ঐতিহ্যের নিদর্শন পিরোজপুর

ঢাকা, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২০ | ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ঐতিহ্যের নিদর্শন পিরোজপুর

রুপসী বাংলা ডেস্ক ৭:১১ অপরাহ্ণ, মে ০৬, ২০২০

print
ঐতিহ্যের নিদর্শন পিরোজপুর

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তীর্থভূমি কুষ্টিয়া। বৈচিত্র্যে ভরপুর পিরোজপুর জেলা সুন্দরবনের কোলঘেঁষা বলেশ্বর, কালীগঙ্গা, দামোদর, সন্ধ্যা বিধৌত প্রাকৃতিক সবুজের এক অনন্য সুন্দর জেলা। পিরোজপুর জেলার দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক ভ্রমণ স্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- স্বরূপকাঠীর পেয়ারা বাগান, কুড়িয়ানা পেয়ারা বাজার, আটঘর আমড়া বাগান, ডিসি পার্ক, রায়েরকাঠী জমিদার বাড়ি, কবি আহসান হাবিব এর বাড়ী, আজিম ফরাজীর মাজার, সারেংকাঠী পিকনিক স্পট, পারেড় হাট জমিদার বাড়ি, ভা-ারিয়া শিশু পার্ক পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ জেলা নিয়ে আজকের প্রতিবেদন

রায়েরকাঠী জমিদার বাড়ি
রায়েরকাঠী জমিদার বাড়ি (Rayerkathi Jomidar Bari) পিরোজপুর জেলার অন্যতম একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। জেলা সদর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত রায়েরকাঠী জমিদার বাড়িটি প্রায় তিনশত পঞ্চাশ বছরের পুরনো। এখানে স্থান পেয়েছে রাজভবন, অতিথিশালা, নহবৎখানা, নাট্যশালা এবং মন্দির। এই জমিদার বাড়িতে ছোট বড় প্রায় দুইশত অট্টালিকা ছিল। যার মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টি বিশালাকৃতির অট্টালিকা শুধুমাত্র রাজবাড়ির শোভাবর্ধনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ১৬৫৮ সালে রায়েরকাঠী জমিদার বাড়িতে কালিমন্দির নির্মাণ করা হয়, যেখানে প্রায় ২৫ মণ ওজনের একটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়েছে। এই শিবলিঙ্গকে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ শিবলিঙ্গ মনে করা হয়। বর্তমানে রায়েরকাঠী জমিদার বাড়িতে ৭ ভবন প্রাচীন ভবন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


ইতিহাস
সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে যুবরাজ সেলিম বিদ্রোহ ঘোষণা করে বাংলায় এসে ঝালকাঠি, বাগেরহাট ও পিরোজপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে একটি পরগনা সৃষ্টি করে পরগনার নাম রাখেন সেলিমাবাদ। ১৬১৮ সালে মদন মোহন সেলিমাবাদ পরগনার রাজস্ব আদায়ের জন্য নিযুক্ত হন। ১৬২৮ সালে মদন মোহন সেলিমাবাদ পরগনার কিছু জমি তার ছেলে শ্রীনাথের নামে কিনে নেন। পরবর্তীতে মোগল সম্রাট শ্রীনাথ রায়কে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৬৫৮ সালে রাজা শ্রীনাথ রায়ের ছেলে রুদ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী বর্তমান পিরোজপুরের কাছে বন জঙ্গল পরিষ্কার করে রাজবাড়ি এবং মন্দির নির্মাণ করেন। বন জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে অঞ্চলটি রায়েরকাঠী নামে পরিচিতি পায়।


পেয়ারা বাগান ও ভাসমান বাজার
ঝালকাঠি, বরিশাল আর পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকার ২৬ গ্রামের প্রায় ৩১ হাজার একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে পেয়ারা বাগান (Guava Garden)। আর এ পেয়ারা চাষের সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার পরিবার সরাসরি জড়িত। তাদের এ পেয়ারা বিক্রির জন্য বিখ্যাত ভীমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার (Vimruli Floating Market) ।
ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলি গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি।
হাটটি সারা বছর বসলেও প্রাণ ফিরে পায় পেয়ারা মৌসুমে এ হাটকে তুলনা করা যায় থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেটের সঙ্গে।
ভিমরুলির আশপাশের সব গ্রামেই অসংখ্য পেয়ারা বাগান। এসব গ্রামে দৃষ্টিপথে ধরা দেবে সবুজের সমারোহ। এসব সবুজের বেশিরভাগ হোগলা, সুপারি, আমড়া আর পেয়ারার বন। এসব বাগান থেকে চাষিরা নৌকায় করে সরাসরি এই বাজারে নিয়ে আসেন।
ভিমরুলি হাট খালের একটি মোহনায় বসে। তিন দিক থেকে তিনটি খাল এসে মিশেছে এখানে। অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত এ মোহনায় মূলত বসে ভাসমান হাট (Vasoman Peyara Bazar)। ভাসমান হাটের উত্তর প্রান্তে খালের ওপরে ছোট একটি সেতু আছে।
সেখান থেকে হাটটি খুব ভালো করে দেখা যায়। পুরো খাল জুড়ে যেদিকে তাকাবেন শুধু নৌকা আর নৌকা। আকর্ষণীয় দিক হল এখানে আসা সব নৌকাগুলোর আকার আর ডিজাইন প্রায় একইরকম। মনে হয় যেন একই কারিগরের তৈরি সব নৌকা। ভিমরুলি বাজারের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হল দুপর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা। এ সময়ে নৌকার সংখ্যা কয়েকশ’ ছাড়িয়ে যায়।


ডিসি পার্ক
পিরোজপুর জেলা সদরে অবস্থিত ডিসি পার্ক (DC Park) পিরোজপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। নামাজপুর গ্রামে বলেশ্বর নদীর তীরে গড়ে উঠা এই পার্কের ওয়াচ টাওয়ার থেকে অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়। ডিসি পার্ক স্থানীয় মানুষের কাছে পিরোজপুর রিভার ভিউ ইকো পার্ক (Pirojpur River View Echo Park) নামেও পরিচিত। পিরোজপুর জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক জনাব মোঃ মনছুর রাজা চৌধুরী স্থানীয় মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য ২০০৭ সালে একটি পার্ক স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখন থেকেই পার্কের জন্য নির্ধারিত জায়গাটি ডিসি পার্ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ডিসি পার্ক বা পিরোজপুর রিভার ভিউ ইকো পার্কটির অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নদীর পাড় ঘেঁষে নির্মিত রাস্তা এবং পাঁচতলা উচ্চতার ওয়াচ টাওয়ার। এই ওয়াচ টাওয়ার থেকে আশেপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করা যায়। ডিসি পার্কটিতে আরো আছে কফি হাউজ, ফোয়ারা, সুদৃশ্য লেক এবং দুইটি কাঠের সেতু। আর লেকের পানিতে ভেসে বেড়াতে আছে পেডেল বোটের ব্যবস্থা। দর্শনার্থীদের আকর্ষণ এবং পার্কের শোভাবৃদ্ধির জন্য ডিসি পার্কে তৈরি করা হয়েছে ফুলের বাগান, দোলনা, বসার বেঞ্চ এবং গোল ছাতা। এছাড়া পার্কের দুইটি কটেজ রয়েছে। এই কটেজের প্রতিটিতে রয়েছে ২ টি করে বেডরুম, ১ টি ড্রয়িং রুম এবং ১ টি রান্না ঘর।


হরিণপালা রিভার ভিউ ইকোপার্ক
পিরোজপুর (Pirojpur) জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নে কঁচা নদীর তীরে ২০১৪ সালে ৬ একর জায়গার ওপর হরিণপালা রিভার ভিউ ইকোপার্ক (Horinpala River View Eco Park) গড়ে তোলা হয়েছে। নদীর ঢেউ, কাশবন, পাখির কলকাকলিতে মুখর চমৎকার এই পার্কে রয়েছে নান্দনিক ফোয়ারা, ওয়াচ টাওয়ার, পশুপাখির ভাস্কর্য, ঘোড়ার গাড়ি, টয় ট্রেন এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় রাইড। আরও আছে সুবিশাল পুকুরে নৌকায় চড়ে বেড়ানোর সুযোগ। হরিণপালা রিভার ভিউ ইকোপার্কের পাশে ৭৪ একর জায়গা জুড়ে হরিণ ও পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হয়েছে, যা ইকোপার্কের সৌন্দর্য আরো বহুগুণ বাড়িয়ে তোলেছে। পার্কের রেস্টুরেন্টে আছে বাংলা চাইনিজসহ বাহারি খাবারের আয়োজন। আর দর্শনার্থীরা চাইলে পার্কটিতে রাত্রিযাপন করতে পারেন।


মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদ
পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়ার উত্তরে বুড়িরচর গ্রামের আকন বাড়িতে কাঠের কারুকার্যমণ্ডিত মমিন মসজিদ (Bhandaria Shishu Park) অন্যতম এক স্থাপত্য নিদর্শন।
বিশ্বের দৃষ্টিনন্দন মসজিদগুলোর মধ্যে শতবর্ষের প্রাচীন মঠবাড়িয়ার মমিন মসজিদের অবস্থান ২৩ তম এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র কাঠের তৈরি মুসলিম স্থাপত্যশিল্প। ১৯১৩ সালে মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন তৎকালীন বরিশাল জেলার স্বরূপকাঠি থেকে নিয়ে আসা ২১ জন কারিগরের সাহায্যে নিজ বাড়িতে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। লোহাকাঠ ও বার্মা সেগুন কাঠের ওপর প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে মমিন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের কাঠের দেয়ালে অপূর্ব নান্দনিকতায় ইসলামিক সংস্কৃতি, ক্যালিগ্রাফি, বিভিন্ন ফুল, পাতা ও ফলের আকর্ষণীয় নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ৭ বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর ১৯২০ সালে ইন্দো-পারসিক আর ইউরোপীয় স্থাপত্যের মিশ্রণে তৈরি মমিন মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ হয়।
টিন শেড চৌচালা বিশিষ্ট মমিন মসজিদের দৈর্ঘ্য ২৪ ফুট ও প্রস্থ ১৮ ফুট। মসজিদের চারপাশের বেড়া ৩টি অংশে বিভক্ত। মসজিদের উত্তর-দক্ষিণে ২টি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৪টি করে সর্বমোট ১২টি জানালা।
মসজিদের কারুকার্যখচিত প্রবেশদ্বার ও মেহরাবে বিদ্যমান ক্যালিগ্রাফি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। প্রবেশদ্বারের ওপরের বাম দিকে আরবি অক্ষরে ইসলামের চার খলিফার নাম ও মাঝখানে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)-এর নাম অলংকৃত করা হয়েছে। মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর নির্মাণে কোন লোহা বা তারকাটা ব্যবহার করা হয়নি। মমিন আকনের নাতি মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ মমিন মসজিদের প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ‘মমিন মসজিদ: স্মৃতি বিস্মৃতির খাতা’ নামক একটি বই রচনা করেন। ফলে ২০০৩ সালে মসজিদটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধীনে মসজিদের সংস্কার কাজে লোহা ব্যবহার করে মসজিদের মূল ডিজাইনে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। আকর্ষণীয় জ্যামিতিক নকশা ও আরবি ক্যালিগ্রাফির জন্য অনেক দর্শনার্থী দূরদূরান্ত থেকে এই মসজিদটি দেখতে আসেন। উদয়তারা বুড়িরচর গ্রামের মূল সড়কটি মমিন মসজিদের নামে নামকরণ করা হয়েছে।


ভাণ্ডারিয়া শিশু পার্ক
পিরোজপুর জেলার ভা-ারিয়া উপজেলা অবস্থিত ভা-ারিয়া শিশু পার্ক (Bhandaria Shishu Park) একটি পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্র। সব বয়সী দর্শনার্থীদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে নির্মিত ভা-ারিয়া শিশু পার্কে আছে বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় রাইড এবং বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। প্রায় ৩.৩৮ একর আয়তনের ভা-ারিয়া শিশু পার্কে রয়েছে নানা প্রজাতির অসংখ্য গাছপালা ও ফুলের বাগান। সবুজে ঢাকা এই পার্কটি অতি অল্প সময়ে পিরোজপুর জেলার একটি অত্যাধুনিক শিশু পার্ক হিসাবে সর্বত্র পরিচিতি পেয়েছে।


মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা
১৯৭১ সালে তদানীন্তন জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা ও বাঙালির গণতান্ত্রিক সংগ্রামের চিরকালের সাহসী মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ রের্সকোর্স ময়দানে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এবং ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’ বলে ঐতিহাসিক ও দিক নির্দেশনাপূর্ণ ভাষণের প্রেক্ষিতে দেশের অন্যান্য স্থানের মত তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমার প্রতিটি গ্রামে গড়ে ওঠে প্রতিরোধের দুর্গ। এ সময় প্রায় সকওল মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। পিরোজপুরের ছাত্র-জনতা একতাবদ্ধ হয়ে মারমুখি হয়ে ওঠে। শত্রুর বিরুদ্ধে ৩ মার্চ বিকালে ঢাকা থেকে আগত সামসুল হক (এম.এন.এ-মঠবাড়িয়া), ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুক ও আওয়ামী লীগ নেতা বদিউল আলমের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীরা পিরোজপুরে পাকিস্তানি পতাকায় অগ্নিসংযোগ করতে করতে মিছিল সহকারে শহর প্রদক্ষিণ করে।