ঐতিহ্যের তীর্থভূমি বাগেরহাট

ঢাকা, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২০ | ২৮ আষাঢ় ১৪২৭

ঐতিহ্যের তীর্থভূমি বাগেরহাট

রুপসী বাংলা ডেস্ক ২:০০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০২০

print
ঐতিহ্যের তীর্থভূমি বাগেরহাট

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তীর্থভূমি বাগেরহাট। সুন্দরবনে বাঘের বাস, দাড়টানা ভৈরব পাশ, সবুজ শ্যামলে ভরা নদী বাঁকে বসত যে হাট তার নাম বাগেরহাট। বাগেরহাট বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের জন্য বেশ ভূমিকা পালন করে আসছে। জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে ষাট গম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার, সুন্দরবন, মোংলা বন্দর, রেজা খোদা মসজিদ, জিন্দা পীর মসজিদ, ঠাণ্ডা পীর মসজিদ, সিংগাইর মসজিদ, বিবি বেগুনি মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, নয় গম্বুজ মসজিদ, কোদলা মঠ, রণবিজয়পুর মসজিদ, সুন্দরবন রিসোর্ট, চন্দ্রমহল পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ জেলাকে নিয়ে আজকের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেষে বাগেরহাট জেলার অবস্থান। বাগেরহাট খুব পুরনো ভূখণ্ড না হলেও বাগেরহাটের ইতিহাস উপমহাদেশের বহুপ্রাচীন জনপদের সমকালীন ও সমপর্যায়ের। হযরত খান জাহান (রঃ) এর সময় এ অঞ্চলের দীঘি খননকালে বিশেষ করে ‘খাঞ্জেলী দীঘি’ খননকালে পাওয়া ধ্যানী বুদ্ধমূর্তি থেকে অনুমিত হয় হযরত খান জাহান (রঃ) এর আগমনের বহুপূর্ব হতেই বাগেরহাটে এক বিস্তৃত জনপদ ছিল। বর্তমানে সেই বুদ্ধমূর্তি বাগেরহাটের শিববাড়ি থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধ বিহারে রক্ষিত আছে। বাংলার শাসক যখন নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ(১৪৪২-১৪৫৯) তখন হযরত খানজাহান (রঃ) এ অঞ্চল আবাদ করে নামকরণ করলেন ‘খলিফাত-ই-আবাদ’ বা প্রতিনিধির অঞ্চল। মানুষের কল্যাণে তিনি তৈরি করলেন ষাট গম্বুজসহ অসংখ্য মসজিদ, দীঘি, রাসত্মা ও পত্তন করলেন অগণিত হাট-বাজার। হযরত খান জাহান (রঃ) এর আগমনকাল না জানা গেলেও এ সাধক পুরুষ পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বহু ধর্মপ্রাণ অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে যশোর জেলার বার বাজার হয়ে ভৈরব নদী অতিক্রম করে বাগেরহাট পৌঁছান। বঙ্গেশ^র নসরৎ শাহের খলিফাতাবাদটাকশাল বাগেরহাট শহরের সম্ভবত মিঠাপুকুরের নিকটে অবস্থিত ছিল। মিঠাপুকুর পাড়ে সে আমলের একটি মসজিদ আছে। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সময়ে নির্মিত এক আকর্ষণীয় মঠ যাত্রাপুরের অযোধ্যায় (কোদলা) অবস্থিত। আজকের বাগেরহাট সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে বয়ে বেড়াচ্ছে।

সুন্দরবন
সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে অখণ্ড বন যা বিশ্বে সর্ববৃহৎ। অববাহিকার সমুদ্রমুখী সীমানা এই বনভূমি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ একই নিরবচ্ছিন্ন ভূমিরূপের অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে সূচিবদ্ধ হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন ও সুন্দরবন জাতীয় পার্ক নামে। সুন্দরবনকে জালের মত জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ছোট ছোট দ্বীপ। মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১,৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাড়ি, বিল মিলিয়ে জলের এলাকা। বনভূমিটি, স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরণের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। জরিপ মোতাবেক ৫০০ বাঘ ও ৩০,০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে এখন সুন্দরবন এলাকায়। ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। নামকরণ: বাংলায় ‘সুন্দরবন’-এর আক্ষরিক অর্থ ‘সুন্দর জঙ্গল’ বা ‘সুন্দর বনভূমি’। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে ‘সমুদ্র বন বা চন্দ্র-বান্ধে (বাঁধে)’ (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে। (সংগৃহীত)

কচিখালী সমুদ্রসৈকত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্চে এবং কটকা নদীর পূর্ব তীরে সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান কচিখালী (Kanchikhali Somodra Soikot)। ডাঙায় নানা জাতের হরিণ, গাছে গাছে হাজার রকমের পাখি। আকাশেও মুক্ত ডানা মেলে পাখ-পাখালির ওড়াওড়ি। জলে ডলফিন আর কুমির-শুশুক মাঝে মধ্যেই ভেসে উঠছে। এসব দৃশ্য দেখলেই মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সুন্দরবনে যে কোন পর্যটকই আসুক না কেন কচিখালী যাওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা তাদের মনে থেকেই যায়। কিন্তু বেশিরভাগ পর্যটকের সাধ্য হয় না মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কচিখালী দেখার। কারণ মোংলা থেকে লঞ্চে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে এখানে আসতে। কাঠের ট্রলারে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। তাছাড়া বন বিভাগ কাঠের ট্রলারে সেখানে কোন পর্যটক যেতে অনুমতি দেয় না। যে কোন নৌযানেই আকাশ ছোঁয়া ভাড়া। প্যাকেজ ট্যুরে সেখানে যাতায়াতে ১০-১২ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। দেশের নানা এলাকা থেকে দল বেঁধে এখানে আসছেন। কয়েকজন মিলে লঞ্চ ভাড়া করলে কিছুটা সস্তায় তাদের ভ্রমণ হয়।

খান জাহান আলী
হযরত খান জাহান আলী (র.) ছিলেন একজন মুসলিম ধর্ম প্রচারক এবং বাংলাদেশের বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক। তার অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছে উলুঘ খান, খান-ই-আজম ইত্যাদি। হযরত উলুঘ খান জাহান আলী (র.) ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর খাঁ এবং মাতার নাম আম্বিয়া বিবি (সূত্র দরকার)। ধারণা করা হয় যে তার পূর্ব পুরুষগণ তুরস্কের অধিবাসী ছিলেন। খান জাহান আলীর প্রাথমিক শিক্ষা তার পিতার কাছে শুরু হলেও তিনি তার মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন দিল্লিস্থ বিখ্যাত ওয়ালি এ কামিল পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে। তিনি কুরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞানার্জন করেন। খান জাহান আলী (কযধহ ঔধযধহ অষর) ১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ এ মাত্র ২৬/২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশের জাবিতান (গর্ভনর) পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে সুলতান খান জাহানের নেতৃত্বে ৬০,০০০ সুশিক্ষিত অগ্রবর্তী সেনাদলসহ আরও দুই লাখ সৈন্য নিয়ে বাংলা আক্রমণ করলে রাজা গণেশ দিনাজপুরের ভাতুরিয়াতে আশ্রয় নেন।

মোংলা বন্দর
মোংলা বন্দর (Mongla Bondor) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত। এটা দেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর। এটি খুলনা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বন্দরটি ১ ডিসেম্বর, ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার সেলাবুনিয়া মৌজায় পশুর নদী ও মোংলা নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত। এটা বঙ্গোপসাগর থেকে ৬২ মাইল (১০০ কিলোমিটার) উত্তরে অবস্থিত এবং প্রধান অভ্যন্তরীণ নদী বন্দরসমূহ ও খুলনায় রেল টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত। ছোট বন্দর হলেও কখনও কখনও প্রায় দুই ডজন সমুদ্রগামী জাহাজ মোংলা বন্দরে নোঙর করতে দেখা যায়। সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচলের উপযোগী গভীরতা হারিয়ে ফেলায় পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ১৯৮০ সাল থেকে বন্দরটি প্রায়ই বন্ধ করে দেওয়া হতো, এবং প্রতিবারই খননের পর এটি আবার জাহাজ নোঙরের জন্য উন্মুক্ত করা হতো। বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ৪০০টি জাহাজ এই বন্দরে নোঙর করে এবং বন্দরটির মাধ্যমে বছরে গড়ে ৩ মিলিয়ন মেট্রিকটন পণ্যের আমদানি-রপ্তানি সম্পন্ন হয়। এ বন্দরে রয়েছে ১১টি জেটি, পণ্য বোঝাই ও খালাসের জন্য ৭টি শেড এবং ৮টি ওয়্যারহাউজ।

কচিখালী সমুদ্রসৈকত
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্চে এবং কটকা নদীর পূর্ব তীরে সুন্দরবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান কচিখালী (Kanchikhali Somodra Soikot)। ডাঙায় নানা জাতের হরিণ, গাছে গাছে হাজার রকমের পাখি। আকাশেও মুক্ত ডানা মেলে পাখ-পাখালির ওড়াওড়ি। জলে ডলফিন আর কুমির-শুশুক মাঝে মধ্যেই ভেসে উঠছে। এসব দৃশ্য দেখলেই মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সুন্দরবনে যে কোন পর্যটকই আসুক না কেন কচিখালী যাওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা তাদের মনে থেকেই যায়। কিন্তু বেশিরভাগ পর্যটকের সাধ্য হয় না মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কচিখালী দেখার। কারণ মোংলা থেকে লঞ্চে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে এখানে আসতে। কাঠের ট্রলারে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। তাছাড়া বন বিভাগ কাঠের ট্রলারে সেখানে কোন পর্যটক যেতে অনুমতি দেয় না। যে কোন নৌযানেই আকাশ ছোঁয়া ভাড়া। প্যাকেজ ট্যুরে সেখানে যাতায়াতে ১০-১২ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। দেশের নানা এলাকা থেকে দল বেঁধে এখানে আসছেন। কয়েকজন মিলে লঞ্চ ভাড়া করলে কিছুটা সস্তায় তাদের ভ্রমণ হয়।

খান জাহান আলী
হযরত খান জাহান আলী (র.) ছিলেন একজন মুসলিম ধর্ম প্রচারক এবং বাংলাদেশের বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক। তার অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছে উলুঘ খান, খান-ই-আজম ইত্যাদি। হযরত উলুঘ খান জাহান আলী (র.) ১৩৬৯ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আকবর খাঁ এবং মাতার নাম আম্বিয়া বিবি (সূত্র দরকার)। ধারণা করা হয় যে তার পূর্ব পুরুষগণ তুরস্কের অধিবাসী ছিলেন। খান জাহান আলীর প্রাথমিক শিক্ষা তার পিতার কাছে শুরু হলেও তিনি তার মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন দিল্লিস্থ বিখ্যাত ওয়ালি এ কামিল পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে। তিনি কুরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞানার্জন করেন। খান জাহান আলী (Khan Jahan Ali) ১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দে সেনাবাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ এ মাত্র ২৬/২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশের জাবিতান (গর্ভনর) পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে সুলতান খান জাহানের নেতৃত্বে ৬০,০০০ সুশিক্ষিত অগ্রবর্তী সেনাদলসহ আরও দুই লাখ সৈন্য নিয়ে বাংলা আক্রমণ করলে রাজা গণেশ দিনাজপুরের ভাতুরিয়াতে আশ্রয় নেন।

মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট
১৯৭১ শাসন ও শোষণের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে একাত্তরের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান জাতি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করবে চিরদিন। অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি অনুযায়ী ১৯৭১ এর ২ মার্চ ঢাকা শহরে এবং পরের তিন দিন সমগ্র দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেওয়া হয়। ঢাকার বাইরে ৩ মার্চ থেকে হরতাল পালনের আহ্বান থাকলেও খুলনা শহরে ২ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত ৫ দিন হরতাল পালন করা হয়। হরতাল চলাকালে খুলনায় ৩ মার্চ সাত জন ও ৪ মার্চ আরো তিনজনসহ মোট ১০ জন প্রাণ হারান। ঐ হত্যাকাণ্ড খুলনা জেলার তৎকালীন মহকুমা শহর বাগেরহাটের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ দেশের সাধারণ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের অলিখিত ঘোষণা হিসেবে ধরে নেন। এর প্রেক্ষিতে বাগেরহাটেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ৯ মার্চ, ১৯৭১ সালে গঠিত হয় বাগেরহাট সংগ্রাম কমিটি। স্বাধীনতার পক্ষের দলগুলো নিয়ে গঠিত সর্বদলীয় এ কমিটির নাম দেওয়া হয় ‘বাগেরহাট মহকুমা সংগ্রাম কমিটি’।

ষাট গম্বুজ মসজিদ
ষাট গম্বুজ মসজিদ খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। মসজিদটির কোন শিলালিপি না থাকায় ষাট গম্বুজ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখে খান-ই-জাহান ১৫০০ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এ মসজিদে ব্যবহৃত পাথরগুলো রাজমহল থেকে আনা হয়েছিলো। ষাট গম্বুজ মসজিদটি বাংলাদেশের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইউনেস্কো ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। মসজিদটি বাইরের দিক দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১৬০ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১০৪ ফুট লম্বা।

জাদুঘর
বাগেরহাট জেলার সুন্দরঘোনায় ষাট গম্বুজ মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পুরাতন রূপসা রোডে বাগেরহাট জাদুঘর (Bagerhat Museum) অবস্থিত। ১৯৭৩ সালে মুসলিম সংস্কৃতি ও খান জাহান আলীর স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক আবেদন জানানো হলে ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো-বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ৫২০ বর্গ মিটার জায়গা জুড়ে এই জাদুঘরটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর বাগেরহাট জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ষাট গম্বুজ মসজিদের সঙ্গে অবস্থিত জাদুঘর ভবন নির্মাণে ইসলামী স্থাপত্য কলা প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ৩টি গ্যালারি বিশিষ্ট দক্ষিণমুখী জাদুঘরে বাগেরহাটের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখার পাশাপাশি বাগেরহাটের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের সুযোগ রয়েছে।

চন্দ্রমহল ইকোপার্ক
চন্দ্রমহল ইকো পার্ক (Chandra Mahal Eco Park) বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার রঞ্জিতপুর গ্রামে অবস্থিত একটি পিকনিক স্পট। ইকো পার্কে তাজমহলের আদলে তৈরি একটি ভবন রয়েছে, যার নাম চন্দ্রমহল। ২০০২ সালে সেলিম হুদা প্রায় ৩০ একর জায়গা জুড়ে এই ইকো পার্কটি তৈরি করে। তার স্ত্রী নাসিমা হুদা চন্দ্রের নামানুসারে চন্দ্রমহল নামকরণ করেন। চন্দ্রমহল ইকো পার্কে আগত দর্শনার্থীরা চন্দ্রমহলের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হন। ভবনের সোনালী রঙে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে অদ্ভুত আবহ তৈরি করে। চন্দ্রমহল চারদিক থেকে পানি দ্বারা বেষ্টিত তাই মূল ভবনে যেতে হলে পানির নিচ দিয়ে তৈরি টানেলে যেতে হয়। দর্শনার্থীদের বিনোদনের জন্য চন্দ্রমহলে বিভিন্ন প্রত্নতত্ত্বিক নিদর্শন রাখা আছে। দেশি-বিদেশি মুদ্রা, ডাক টিকিট, যুদ্ধের অস্ত্র, প্রাচীন ঘড়ি, অলংকার, ধর্মীয় পুরাকীর্তি, পাথরের আসবাবপত্র, বিরল পাণ্ডুলিপি, বিভিন্ন মৃৎ শিল্প নিদর্শনসহ বিভিন্ন নিদর্শন স্থান পেয়েছে চন্দ্রমহল ইকো পার্কে। চন্দ্রমহল ইকোপার্কে নির্মাণ করা হয়েছে নানান রকম ভাস্কর্য, বাঁশের তৈরি ঘর, পানসী নৌকা, রাজাকারের প্রতীকী ফাঁসির মঞ্চ, কৃত্তিম রেল লাইন, রেস্টুরেন্ট এবং পিকনিক স্পট। আর চন্দ্রমহল ইকোপার্কের মিনি চিড়িয়াখানায় আছে বানর, বনবিড়াল, হরিণ, তিতপাখি, তুর্কী মুরগি, সাদা ময়ূর, বক, কুকুর, ঈগল, মদন টাক পাখি, সাদা ঘুঘু, হাঁস পাখি, পেঁচা, বেজী, কবুতর, কোয়েল, কুমিরসহ নানান প্রজাতির পশুপাখি।