চাঁদনী পসর রাইতে দখিনা হাওয়ায় বৃষ্টিবিলাস

ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

চাঁদনী পসর রাইতে দখিনা হাওয়ায় বৃষ্টিবিলাস

ইমরুল কায়েস ১১:৩৬ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২০, ২০২০

print
চাঁদনী পসর রাইতে দখিনা হাওয়ায় বৃষ্টিবিলাস

গল্প দিয়ে কথা ও গল্পের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ না করলে একটা কিছু অপূর্ণই থেকে যায়! হাতটা যেন কেমন নিশপিশ করছে। ২০১৫ সালের ৩৫তম বিসিএসের বাংলা লিখিত পরীক্ষায় একটি প্রশ্ন ছিল এমন- বাংলাদেশে কেন সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ কম হয়? কয়েকটি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রের লোকজ সংস্কৃতির ব্যাখ্যা দিন? প্রশ্নটির উত্তর লিখেছিলাম নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ দিয়ে। এর চেয়ে ভালো লোকজ উপাদান নিয়ে তৈরি আর কোনো সিনেমা আমার জানা মতে আর একটিও তৈরি হয়নি। নদী, নারী, জল, আর যৌবন যে কতটা নিবিড় উপাদান লোকজ সংস্কৃতির! বিশেষ করে লোকগীতিতে আছে তার শেষ নেই। অনুপম সব চলচ্চিত্রের স্রষ্টা, জীবন সায়াহ্নে দূর পরবাসে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও যিনি আমাদের জন্য কথার মালা গেঁথেছেন; সেই মানুষটি আজ এই দিনে আমাদের ছেড়ে প্রয়াত। তার জন্য পুরো জগতের একমাত্র আধিকারিকের কাছে প্রার্থনা ছাড়া আমাদের মতো পাঠকের আর কী বা দেওয়ার আছে? রসায়নের মতো কাঠখোট্টা শাস্ত্রের ছাত্র ও অধ্যাপকের মাথায় এত সব বিলাসী চিন্তা কেমনে এসেছে তার সুলুকসন্ধান করে এখনো হুমায়ূন মুলুকের তলা পাইনি। আহমদ শরীফ নন্দিত নরকের ভূমিকায় যেমনটি বলেছিলেন- ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের ভালো ছাত্র। কিন্তু ও যে (হুমায়ূন আহমেদ) এত ভালো গল্প লিখিয়ে তা বোঝা গেল এ রচনা পাঠের পর।’

পাকিস্তানের বিখ্যাত ডন পত্রিকা যাকে বলেছে- ‘বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কিংবদন্তি’ তিনি আর কেউ নন। আমাদেরই হুমায়ূন আহমেদ। তিনি স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের পপুলার সংস্কৃতির বা লোকরঞ্জক- একজন প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। স্বাধীনতার পূর্বে ও দেশভাগের আগে এবং পরে বাংলা কথাসাহিত্য একচেটিয়া আধিপত্য ছিল পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিকদের। একমাত্র হুমায়ূন আহমেদ এই ধারাটিকে ভেঙে এপার বাংলার সাহিত্যের একটি আলাদা জগত ও পাঠক তৈরি করে গেছেন। তাইতো ওপার বাংলার জনপ্রিয় সাহিত্য ব্যক্তি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন- ‘আহমেদ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চেয়ে জনপ্রিয়’। 

পশ্চিম ও পূর্ববাংলায় মানিক বাবু, সুনীল ও সমরেশ মজুমদারের বইয়ের ছিল ছড়াছড়ি। সাহিত্যের কোনো মালিকানা না থাকলেও কেন জানি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমাদেরও একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিকের খুব দরকার ছিল। ঠিক যুদ্ধোত্তর বিরহি, ক্ষুধিত ও এতিম পাঠকের জন্য একজন কথাসাহিত্যিকের আবির্ভাব হয় প্রথম নন্দিত নরকে নামক নাতি দীর্ঘ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। তিনিই হুমায়ূন আহমেদ। এজন্যই বলেছি যে আমাদেরই হুমায়ূন আহমেদ।

ছাত্র অবস্থায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের হলে থাকতে এমন একটি অনিন্দ্য কথা সাহিত্য রচনা করেছেন। তার এই প্রথম উপন্যাসটির প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন আর একজন প্রবাদ পুরুষ- আহমদ ছফা, বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন তারই আপন অনুজ আর একজন জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল আর বইটির ভূমিকা লিখেছেন- আহমদ শরীফ। জীবনে আর কী লাগে? প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনের তিনজন আজন্ম গুণীর ছোঁয়া কয়জনই বা পায়!।

পৃথিবীর একটিমাত্র দেশ যার পতাকার বুকের মাঝে লাল সূর্য আছে ঠিক তেমনি এদেশের সাহিত্যের সবুজ জমিনে একমাত্র এবং প্রথমে অদ্বিতীয়- উজ্জ্বল ও স্বলেখনীর জোরে জ্বল জ্বল করছেন নিরত। বাংলাদেশের আনাচেকানাচে সব রকমের পাঠকের কাছে এতটা পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা একমাত্র হুমায়ূন সাহিত্যের কপালে জুটেছে।
নরক শব্দটি একটি বীভৎস শব্দ! তার আগে একটি সুন্দর শব্দ নন্দিত যে বসতে পারে খুব সহজে আর এটিকে বসানোর শৈলী যার আয়ত্তে ছিল সেই কথার জাদুকর আমাদের ছেড়ে প্রয়াত হয়েছেন ১৯ জুলাই ২০১২ সালে- শারীরিকভাবে কিন্তু বেঁচে আছেন শাশ^ত কথামালায় প্রতিদিনের শতদল হয়ে অগুনতি পাঠকের হৃদ সিংহাসনে।

বৃষ্টিবিলাস, জোছনা বিলাস এমনকি সমুদ্র বিলাসের জন্য সেন্টমার্টিনে তার নিজস্ব রিসোর্ট-সমুদ্র বিলাস আরও আছে জোছনা বিলাস। চাঁদনী পসরে কে আমায় স্মরণ করে; কে আইসা দাঁড়াইছে গো আমার দুয়ারে? এমন গানের কথা আর দ্বিতীয়টা কোনো চলচ্চিত্রে নেই। তার দক্ষিনা হাওয়ার বাড়িতে এখনো কি জোছনার আলোয় বৃষ্টি বিলাস চলে? চলে তো অবশ্যই। শুধু আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই না এই আর কি। এ কথার উত্তর তার গানেই আছে- আমার ভাঙা ঘরে ভাঙা চালা ভাঙা বেড়ার ফাঁকে/অবাক জোছনা ঢুইকা পরে; হাত বাড়াইয়া ডাকে।

‘বিলাস’ শব্দটা হুমায়ূন আহমেদের খুব আপন ও একান্ত আপনার। কেননা তার ভাষার বিলাসে যে এত চমৎকার সব সাহিত্যকর্ম রচনা হয়েছে। স্বপ্ন, কল্পনা আর শব্দ নিয়ে বিলাসী না হলে আদৌ কেউ সাহিত্যের চৌকাঠ মাড়াতে পারবে না এটা শতভাগ নিশ্চিত। এদিকটায় হুমায়ূন আহমেদ ষোলো কলায় পরিপূর্ণ। কেননা সৃজনশীল, মননশীল আর পারফরম্যান্স আর্ট-এ তিনি পরিযায়ী না হয়ে পরিশীলিত আধার হয়ে আছেন। চলচ্চিত্র, নাটক আর গল্প-উপন্যাসে জনতুষ্টি বা সর্বজনীন উদাহরণ তার সৃষ্টি কর্মগলো।

নরককেও নন্দিত করার এই কারিগর গান রচনা করেও তুমুল জনপ্রিয়। তার পরিচালিত শ্রাবণ মেঘের দিন চলচ্চিত্রটি সাতটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। এই চলচ্চিত্রের সর্বাধিক শ্রোতা প্রিয় গানÑ একটা ছিলো সোনার কন্যা মেঘ বরণ কেশ/ ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ। লোকজ সংস্কৃতির আশ্রয় নিয়ে এমন গীত রচনা বিস্তৃত বাংলার মাটির সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে।

ছোট, সহজ ও খণ্ড খণ্ড বাক্যে ছোট তিন-চার ফর্মার উপন্যাস লিখে পেছনের সব ভারি ভারি রচনাকে টপকে বিশের দশকে একক স্থান করে নেওয়া এই কথার মালি যেন সত্যি তার গীতের মতো জীবনে এক আচানক কলম খুঁজে পেয়েছিল।