সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেত্রকোনা

ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেত্রকোনা

রুপসী বাংলা ডেস্ক ৩:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

print
সৌন্দর্যের লীলাভূমি নেত্রকোনা

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তীর্থভূমি নেত্রকোনা। গারো পাহাড়ের পাদদেশের নৈসর্গিক এক জনপদের নাম নেত্রকোনা। একে মহুয়া মলুয়ার দেশও বলা হয়। হাওর-বাওর, খাল-বিল, নদী-নালা, ঘাস, ফুল, ননানী ও উর্বর কৃষি নেত্রকোনা জেলার বৈশিষ্ট্য। ছোট্ট একটি জেলা নেত্রকোনা যার পরতে পরতে জড়ানো সৌন্দর্য। এখানে দেখার মতো আছে গারো পাহাড়, সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি, টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ, সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী, হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, সাদা মাটির পাহাড় পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ জেলাকে নিয়ে আজকের প্রতিবেদন

কমলা রাণী দীঘি

দুর্গাপুর উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের কাছে ঐতিহ্যবাহী কমলা রাণী দীঘি (কড়সড়ষধ জধহরৎ উরমযর) অবস্থিত। অনেকের কাছে এটি সাগর দীঘি নামেও সুপরিচিত। প্রচলিত আছে, পনের শতকের শেষ ভাগে সুসং দুর্গাপুরের রাজা জানকি নাথ কমলা দেবী নামে এক সুন্দরী রমনীকে বিয়ে করেন। প্রজা হিতৈষী রাজা জানকি নাথের ঘরে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। সন্তানের নাম রাখা হয় রঘুনাথ। প্রজাদের পানির অভাব দূরীকরণের জন্য রাজা জানকি নাথ একটি পুকুর খনন করেন। তবে পুকুরে পানি না ওঠায় রাজা চিন্তায় পড়ে গেলেন। এরপর এক রাতে রাজা স্বপ্নে দেখতে পান রাণী কমলা দেবী যদি মাঝ পুকুরে গিয়ে পূজো দেন তাহলেই পুকুর পানিতে ভরে উঠবে। রাণীও প্রজাদের কথা ভেবে পুকুরের মাঝখানে পূজা দিতে সম্মত হলেন। হঠাৎ চারিদিক দিয়ে পানি উঠতে উঠতে রাণী কমলা দেবীকে ডুবিয়ে দিল। অনেকের মতে, বজ্রপাতের কারণে দীঘির তলার মাটি ফেটে পানিতে ভরে যায়। রাজা জানকি নাথ এমন ঘটনায় বিচলিত হয়ে গেলেন। সর্বদা রাজার সন্তান রঘুর জন্য দুশ্চিন্তা করতেন। আবারো এক রাত্রে রাজা স্বপ্নে দেখলেন তিনি যদি শিশু সন্তান রঘুকে পুকুরের পাড়ে রেখে আসেন তবে রাণী কমলা দেবী রঘুনাথকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। কিন্তু শর্ত হল যে, রাজা কোনক্রমে রাণীকে ছুঁতে পারবেন না। রাজা জানকি নাথ রাতে তার সন্তানকে পুকুরের পাড়ে রেখে আসতেন।

রোয়াইলবাড়ী দুর্গ

রোয়াইলবাড়ী দুর্গ বাংলার প্রাচীন শাসনকর্তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যমন্ডিত এক ঐতিহাসিক স্থান। একসময় কত ঘটনাই না ঘটেছে এ দুর্গে। বাংলার সুলতান হুসেন শাহ, নছরত শাহ এবং ঈশা খাঁ’র অশ্বারোহী বাহিনীর ঠকঠক শব্দে কিভাবেই না কেঁপেছে এই রোয়াইলবাড়ীর মাটি; সে ইতিহাস আজ পুরোপুরি জানা না গেলেও তাঁদের অহংকার ও শৌর্য-বীর্যের সাক্ষী হয়ে আজও ঠাঁয় দাড়িয়েছে আছে প্রাচীন দুর্গটি। জানা গেছে ‘রোয়াইল’ একটি আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ ‘ক্ষুদ্র অশ্বারোহী বাহিনী’। সুতরাং ‘রোয়াইলবাড়ী’ এর অর্থ দাঁড়ায় ‘অশ্বারোহী বাহিনীর বাড়ী’। কালক্রমে রোয়াইলবাড়ী এখন একটি পুরোগ্রাম এবং সমগ্র ইউনিয়নের নাম। নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। রোয়াইলবাড়ী দুর্গের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বেতাই নদী। ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত আরেক ঐতিহাসিক স্থান কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জঙ্গলবাড়ী দুর্গও রোয়াইলবাড়ী থেকে খুব বেশি দূরে নয়।
ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্ ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কামরূপের রাজা নিলাম্বরের বিরুদ্ধে এক প্রচ- যুদ্ধ পরিচালনা করে কামরূপ রাজ্য দখল করেন। এরপর কিছুদিন তাঁর পুত্র নছরত শাহ্ কামরূপে শাসন করেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে তিনি বিতাড়িত হন এবং এক পর্যায়ে কামরূপ থেকে পালিয়ে আসতে হয়।
থিত আছে, নছরত শাহ্ কামরূপ থেকে পালিয়ে পূর্ব ময়মনসিংহের (বর্তমান নেত্রকোনার) রোয়াইলবাড়ীতে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি এর নামকরণ করেন ‘নছরত ও জিয়াল’ (কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে- ‘নছরত আজিয়াল’)। পরবর্তীতে তাঁর শাসন অন্তর্গত সমগ্র প্রদেশটিই (বৃহত্তর ময়মনসিংহ) ‘নছরতশাহী পরগনা’ নামে পরিচিত হয় এবং আকবর শাহ সময় পর্যন্তও পরগনাটি এ নামেই পরিচিত ছিল। এরপর বাঙালির গৌরব, মসনদে আলী ঈশা খাঁ এ অঞ্চলে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ী ও নেত্রকোনার রোয়াইলবাড়ী দুর্গের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নেন। জানা গেছে রোয়াইলবাড়ী থেকে জঙ্গলবাড়ী পর্যন্ত যাতায়াতের একটি রাস্তাও ছিল, যা ধ্বংস হতে হতে কিছুদিন আগে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এদিকে ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পরিষদ দেওয়ান জালাল এখানকার আধিপত্য গ্রহণ করেন।

সাত শহীদের মাজার

নেত্রকোনা জেলার কমলাকান্দা উপজেলার লেঙ্গুরা ইউনিয়নের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ফুলবাড়ি শান্ত একগ্রাম। গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে গারো পাহাড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে আসা গনেশ্বরী নদী। আমাদের সীমান্তের ভেতরেই রয়েছে বেশ কিছু পাহাড় ও টিলা, আর সীমান্তের বাইরে যতদূর চোখ যায় দেখা যায় মেঘালয়ের পাহাড় রাজ্য। চারপাশে অগণিত মেহগনি গাছের সারির নির্জন সেই জায়গায় সমাহিত আছেন ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। এই জায়গা সাত শহীদের মাজার নামে পরিচিত।
ইতিহাস : ২৬ জুলাই, নেত্রকোনা জেলার বিরিশিরি থেকে কলমাকান্দায় পাকসেনাদের ক্যাম্পে রসদ যাবে এ সংবাদে পরিকল্পনা হয় দুর্গাপুর-কলমাকান্দা নদীপথের নাজিরপুর বাজারের কাছেই পাক-হানাদারদের আক্রমণ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নাজিরপুর বাজারের সবকটি প্রবেশপথে এ্যাম্বুস করেন মুক্তিযোদ্ধারা। যে সময় আসার কথা ছিল তা অতিক্রান্ত হওয়ার অনেক পর মুক্তিযোদ্ধারা একে একে তাদের এ্যাম্বুস তুলে নেওয়ার সময় হঠাৎ হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে যায় তারা। গুলি, পাল্টা-গুলি উভয়পক্ষের তুমুল যুদ্ধ লেগে যায়।


বিরিশিরি

বিরিশিরি (ইরৎরংযরৎর) নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। বিরিশিরির বিজয়পুরে আকর্ষণীয় চীনামাটির পাহাড় ও নীল পানির হ্রদ রয়েছে। বিজয়পুরের এই চীনামাটির পাহাড় এবং সমভূমি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৬ কিলোমিটার ও প্রস্থে ৬০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। হ্রদের নীল জল নিমিষেই সমস্ত ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করে দেয়। হ্রদের অপরুপ নীল জলের প্রধান উৎস হচ্ছে সমেশ্বরী নদী। এই নদী বর্তমানে কয়লা খনি হিসেবে অধিক পরিচিত। নীল জলের হ্রদের মতোই সোমেশ্বরী নদী আপন রুপে অনন্যা।

নামকরণ

এক সময়কার মৈমনসিংহ পরগনার অর্ন্তগত বর্তমান নেত্রকোনা সদর উপজেলা। নেত্রকোনা থানা সদরটি মৈমনসিংহ পরগনার পূর্ব-উত্তর কোণে অবস্থিত। মৈমনসিংহ পরগনার জমিদারি পত্তনের পর (১৭১৮ খ্রিঃ) সর্বপ্রথম বর্তমান উপজেলা সদরের কালীবাড়ি নামক স্থানে মৈমনসিংহ পরগনার জমিদার কালী মন্দির স্থাপন ও কালীদেবীর পূজা শুরু করান। সে কারণেই সমগ্র অঞ্চলটি কালীগঞ্জ নামে পরিচিতি পায়। পরে নেত্রকোনা নামে পরিচিতি লাভ করে। (নেত্রকোনা জেলা অধ্যায় আলোচনা করা হয়েছে)।
এক সময়কার মৈমনসিংহ, নাসিরূজ্জিয়াল, সিংধামৈন ও সুসঙ্গ পরগনাভুক্ত ছিল বর্তমান নেত্রকোনা জেলা ভূমি। নেত্রকোনা নামকরণ হয়েছে নাটেরকোনা নামক গ্রামের নাম থেকে। নেত্রকোনা জেলা সদরের উত্তরে আজও সে নাটেরকোনা গ্রামটি স্বনামেই পরিচিত। ইংরেজ শাসকরা পাগলপন্থী বিদ্রোহীদের দমনকল্পে সর্বপ্রথম নাটোরকোনা গ্রামের আস্তানা স্থাপন করেছিল। পরবর্তী সময় নৌ-যোগাযোগের সুবিধার্থে বর্তমান নেত্রকোনা এলাকায় ইংরেজরা তাদের আস্তানা স্থানান্তর করে। সে সময় বর্তমান নেত্রকোনা সদরটি ছিল অখ্যাত স্থান।


সোমেশ্বরী নদী, দুর্গাপুর

সোমেশ্বরী নদী (ঝড়সবংযধিৎর জরাবৎ) ও তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতে হবে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলায়। ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের সীমসাংগ্রী নামক স্থান থেকে উৎপন্ন হয়ে সোমেশ্বরী নদীটি দুর্গাপুরে প্রবেশ করেছে। লোকমুখে প্রচলিত অনেককাল আগে সোমেশ্বর পাঠক নামে এক ব্যক্তির দ্বারা এ অঞ্চল দখল হয়ে যায়, পরবর্তীতে তার নামানুসারেই নদীটি সোমেশ্বরী নদী হিসাবে পরিচিতি পায়। বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময় সোমেশ্বরী নদী একেক রকম সৌন্দর্য মেলে ধরে। শীতকালে পানি কমে গেলেও সাদা স্বচ্ছ জলের সোমেশ্বরী নদী বর্ষায় যেন যৌবন ফিরে পায়। বর্তমানে কয়লা খনি হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও সোমেশ্বরী নদী সৌন্দর্যে একটুও ভাটা পরেনি।

রাণীমাতা রাশমণি স্মৃতিসৌধ

উপজেলা পরিষদ হতে ছয় কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামে চৌরাস্তার মোড়ে রাশমণি স্মৃতিসৌধ অবস্থিত। রাশমনি হাজং ছিলেন টংক ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী।
রাশমণি হাজং ছিলেন টংক ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। তিনি ১৮৯৮ সালে ধোবাউড়া উপজেলায় বেদীকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি কুমদিনী হাজংকে বাঁচাতে গিয়ে মুখোমুখি সংগ্রামে ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে বহেড়াতলী গ্রামে তাঁর সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজংসহ শহীদ হন। রাশমণি ও সুরেন্দ্র হাজং টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদ। রাশমণির দায়ের আঘাতে দুজন ব্রিটিশ পুলিশ নিহত হয়। এই বীর যোদ্ধার স্মরণে হাজংলতা রাশমণি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছেন। প্রতিবছর ৩১ জানুয়ারি রাশমণি দিবস ও টংক শহীদ দিবস পালন করা হয়।

ডিঙ্গাপোতা হাওর

নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত ডিঙ্গাপোতা হাওর (উরহমধঢ়ড়ঃধ ঐধড়ৎ) দেশের বৃহত্তম হাওরগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন নবরূপে এই হাওরের সৌন্দর্য ফুটে উঠে। বর্ষাকালে হাওরের অথৈ জলের ধারা, শুষ্ক মৌসুমে চারপাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য সবকিছুই প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের মোহিত করে। তবে সকল মৌসুমেই হাওরের বিশাল জলরাশির গভীরতম স্থানে থাকা আধডোবা হিজল গাছ, জলরাশির উচ্ছল ঢেউ ও নীল আকাশের মিতালি চোখে পরে। বিশেষ করে শরৎ ও হেমন্তকালে হাওরের দু’পাড়ের সবুজ সোনালি ধানক্ষেত ও নীলচে আকাশের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। এছাড়া মাছের মৌসুমে হাওরের পাড়ে জেলেদের পরিবার নিয়ে অস্থায়ী আবাসস্থলগুলো কাছ থেকে হাওরের জেলেদের জীবনযাপন দেখার সুযোগ করে দেয়। এখান থেকে ইচ্ছে হলে হাওরের বিভিন্ন তাজা মাছ কিনে নেওয়া যায়। প্রকৃতির দানে অপরূপ ডিঙ্গাপোতা হাওর নেত্রকোনা জেলার পর্যটন শিল্পে এক বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে।