ঠিত নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়।