জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের খুলনা

ঢাকা, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২০ | ২৩ চৈত্র ১৪২৬

জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের খুলনা

খোলা কাগজ ডেস্ক ১১:০০ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২০

print
জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের খুলনা

সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলা বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম জেলা। শিল্প বাণিজ্য, প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির এই অভূতপূর্ব মিলন ঘটেছে এই জেলায়। রূপসা, ভৈরব, চিত্রা, পশুর, কপোতাক্ষসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নদী বৈচিত্র্যে ভরপুর খুলনা জেলায় রয়েছে চিংড়ি শিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্প। খুলনার দর্শনীয় জায়গা ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে সুন্দরবন, সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন স্পট (করমজল, দুবলার চর, কটকা, হিরণ পয়েন্ট), রূপসা নদী পাড়, খান জাহান আলী সেতু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয়, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সৌধ পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ জেলাকে নিয়ে আজকের প্রতিবেদন

সুন্দরবন

সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে অখ- বন যা বিশ্বে সর্ববৃহৎ। অববাহিকার সমুদ্রমুখী সীমানা এই বনভূমি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

এর বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ একই নিরবচ্ছিন্ন ভূমিরূপের অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে সূচিবদ্ধ হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন ও সুন্দরবন জাতীয় পার্ক নামে। সুন্দরবনকে জালের মত জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ছোট ছোট দ্বীপ।

মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলের এলাকা। বনভূমিটি, স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরণের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। জরিপ মোতাবেক ৫০০ বাঘ ও ৩০,০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে এখন সুন্দরবন এলাকায়। ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

নামকরণ: বাংলায় ‘সুন্দরবন’-এর আক্ষরিক অর্থ ‘সুন্দর জঙ্গল’ বা ‘সুন্দর বনভূমি’। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে ‘সমুদ্রবন বা চন্দ্র-বান্ধে (বাঁধে)’ (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে।

হাদিস পার্ক

শহীদ হাদিস পার্ক বাংলাদেশের খুলনা জেলার খুলনা শহরের বাবুখান রোডে বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনা শাখার পশ্চিম পাশ্বে অবস্থিত একটি পার্ক যা ১৮৮৪ সালে খুলনা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে শহরবাসীর বিনোদনের জন্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ‘খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্ক’ নামে প্রতিষ্ঠা করে। পরে ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের সময় আইয়ুব বিরোধী মিছিলে পুলিশ গুলিতে নিহত শহীদ শেখ হাদিসুর রহমান বাবুর নামে নামকরণ করা হয়। শহীদ হাদিস পার্কে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে নতুন শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে। পার্কের ঠিক সঙ্গেই সাদা রঙের নগর ভবন। বাধাই করা বিশাল এক লেক। এর চারপাশ দিয়ে ঘুরা যায়। ঠিক লেকের ওপরে একটা শহীদ মিনার। তার পাশে বিশাল পানির ফোয়ারা।

রূপসা সেতু

নির্মল বাতাস আর অপরুপ সৌন্দর্যের কারণে রূপসা সেতু খুলনাবসীর কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। নদী ও বিশুদ্ধ বাতাসকে কেন্দ্র করে  নানা বয়সী মানুষ প্রতিদিন আড্ডায় মেতে ওঠেন এখানে।

বর্তমানে সেতুটি খুলনার একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যায় রূপসা সেতুতে দাঁড়ালে এই মনোরম দৃশ্য যেকোনো পর্যটককে আকর্ষণ করবে। বিশেষ করে বাতাসে প্রচ- গতিতে রূপসা নদীর ঢেউগুলো যখন দুই পাড়ে আছড়ে পড়ে, তখনকার সে দৃশ্য যে কারও মন কাড়বে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠেছে সোডিয়াম বাতি। আলোর রোশনাইয়ে জ্বলজ্বল করছে চারপাশ। মোহনীয় এক পরিবেশ আচ্ছন্ন করে রেখেছে। শহুরে ব্যস্ততার ঘেরাটোপ পেরিযয়ে এ যেন অনন্য এক সৌন্দর্যপুরী। এ সেতুটির নাম খানজাহান আলী সেতু হলেও স্থানীয়ভাবে রূপসা সেতু হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত। কারণ সেতুটি রূপসা নদীর ওপর অবস্থিত।

করমজল

সুন্দরবনের আকর্ষণীয় যে কয়েকটি স্থান রয়েছে যেমন কটকা, কচিখালী, নীলকল, দুবলার চর, শেখের টেক মন্দির, মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত, হারবাড়িয়া, দোবেকী, কালিরচর, মৃগামারীম সুপতি ইত্যাদিসহ করমজল বিশেষ ভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।

এদের মধ্যে করমজল পর্যটন কেন্দ্রে প্রতিবছর সর্বাধিক সংখ্যক পর্যটক আসে। পশুর নদীর তীরে ৩০.০ হেক্টর আয়তনের আকর্ষণীয় এই পর্যটন কেন্দ্রটি সুন্দরবনের মডেল হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে। পর্যটন কেন্দ্রটির শুরুতেই বিশাল আকৃতির মানচিত্র সুন্দরবন সম্পর্কে সাম্যক ধারণা দেবে। মানচিত্র পেছনে ফেলে বনের মধ্যে দক্ষিণে চলে গেছে আঁকাবাঁকা কাঠের তৈরি হাঁটা পথ। পথের নাম মাঙ্কি ট্রেইল। এই নামের স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় ট্রেইলে পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই। পুরো ট্রেইল জুড়েই দেখা মিলবে সুন্দরবনের অন্যতম বাসিন্দা রেসাস বানরের। পথের দুই ধারে ঘন জঙ্গল।

এ বনে বাইন গাছের সংখ্যা বেশি। কাঠের পথ কিছু দূর যাওয়ার পরে হাতের বাঁয়ে শাখা পথ গিয়ে থেমেছে পশুরের তীরে। শেষ মাথায় নদীর তীরে বেঞ্চ পাতানো ছাউনি। মূল পথটি আরও প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে গিয়ে ছোট খালের পাড়ে থেমেছে। পথের মাথায় এখানেও আরও একটি শেইড। সেখান থেকে আবারও পশ্চিম দিকে কাঠের ট্রেইলটি চলে গেছে কুমির প্রজনন কেন্দ্রের পাশে।

এই ট্রেইলের মাঝামাঝি জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে একটি পর্যবেক্ষণ বুরুজ। এর চূড়ায় উঠলে করমজলের চারপাশটা ভালো করে দেখা যায়। কাঠের তৈরি ট্রেইলের একেবারে শেষ প্রান্তে কুমির প্রজনন কেন্দ্র। সেখান থেকে সামান্য পশ্চিম দিকে হরিণ ও কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র। সামনেই ছোট ছোট অনেকগুলো চৌবাচ্চা। কোনটিতে ডিম ফুটে বের হওয়া কুমির ছানা, কোনটিতে মাঝারি আকৃতির আবার কোনটিতে আরও একটু বড় বয়সের লোনা জলের কুমিরের বাচ্চা।

রবিঠাকুরের শ্বশুরালয়

বিভাগীয় শহর খুলনা থেেক মাত্র ১৯ কিলোমিটার দূরত্বে ফুলতলা উপজলোর দক্ষিণডিহি গ্রাম অবস্থতি। দক্ষিণডিহি গ্রামইে রয়েছে একসময়ের জাঁকজমকর্পূণ রায় বাড়ি তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ^শুরালয়। বর্তমানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ^শুরালয় ‘রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’নামে পরচিতি। এখানে রয়েেছ বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবিপত্নীর আবক্ষ ভার্ষ্কয এবং দ্বিতল ভবন।

এছাড়াও ঘন সবুজ বাগান, পান বরজ এবং নার্সারি এই বাড়িটির শোভাবর্ধন করেছে। জানা যায়, এই দক্ষিণডিহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাসারদা সুন্দরী  দেবী এবং কাকি ত্রিপুরা সুন্দরী  দেবী। যৌবনে বিশ্বকবি বেশ কয়েকবার মায়ের সঙ্গে এই দক্ষিণডিহি গ্রামের মামা বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন।

তাইতো কবির জন্ম এবং মৃত্যুবার্ষিকীতে নানা আয়োজনে মুখর হয়ে উঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয়। শুরুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরালয় তথা বিশ^কবির স্মৃতি বিজড়তি এ স্থানটি অবহেলিত থাকে। যার কারণে কবির অনকে স্মৃতি চিহ্ন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ^শুরালয় প্রথম সংস্কার করা হয় এবং ১৯৯৯ সালে এই স্থানটি সংরক্ষতি পুরাকীর্তির স্বীকৃতি লাভ করে।

কটকা সমুদ্রসৈকত

সুন্দরবনের আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম এ কটকা সমুদ্র সৈকত। কটকা সমুদ্র সৈকত সুন্দরবনের দক্ষিণ পূর্বকোণে খুলনা ও বাগেরহাটে অবস্থিত। অন্যভাবে বলতে গেলে মোংলা বন্দর থেকে প্রায় ৯০ কি.মি. দূরে অবস্থিত এবং সুন্দরবনের পূর্ব অভয়ারণ্যগুলোর মধ্যে প্রধান ও জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান।

সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তবে বনে বাঘের দেখা মেলা ভার। আর তার ওপর বাঘের দেখা মিললেও নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি তো আছেই।

তবে বাঘ দেখা ও নিরাপদে থাকা- এ দুই-ই সম্ভব সুন্দরবনের চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র কটকা অভয়ারণ্য থেকে। এখানে প্রায়ই দেখা মেলে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। এ ছাড়া মনোরম চিত্রা হরিণের দল, বিভিন্ন জাতের পাখি, শান্ত প্রকৃতি এবং বিভিন্ন বন্য প্রাণীর উপস্থিতির কারণে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় কটকা অভয়ারণ্য সব সময়ই আলাদা স্থান দখল করে আছে।

কটকা যেতে চাইলে আপনাকে প্রথমেই যেতে হবে সুন্দরবন অঞ্চলে (খুলনা, বাগেরহাটের মোংলা)। কটকায় বেড়াতে যাওয়ার প্রধান মাধ্যম বলতে গেলে শুধুই লঞ্চ। আর পর্যটকদের নিয়ে এই লঞ্চ নোঙ্গর করা হয় কটকা খালে।

খালের পশ্চিম পাড়ের জেটি পেরিয়ে ওপরে উঠলেই বন কার্যালয়। এখান থেকে খানিকটা পশ্চিমে এগুলেই দেখা মিলবে ইট বাঁধানো সংক্ষিপ্ত একটি পথের। এর পরে আরেকটু সামনে গেলে সমুদ্র। সূর্যাস্ত দেখার জন্য এই স্থানটি বেশ মনোরম।

কটকা বন বিভাগ কার্যালয়ের পেছন দিক থেকে সোজা পশ্চিমমুখী কাঠের তৈরি টেইলের উত্তর পাশের খালটির ভাটার সময় ম্যানগ্রোভ জাতীয় উদ্ভিদের ঘন শ্বাসমূল দেখা যায়। এ ছাড়া একটু নিরিবিলি স্থানে যেতে পারলে দেখা যায় চিত্রা হরিণের দল।

বনের দক্ষিণে কিছুক্ষণ হাঁটলে চোখে পড়বে পরপর তিনটি টাইগার টিলা। এ টিলায় প্রায়ই বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায়। টাইগার টিলা থেকে সামান্য পশ্চিমে বয়ার খাল। খালের দুই পাশ কেওড়া, গোলপাতা আর নানান পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে আছে চারপাশ।

এছাড়া কটকার জেটির উত্তরে খালের চরজুড়ে থাকা কেওড়ার বনেও দেখা মেলে দলবদ্ধ চিত্রা হরিণ, বানর আর শূকরের। আবার শীতের সময় দেখা মিলে যেতে পারে রোদ পোহানো লোনা জলের কুমির। কটকা বন কার্যালয়ের ঠিক ওপারে একটি ছোট খাড়ি চলে গেছে সোজা পূর্ব দিকে। এই পথে কিছু দূর যাওয়ার পরে হাতের ডানে ছোট্ট জেটি এবং ওপরে ওয়াচ টাওয়ার। কটকার ওয়াচ টাওয়ারটি চারতলা বিশিষ্ট।

বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড

খুলনা বিভাগের মোংলা উপজেলার দুবলার চর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চরের মাঝখানে বঙ্গোপসাগরে বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড বা বঙ্গবন্ধু দ্বীপ অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চরটির আয়তন প্রায় ১০ বর্গ কিলোমিটার। আশেপাশের স্থানীয় জেলেরা মাছ ধরতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড খুঁজে পেলেও চর আবিষ্কারের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৯২ সালে মালেক ফরাজী নামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক ভক্ত দুজন সাথী নিয়ে এই দ্বীপে নামেন এবং পরবর্তীতে তিনি সেখানে বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড নামের একটি সাইন বোর্ড লাগিয়ে আসেন।

বঙ্গবন্ধু চরে মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখি চামুচঠুঁটো বাটান ও ইউরেশীয় ঝিনুকখোরের দেখা মিলে। ভাগ্য ভাল হলে চরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে দেখা মিলবে ইরাবতী ডলফিনের। পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনাময় বঙ্গবন্ধু চর বা বঙ্গবন্ধু দ্বীপে পর্যটন কেন্দ্র, ওয়াচ টাওয়ার ইত্যাদি নির্মাণের বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।

বিভাগীয় জাদুঘর

জাতীয় জাদুঘরের আওতায় ও প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরটি  আয়তনের দিক থেকে এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জাদুঘর। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত নানান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিশেষ করে ঝিনাইদহের বারবাজার, যশোরের ভরত ভায়ানা এবং বাগেরহাটের খানজাহান আলী সমাধিসৌধ খননের ফলে প্রাপ্ত নানান দুর্লভ নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে এ জাদুঘরে। এ জাদুঘরে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন ঐতিহ্য খ্যাত আলোকচিত্র দেখা যাবে, তার মদ্ধে বিশ্ব ঐতিহ্য খ্যাত ষাটগম্বুজ জামে মসজিদ, নয়গম্বুজ মসজিদ, রনবিজয়পুর মসজিদ, জিন্দা পীরের মসজিদ, সোনা বিবির মসজিদ, সিঙ্গারা মসজিদ, দীদার খার মসজিদ, আনোয়ার খার মসজিদ, আহমদ খার মসজিদ, চিল্লাখানা, খানজাহান আলী (র.) এর বসতভিটা ও দীঘি, কোতয়ালী, কালোদীঘি, বিবি গোগিনীর মসজিদ এবং দশ গম্বুজ মসজিদসহ বৃহত্তর খুলনা, যশোর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল, মাগুরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর অঞ্চলের।

মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবময় ঘটনা। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই আমরা লাভ করেছি স্বাধীন দেশ, নিজস্ব পতাকা। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলার ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের জনগণ বর্বর হানাদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তারই পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে খোদিত হয় একটা নাম- ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ’।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে যারা অস্ত্র হাতে সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন কেবল তাদেরই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হয় তা নয়। সেই সঙ্গে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রী, সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ত্রাণ বিতরণসহ যাঁরা বিভিন্ন সেবামূলক কাজে অংশ নিয়েছেন তারা, কোলকাতায় স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পরিচালকম-লী, সাংবাদিক, ভাষ্যকার ও শিল্পী, প্রমুখকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসাব তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে যারা অস্ত্র হাতে মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের চার ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা:

(ক) তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর নিয়মিত সদস্যবৃন্দ। এরা আগে থেকেই অস্ত্র ব্যবহারে এমনকি সম্মুখ সমরাভিযানে প্রশিক্ষিত ছিলেন। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ‘নিয়মিত বাহিনী’র সদস্য ছিলেন।

(খ) দ্বিতীয়ত: সাধারণ মানুষ যাঁরা বাংলাদেশ ত্যাগ করে ভারতে গিয়েছিলেন এবং ভারতের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অস্ত্রচালনা, বিস্ফোরকদ্রব্যের ব্যবহার ও গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশলে প্রশিক্ষণ লাভের পর দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সেগুলো ব্যবহার করেছিলেন। সংখ্যায় এরাই সর্বার্ধিক। এদের বলা হতো ‘গণবাহিনী’। সামরিক প্রশিক্ষণের পরই এদের হাতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দেওয়া হয়েছিল। এদের মধ্যে ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ।

(গ) টাঙ্গাইলের বঙ্গবীর আব্দুল কাদেরর সিদ্দীকীর (বীর উত্তম) নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া বাহিনীর লোকজন। এদের অধিকাংশই প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাননি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ল্যান্স নায়েক কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে দেশের ভেতরই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং (ঘ) কেবল ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী, যারা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নতুনভাবে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, কিন্তু দেশাভ্যন্তরে না ফিরে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। এদের পৃথকভাবে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মুজিব বাহিনী’।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা প্রাপ্তি বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এ যুদ্ধে খুলনা বিভাগের মানুষের অবদানও কম ছিল না। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে স্বাধীনতার রক্তসূর্য ছিনিয়ে আনার সংকল্প নিয়ে এখানকার হাজার হাজার মানুষ তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। তারা তাদের জীবনের বিনিময়ে পরম প্রার্থিত প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা উপহার দিয়ে যান।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে খুলনা বিভাগের অবদান কম নয়। খুলনা বিভাগের মুক্তিযুদ্ধ সার্বিক মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপারও নয়। তবু সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একই সূত্রে গ্রথিত হলেও এ এলাকার লড়াইয়ের নিজস্ব একটা স্বকীয়তা রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে শত্রুপক্ষের হামলা ও তার প্রতিরোধ প্রচেষ্টার মধ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য থাকাই স্বাভাবিক।