ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে পরিমিত আহার ও কায়িক শ্রম

ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে পরিমিত আহার ও কায়িক শ্রম

লিপিকা আফরোজ ৮:০১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২০

print
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে পরিমিত আহার ও কায়িক শ্রম

আয়েশ করে গরম রসগোল্লা খাচ্ছিলেন লালন। পাশে বসে মিথুন সিঙ্গাড়ায় কামড় দিতে দিতে লালনের দিকে তাকাচ্ছিলেন। দুজনই চাকরিজীবী। লালন সরকারি চাকুরে, মিথুন আছেন বেসরকারি ব্যাংকে। পাঁচ বন্ধু মিলে একটি রেস্টুরেন্টে বসেছেন বিকেলে নাস্তা করতে।

লালন টিপ্পনী কেটে আফসোসের সুরে বললেন, আহারে বেচারা, মুখে রুচি, পকেটে টাকা আর দুর্বার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একটু মিষ্টিমুখ করার সাধ্য নেই। ভাই আপনি না হয় রস চিপে একটা শুকনো গোল্লা খেয়ে নেন। লালনের কথায় সবাই হেসে উঠল। হাসলেন মিথুনও।

হাসি থামলে মিথুন বললেন, খান খান, রসগোল্লা চমচম সবাই খান, যেদিন আমার মতো ইনসুলিন ঘাটতিতে পড়বেন সেদিন আপনিও আমার সঙ্গে সিঙ্গাড়া খাবেন, দাওয়াত দিয়ে রাখলাম অগ্রিম। এক সপ্তাহ পরের কথা। নিজের দপ্তরে কাজের ফাঁকে বসে ডিজিটাল গ্লুকোজ মনিটরে নিজেই নিজের ডায়াবেটিক মাপছেন। কী একটা কাজে লালন এসেছেন। মিথুনের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। অনেক কষ্ট করে, ডায়েট কন্ট্রোল, ব্যায়াম, হাঁটাহাঁটি ইত্যাদি করে সে ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। অনেকটা কৌতূহলবশত লালনের রক্ত পরীক্ষা করতে চাইল সে। লালনও আপত্তি করলেন না।

রক্তে সুগারের পরিমাণ দেখে দুজনই হতভম্ব। লালনের রক্তে সুগারের পরিমাণ ২২ মিলি মোল/লি যেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় তা ৭-এর নিচে থাকার কথা। তার ডায়াবেটিক মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, টেরই পাননি। লালনকে স্বভাবিক রাখতে মিথুন বললেন, মনে হয় আমার যন্ত্রটাই ঠিক নেই, আপনি একজন ডাক্তারের কাছে গিয়ে ব্লাড টেস্ট করান।

লালনের মতো এ দেশের হাজারও মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু রোগ সনাক্ত না হওয়ায় ধীরে ধীরে অকাল মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। অথচ সঠিক সময়ে এ রোগ সনাক্ত করতে পারলে এবং উপযুক্ত চিকিৎসা ও পরিচর্যায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হাজারও মানুষের।

ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র হরমোনের ঘাটতিজনিত একটি রোগ। এটি ছোঁয়াচে রোগ নয়। সাধারণভাবে রক্তে সুগার বা গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াকেই আমরা ডায়াবেটিস বলে ধরে নেই। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধির একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া রয়েছে। অগ্ন্যাশয় নিঃসৃত ইনসুলিন নামক হরমোনের ঘাটতি বা অনুপস্থিতির ফলে রক্তে গ্লুকোজের/সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়, একেই বলে ডায়াবেটিক। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৪১ কোটি লোক এ রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৮৫ লাখেরও বেশি। এছাড়া প্রতিবছর দেশে নতুন যোগ হচ্ছে ১ লাখের মতো রোগী। বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে প্রতি সেকেন্ডে একজন করে লোক মৃত্যুবরণ করছে।

শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি এ ছয় প্রকার খাবারের মধ্যে শেষের তিনটি পরিপাকের প্রয়োজন হয় না। স্নেহ জাতীয় খাবার পরিপাক শেষে বিভিন্ন প্রকার লিপিড ও গ্লিসারাইড তৈরি করে যা শরীরে আত্তীকৃত হয়। আমিষ হতে বিভিন্ন এমাইনো এসিড তৈরি হয়ে দেহে আত্তীকরণ ঘটে।

পরিপাক শেষে শর্করা গ্লুকোজ বা সুক্রোজে রূপান্তরিত হয়। অপেক্ষাকৃত সরল আণবিক গঠনের গ্লুকোজ দেহে শোষিত হয়। শ্বসন প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ ভেঙে কার্বনডাই অক্সাইড, পানি ও শক্তি উৎপাদন করে। গ্লুকোজের জারণ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তিই মূলত মানুষ এবং সমস্ত প্রাণিদেহের সকল শক্তির জোগান দেয়। স্নেহ জাতীয় খাবারও দেহে শক্তি যোগায়, তবে এ ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটা একটু জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। মানবদেহে জরুরি প্রয়োজনে শক্তির জোগান দিয়ে থাকে গ্লুকোজ।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় বস্তু পরিপাক হয়ে সরাসরি শ্বসন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না। শর্করাজাতীয় খাবার পরিপাক শেষে বিশ্লিষ্ট হয়ে অপেক্ষাকৃত সরল আণবিক গঠন বিশিষ্ট গ্লুকোজ অনু উৎপন্ন করে। এ গ্লুকোজ পাকস্থলীর ক্ষুদ্রান্তে শোষিত হয়ে রক্তরস দ্বারা বাহিত হয়ে দেহের বিভিন্ন কোষে পৌঁছায় এবং শ্বসন প্রক্রিয়ায় জারিত হয়ে শক্তি উৎপাদন করে। বাড়তি গ্লুকোজের কয়েক হাজার অণু একত্রিত হয়ে গ্লাইকোজেন ও স্টার্চ নামক গ্লুকোজের পলিমার গঠন করে।

গ্লাইকোজেন ও স্টার্চ লিভার/ যকৃতে সঞ্চিত থাকে এবং দেহের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় রক্তে প্রবেশ করে এবং বিপরীত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্লুকোজে বিশ্লিষ্ট হয়। এ গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে দেহকোষে প্রবেশ করে এবং শ্বসন প্রক্রিয়ায় শক্তি তৈরিতে অংশ নেয়। গ্লুকোজ হতে গ্লাইকোজেন বা স্টার্চ (গ্লুকোজের পলিমার) গঠনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে অগ্নাশয় নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিন। যাদের অগ্নাশয়ে ইনসুলিনের উৎপাদন হ্রাস পায় বা বন্ধ হয়ে যায় তাদের রক্তের গ্লুকোজ হতে গ্লাইকোজেন বা স্টার্চ উৎপাদনও ব্যহত হয় অথবা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাড়তি সুগার/গ্লুকোজ লিভারে সঞ্চিত না হয়ে রক্তেই থেকে যায়। ফলে রক্তরসে গ্লুকোজ/সুগারের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এ অবস্থাকেই বলা হয় ডায়াবেটিস।

প্রাথমিকভাবে ঘনঘন প্রশ্রাবের হওয়া, অল্প পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়া, গলা শুকিয়ে যাওয়া, দ্রুত ওজন হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি বাহ্যিক উপসর্গ দেখা যায়। কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে এসব লক্ষণের সব একত্রে নাও প্রকাশ পেতে পারে। সেক্ষেত্রে দু’একটি লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিংবা সুস্থ থাকতেও সবারই উচিত মাঝে মাঝে রক্তের সুগার লেভেল পরীক্ষা করা। কারণ রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বৃদ্ধি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার নিশ্চিত লক্ষণ। এ ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করতে হবে। কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এ রোগে আক্রান্ত হলে রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এ জন্য প্রথমেই দরকার কার্বোহাইড্রেট/ শর্করা জাতীয় খাবার যেমন মিষ্টিজাতীয় খাবার, ভাত, আলু, সুজি, রুটি ইত্যাদি খাবার পরিমাণ মতো খেতে হবে। মিষ্টিজাতীয় খাবার একেবারেই পরিহার করা উচিত। পক্ষান্তরে বেশি করে শাক সবজি ও ফলমূল খেতে হবে। আঁশজাতীয় খাবার বেশি খেতে হবে। তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার ও ফাস্টফুড ও কোল্ড ড্রিংকস পরিহার করতে হবে।

ডায়াবেটিসে সরাসরি মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম হলেও পরোক্ষভাবে এর কারণে লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটে বিশ্বব্যাপী। কারণ এর প্রভাবে দেহে হাজারও রোগ বাসা বাঁধে। এ সব রোগেই মূলত মারা যায় ডায়াবেটিস রোগী। জীবদ্দশায় বৃক্ক, যকৃত, হৃদপি-, চোখসহ দেহের বিভিন্ন অঙ্গ অকার্যকর হয়ে মানুষ হয়ে পড়তে পারে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পরিমিত আহার, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ব্যায়াম ও কায়িক শ্রম, সর্বোপরি সঠিক চিকিৎসা ডায়াবেটিক রোগীকে রাখতে পারে অনেকটাই সুস্থ।

এনে দিতে পারে দীর্ঘায়ু। প্রতিকার নয়, প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণই এ রোগের সর্বোত্তম চিকিৎসা। সচেতনতাই পারে মানুষকে এ রোগের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে। তাই বিশ্বব্যাপী এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি আজ সময়ের দাবি।

পিআইডি ফিচার

লিপিকা আফরোজ : কলাম লেখক