আনন্দ-বেদনার অনিঃশেষ কথক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

আনন্দ-বেদনার অনিঃশেষ কথক

সাইফুজ্জামান ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২০

print
আনন্দ-বেদনার অনিঃশেষ কথক

হুমায়ূন আহমেদ ঔপন্যাসিক, গল্পকার, গীতিকার ও চলচ্চিত্রকার। কথাসাহিত্যে সাধারণ, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন ভাষ্য সহজে তুলে ধরার কৃতিত্ব তার। ভারতীয় সাহিত্যের গ্রন্থে সয়লাব যখন বাজার তখন তিনি লেখার মাধ্যমে বাংলাদেশমুখী সাহিত্য নিয়ে আবির্ভূত হন। খুব অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিন শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কিছু গ্রন্থ পাঠ্য তালিকাভুক্ত।

হুমায়ূন আহমেদের পিতা ফয়জুর রহমান ১৯৭১ সালে পিরোজপুর জেলায় এসডিপিও হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পিতার সাহিত্য অনুরাগ ছিল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন। হুমায়ূন আহমেদ পারিবারিক অনুকূল পরিবেশে লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ হন। তার অন্য ভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল অধ্যাপনা ও লেখালেখিতে যুক্ত, আরেক ভাই আহসান হাবীব রম্য লেখক, কার্টুনিস্ট ও উন্মাদ পত্রিকার সম্পাদক। ছোট বেলায় পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল শামসুর রহমান। পরে পিতা নাম পরিবর্তন করে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। ডাক নাম প্রথমে রাখা হয় কাজল, পরে বাচ্চু। সব ছাপিয়ে তিনি হুমায়ূন আহমেদ নামে সমধিক পরিচিত হয়ে ওঠেন। পুলিশ অফিসার পিতার কর্মসূত্রে তিনি বাংলাদেশের অনেক স্থান ঘুরে বেড়িয়েছেন। 

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৩ সালে ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ৬৫০ টাকা মাসিক বেতনে। তার রচিত গল্প সৌরভ সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ছিলেন অসম্ভব মেধাবী ও স্মরণশক্তির অধিকারী।

যেখানেই হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় তার নতুন উপন্যাস ‘অচিনপুর’ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক নওয়াজিশ আলী খান প্রযোজনা করেন হুমায়ূন আহমেদ রচিত নাটক ‘প্রথম প্রহর’।

হুমায়ূন আহমেদ মানুষের সুকুমার বৃত্তি, সততা, মানবতা, প্রেম-বিরহ ও জীবন-যাপনের সূক্ষ্ম বিষয়ে নাট্য রূপায়ণ করেছেন। তার রচিত টিভি নাটক ‘এই সব দিনরাত্রি’ বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। লিউকেমিয়া আক্রান্ত টুনিকে বাঁচিয়ে রাখার আর্তি নিয়ে দর্শক-শ্রোতা সোচ্চার হয়ে ওঠে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ বাস্তবতা ভেবে ও চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা কাহিনী পরিবর্তন করেননি। আশির দশকে প্রচারিত বহুব্রীহি নাটকে হিতোপদেশ সংযোজন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার কাজটি তিনি সচেতনভাবে করেছেন। ‘তুই রাজাকার’ সংলাপটি তিনি নাটকে জুড়ে দেন। ‘অয়োময়’ নাটকের বাকের ভাই নেগেটিভ চরিত্র দর্শক হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বাকের ভাইকে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করেন। আবার প্রতিবাদমুখর হয় দর্শক-শ্রোতারা। আবেগাক্রান্ত দর্শক তার এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় হামলা করে। হুমায়ূন আহমেদ রমনা থানায় একটি জিডি পর্যন্ত করেন। খেলা, অচিন বৃক্ষ, খাদক, এ কী কাণ্ড, একদিন হঠাৎ, অন্য ভুবনসহ অসংখ্য নাটকে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন বারবার। মিসির আলী নামের অদ্ভুত চরিত্র ‘দেবী’ উপন্যাসে ১৯৮৫ সালে সংযুক্ত হয়। উপন্যাসটি চলচ্চিত্রায়ণ ঘটে ২০১৮ সালে। হলুদ পাঞ্জাবি পরা হিমু চরিত্র সবাইকে আকর্ষণ করে। হিমু ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। সব মায়া ত্যাগ করে পথে পথে ঘোরে। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত ময়ূরাক্ষী উপন্যাসে হিমুর আত্মপ্রকাশ ঘটে।

মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৯২-এ পরিচালনা করেন হুমায়ূন আহমেদ রচিত উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্র। চিত্রনাট্য রচনার জন্য হুমায়ূন আহমেদকে দেওয়া হয় দশ হাজার টাকা লেখক সম্মানী। চলচ্চিত্রটি চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। শ্রেষ্ঠ কাহিনীকারের পুরস্কারে ভূষিত করা হয় হুমায়ূন আহমেদকে। ১৯৯৪ সালে হুমায়ূন আহমদ পরিচালনা করেন ‘আগুনের পরশমনি’ চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য পঁচিশ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের বহুমাত্রিকতা এই চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত হয়। চলচ্চিত্রটি আটটি বিভাগে পুরস্কার পায়। তিনি পান শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার ও সংলাপ রচয়িতার জন্য পুরস্কার। তিনি লেখালেখি ও চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত কবি উপন্যাসে তিন জন কবির জীবনাচরণ সন্নিবেশ করা কাহিনী দুর্দান্ত আবেগ ও কাহিনী সমান্তরালে স্থান করে। কালো জাদুকর ১৯৯৫ সালে ছোট কাগজ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৯ সালে শ্রাবণ মেঘের দিন তার কাহিনীতে চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়। হুমায়ূন আহমেদ এই সময় গান রচনায় মনোযোগী হন। তার রচিত ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ এবং ‘আমার ভাঙা ঘরে’ অসম্ভব জনপ্রিয়তা পায়।

বৃষ্টিবিলাস (২০০১) উপন্যাসে উঠে এসেছে মধ্যবিত্তের জীবন ও সমাজ রূপান্তর। দুই দুয়ারী চলচ্চিত্রে জাদু বাস্তবতার সন্নিবেশ ঘটে। চন্দ্রকথা (২০০৩) চলচ্চিত্রে তুলে আনেন জমিদারদের বিলাসবহুল জীবন, নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতার চিত্র। শ্যামল ছায়া (২০০৪) চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিবৃত হয়। বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রে ২০০৬ সালে একাডেমি পুরস্কার পায়। জোছনা ও জননীর গল্প (২০০৪) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে হুমায়ূন আহমেদ পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন। দূরত্ব, নন্দিত নরকে, নিরন্তর, অন্য চলচ্চিত্র পরিচালকরা পরিচালনা করেন। ইতিহাসনির্ভর ‘মধ্যাহ্ন’ (২০০৭-২০০৮) প্রথম ও দ্বিতীয় খ- প্রকাশিত হয়। হাস্য রসাত্মক কাহিনী তিনি অনেক উপন্যাস রচনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে নয় নম্বর বিপদ সংকেত (২০০৭)। প্রেম তার উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের প্রধান উপাদান। ‘আমার আছে জল’ চলচ্চিত্রে ত্রিভূজ প্রেমের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। ২০১২ সালে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকা- নিয়ে রচিত ‘দেয়াল’ উপন্যাস প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। হুমায়ূন আহমেদ লেখালেখিতে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেছিলেন। অবসরে তিনি ছবি আঁকতেন। তার অন্তরজুড়ে ছিল মানুষের জন্য ভালোবাসা।

হুমায়ূন আহমেদ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন এর মধ্যে রয়েছেÑ লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮১), মাইকেল মধুসূদন পদক (১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক প্রভৃতি। তিনি ১৯৯৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। ২০১১ সালে হুমায়ূন আহমেদ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১২টি ক্যামো দিয়ে তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করা হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয় শেষপর্যন্ত। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই বেলেভ্যু হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

হুমায়ূন আহমেদ চলে যাওয়ার পর শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য পাঠকের কাছে পৌঁছে যেত। এর প্রধান কারণ তিনি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতেন বাস্তবতা। যাদু বাস্তবতা সাহিত্যের সহজ রূপায়ণ তার সাহিত্যে ঘটেছে। পরিমিতবোধ ও সংলাপ দিয়ে তিনি কাহিনী বিস্তৃত করতেন। কল্পনা ও বাস্তবতা পাশাপাশি হাঁটত অন্তরঙ্গভাবে। একটি নেগেটিভ চরিত্র তার কলমের স্পর্শে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করত। শুভ বোধ, সুন্দর ও প্রেরণা তার সাহিত্যের প্রাণ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, দিন যাপন তিনি তার রচিত সাহিত্যে সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন। তার স্থান অধিকার করার মতো কেউ আজও সৃষ্টি হয়নি। হুমায়ূন আহমেদ অনন্য।