স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন যারা

ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ | ৩১ আষাঢ় ১৪২৭

স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন যারা

আলতাফ হোসেন ২:৪৭ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০

print
স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন যারা

স্বাধীনতা পুরস্কার সরকার কর্তৃক সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক। জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের নাগরিক এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পাশাপাশি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানেকেও এই পুরস্কার দেওয়া হয়। স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২০ প্রাপ্তদের নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আলতাফ হোসেন।

স্বাধীনতা পুরস্কার বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ এই পদক প্রদান করা হয়।

এই পুরস্কার জাতীয় পর্যায়ে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের নাগরিক এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও ব্যক্তির পাশাপাশি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পুরস্কার প্রদান করা হয়।

প্রত্যেক পদকপ্রাপ্তকে একটি ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ নির্মিত ৫০ গ্রাম ওজনবিশিষ্ট পদক, একটি সম্মাননাসূচক প্রত্যয়নপত্র এবং সম্মাননাস্বরূপ নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রদানকৃত অর্থের পরিমাণ ২০ হাজার ছিল, তবে ২০১৩ সাল থেকে দুই লাখ টাকা করে প্রদান করা হয়।

স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কিছু বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়া হয়। এর মধ্যে- স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পল্লী উন্নয়ন, সমাজসেবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনপ্রশাসন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য যে কোনো ক্ষেত্র। প্রায় প্রতি বছর কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জীবিতদের পাশাপাশি মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়ার রীতিও আছে।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের সংখ্যা কোনো বছর ১০-এর বেশি হবে না, তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে এই সংখ্যা বাড়াতে পারেন। পদকটি সাধারণত স্বাধীনতা দিবসের সন্ধ্যায় বিভিন্ন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিকের উপস্থিতিতে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রদান করা হয়।

আজিজুর রহমান
রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য আজিজুর রহমান। তিনি মৌলভীবাজারের গুজারাই গ্রামে ১৯৪৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আব্দুল সত্তার, মাতা মরহুম কাঞ্চন বিবি। আজিজুর রহমান শ্রীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা কলেজে ভর্তি হলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে হবিগঞ্জের বিখ্যাত বৃন্দাবন কলেজ হতে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বঙ্গবন্ধুর সরাসরি নির্দেশনায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ২৬ মার্চ, ১৯৭১ কারাবরণ করেন।

৭ এপ্রিল, ১৯৭১ মুক্তিবাহিনী কর্তৃক জেল ভেঙে সিলেট কারাগার থেকে তাকে মুক্ত করা হয়। ২ মে, ১৯৭১ পুনরায় পাকবাহিনী মৌলভীবাজার শহরে প্রবেশ করে বর্বরোচিত দমন-পীড়ন চালানোর পর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে আত্মনিয়োগ করেন। প্রবাসী সরকার কর্তৃক আয়োজিত সামরিক প্রশিক্ষণে সিলেট বিভাগের একমাত্র প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হিসেবে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ৪নং সেক্টরের রাজনৈতিক কো-অর্ডিনেটর ও কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারে এবং গণপরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর, ৬ ডিসেম্বর রাজনগর এবং ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মৌলভীবাজারকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করেন। তিনি মৌলভীবাজার জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠক।

গোলাম দস্তগীর গাজী
গোলাম দস্তগীর গাজী ১৪ আগস্ট ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলায়। পিতা গোলাম কিবরিয়া গাজী ও মা সামসুননেছা বেগম। তার স্ত্রীর নাম হাসিনা গাজী। তাদের দুই ছেলে। তিনি ২০০৮ ও ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী তার এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে ২০২০ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।

গোলাম দস্তগীর গাজী পুরান ঢাকার বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। মাধ্যমিক পাস করার পর ভর্তি হন নটরডেম কলেজে। ১৯৭১ সালে গোলাম দস্তগীর গাজী ছাত্র থাকাকালীন সময়ে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি ভারতে চলে যান। সে সময় তিনি বিএসসি পাস করে সবে মাত্র আইন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ২নং সেক্টরে বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন এবং ঢাকার কয়েকটি সফল অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন। গাজী অপারেশনে সবসময় সামনে থাকতেন।

গ্যানিজ ও দাউদ পেট্রল পাম্পের অপারেশন তার উল্লেখযোগ্য অপারেশন। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতাপূর্ণ অবদান রাখায় বাংলাদেশ সরকার গাজীকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করেছে। এছাড়া সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার জন্য তাকে ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মাদার তেরেসা পদকে ভূষিত করা হয়।

কমান্ডার আব্দুর রউফ
দেশের সর্বোচ্চ সম্মানজনক স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ও মহান মুক্তিযুদ্ধের তুখোড় সংগঠক কমান্ডার আব্দুর রউফ। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। কমান্ডার আব্দুর রউফ ৮২ বছর বয়সে ২০১৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন।

কমান্ডার আব্দুর রউফ ১৯৩৩ সালের ১১ নভেম্বর ভৈরবে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ্ব আবদুল লতিফ ছিলেন স্থানীয় পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান। কমান্ডার আব্দুর রউফ ছাত্রজীবনে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক (১৯৫১-৫২), কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সাধারণ সম্পাদক (১৯৫৩-৫৪) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সাধারণ সম্পাদক (১৯৫৫-৫৬)। তিনি ১৯৬২ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। সেখানে কর্মরত থাকা অবস্থায় স্বাধীন বাংলা আন্দোলনের সাথে জড়িত হন।

১৯৬৮ সালে এ কারণে গ্রেপ্তার হন তিনি। পরবর্তীতে তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ১৪ মাস কারাগারে কাটান। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে ওই মামলার অন্য অভিযুক্তদের সাথে মুক্তি পান। এরপর তিনি নরসিংদী কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তার অবদান ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আনোয়ার পাশা
আনোয়ার পাশা (এপ্রিল ১৫, ১৯২৮-ডিসেম্বর ১৪, ১৯৭১) কবি, কথাসাহিত্যিক এবং শিক্ষাবিদ। তার পিতা হাজী মকরম আলী আর মা সাবেরা খাতুন। আনোয়ার পাশার সাহিত্যকর্মে ফুটে ওঠে দেশাত্মবোধ, মননশীলতা এবং প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার। ছাত্রাবস্থায় তার সাহিত্যজীবনের সূচনা। রাজশাহী কলেজে বিএ পড়ার সময় তিনি হাস্নাহেনা শিরোনামে একটি রম্যরচনা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত প্রথম উপন্যাস ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ রচনার জন্য তিনি মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন।

আনোয়ার পাশা ১৯৪৬ সালে মাদ্রাসা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে কৃতকার্য হন। কিন্তু ১৯৪৮ সালে আইএ পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে। এরপর তিনি চলে আসেন রাজশাহী কলেজে। এখান থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক পাস করেন ১৯৫১ সালে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যেই স্নাতকোত্তর সম্মাননা অর্জন করেন।

মানিকচক হাই মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে আনোয়ার পাশার কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি ১৯৫৪ সালে ভাবতা আজিজিয়া হাই মাদ্রাসায় এবং ১৯৫৭ সালে সাদিখান দিয়ার বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে এই কলেজেরই বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকেন।

১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ১৯৬৯ সালে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী অধ্যক্ষ থাকাকালে তিনি স্থায়ী প্রভাষক হন। ১৯৭০ সালে তিনি জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদে পদোন্নতি পান। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এখানেই কর্মরত ছিলেন।

ডা. উবায়দুল কবীর চৌধুরী
ডা. উবায়দুল কবীর চৌধুরী হলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চর্মরোগ চিকিৎসক। চিকিৎসা শাস্ত্রে অনন্য সাধারণ অবদানের জন্য ২০২০ সালে তাকে ‘চিকিৎসাবিদ্যায় স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।

১৯৭৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন অধ্যাপক ডা. উবায়দুল কবীর চৌধুরী। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি ১৯৮৫ সালে ভিয়েনা বিশ^বিদ্যালয় থেকে দুর্দান্ত গ্রেড এবং তালিকার শীর্ষে চর্মবিজ্ঞান এবং ভেনেরোলজি বিষয়ে বিশেষত্ব অর্জন করেছেন।

এরপর তিনি ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল থেকে পেডিয়াট্রিক ডার্মাটোলজি বিষয়ে, আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোপাথোলজিস্ট থেকে স্কিন প্যাথলজি বিষয়ে, হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল থেকে স্কিন লেজার সার্জারি বিষয়ে, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে যৌন চিকিৎসার বিষয়ে এবং ভারতের অল ইন্ডিয়া মেডিকেল ইনস্টিটিউট থেকে স্কিন সার্জারি প্রশিক্ষণ অর্জন করেছিলেন।

সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি শমরিতা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০৩ সাল থেকে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডার্মাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক পদে কর্মরত আছেন। এছাড়াও ডা. উবায়দুল কবীর চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

ডা. এ কে এম এ মুকতাদির
ডা. এ কে এম এ মুকতাদির বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত চক্ষু চিকিৎসক। চিকিৎসা শাস্ত্রে অনন্য সাধারণ অবদানের জন্য ২০২০ সালে তাকে ‘চিকিৎসাবিদ্যায় স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ময়মনসিংহের পলাশকান্দায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন।

১৯৭৬ সালে গৌরীপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ে চক্ষু ক্যাম্প শুরু করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০৩ পর্যন্ত সেখানেই ক্যাম্প চালান। পরবর্তীতে তার স্ত্রী গাইনি চিকিৎসক ডা. মাহমুদা খাতুনের সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করেন ডা. মুকতাদির চক্ষু হাসপাতাল। ২০০৪ সালে নিজস্ব পাঁচ একর জমিতে ৭০ শয্যার এই হাসপাতাল স্থাপন করেন। বর্তমানে ১০০ শয্যায় উন্নীত এই হাসপাতাল।

চোখের ছানি অপারেশন, নেত্রনালির চিকিৎসা, চোখের মাংস বৃদ্ধি, গ্লুকোমা, চোখের ক্ষত, চোখের গুটি, টিউমার, ট্যারাচোখসহ চোখের সাধারণ রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫৬ জন জন রোগীকে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

২০১৪ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাওয়ার্ড পান। ২০১৬ সালে অ্যাসোসিয়েশন অব কমিউনিটি অপথালমলোজি ইন ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ তাকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড দেয়।

এসএম রইজ উদ্দিন
এসএম রইজ উদ্দিন আহম্মদ ১৫ জানুয়ারি ১৯৬০ সালে নড়াইলের লোহাগড়ার কুমড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তা, লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা। এসএম রইজ উদ্দিন আহম্মদ কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, প্রবন্ধ ও উপন্যাসের পাশাপাশি নড়াইল, পিরোজপুর, পাবনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে বই লেখেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে।

এসএম রইজ উদ্দিন আহম্মদ ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা রইজ উদ্দিন ১৫ জানুয়ারি ২০২০ সালে খুলনা বিভাগীয় উপভূমি সংস্কার কমিশনারের পদে থেকে অবসরে গেছেন। তিনি গাঙচিল সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি।

সদ্য সাবেক সরকারি কর্মকর্তা রইজ উদ্দিন ২৫টির বেশি বই লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে- কেমন করে স্বাধীন হলাম (কবিতা), পুষ্পিতারণ্যে বিথী (উপন্যাস), পরলোকে মর্তের চিঠি (পত্রোপন্যাস), রবীন্দ্রজীবনে ভবতারিনীর প্রভাব ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (প্রবন্ধ), দেখে এলাম নেদারল্যান্ডস : ভূমি প্রসঙ্গ (ভ্রমণ কাহিনী), আগস্ট ট্র্যাজেডি ও তারপর! (ইতিহাস)।

গাঙচিল সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রইজ উদ্দিন ২০০৮ সালে সাউথ এশিয়ান কালচারাল সোসাইটির দেওয়া ‘আন্তর্জাতিক মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক’, ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা থেকে সম্মাননা, ২০১২ সালে বিশ্ব বাঙালি সম্মাননা, ২০০৯ সালে কথাসাহিত্যিক কাশেম রেজা স্মৃতি গাঙচিল সাহিত্য পদক, ২০১০ সালে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্বাধীনতা পদক, ২০০৭ সালে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীন স্বর্ণপদক পান।

ফেরদৌসী মজুমদার
ফেরদৌসী মজুমদার প্রতাপশালী বাংলাদেশি অভিনেত্রী। স্বাধীনতা উত্তরকালে টিভি ও মঞ্চে সমান সফলতার সঙ্গে অভিনয় করে আসছেন। ধারাবাহিক নাটক সংশপ্তকে ‘হুরমতি’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি বিপুল প্রশংসা লাভ করেন।

ফেরদৌসী মজুমদারের জন্ম বরিশালে হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন ঢাকাতে। তার বাবা খান বাহাদুর আব্দুল হালিম চৌধুরী ছিলেন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট। তার ভাইবোন ছিল মোট ১৪ জন, যাদের মধ্যে ৮ ভাই এবং ৬ জন বোন। সবচেয়ে বড় ভাই কবীর চৌধুরী এবং মেজ ভাই শহীদ মুনীর চৌধুরী। ‘দারুল আফিয়া’ নামের বাড়িতে তার শৈশব কেটেছে। তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল নোয়াখালীতে।

ফেরদৌসী মজুমদারের পরিবার ছিল খুব রক্ষণশীল। বাড়িতে সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল নিষিদ্ধ। তার লেখাপড়া শুরু হয় নারী শিক্ষা মন্দির স্কুল থেকে। এই স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ার পর তিনি ভর্তি হন মুসলিম গার্লস স্কুলে যেখান থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর ইডেন কলেজে ভর্তি হন। তিনি ছোটবেলায় খেলাধুলা করতে পছন্দ করতেন এবং একবার ৯৬৬ বার স্কিপিং করে ক্রিস্টালের বাটি পেয়েছিলেন যদিও ফিট হয়ে গিয়েছিলেন তখন। তিনি ছোটবেলা থেকেই মানুষকে ভেঙ্গাতে পারতেন।

বাবা-মার অমতে তিনি ১৯৭০ সালের ১৩ জুন রামেন্দু মজুমদারকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালের শুরুতে তিনি পাকিস্তানের করাচীতে চলে যান একটা অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মে কাজ করতে। পরে ১১ মার্চ ঢাকায় ফিরে আসেন এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মে মাসে তার পরিবারের সবাই মুনীর চৌধুরী ছাড়া দাউদকান্দি, চান্দিনা হয়ে কলকাতা চলে যান। ১৯৭২ সালে ‘থিয়েটার’ গঠন করা হয়, যেখানে ছিল আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার প্রমুখ। ফেরদৌসী মজুমদার সেই দলে যোগ দেন। তিনি মোট ২টি সিনেমায় অভিনয় করেন ‘মায়ের অধিকার’ এবং ‘দমকা’।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিনি প্রায় তিনশ’র মতো নাটক করেন। তার অভিনয় জীবন প্রায় তিন দশকের মতো দীর্ঘ। আবদুল্লাহ আল মামুন ফেরদৌসী মজুমদারকে নিয়ে ৮৬ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, যার নাম ‘জীবন ও অভিনয়’।

কালীপদ দাস
কালীপদ দাস বাংলাদেশি লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। কালীপদ দাস বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : ‘ছোটদের সোহরাওয়ার্দী’, ‘ছোটদের বেগম রোকেয়া’, ‘আমাদের শেখ মুজিব’ ‘ছোটদের মাওলানা ভাসানী’।

ভারতেশ্বরী হোমস
ভারতেশ্বরী হোমস টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অবস্থিত বাংলাদেশের নামকরা একটি নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০২০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করে। নারীর ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন টাঙ্গাইলের জমিদার দানবীর হিসেবে খ্যাত রণদা প্রসাদ সাহা।

তিনি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন তার পিতামহী ভারতেশ্বরী দেবীর নামানুসারে। শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতার জন্য ভারতেশ্বরী হোমসের নাম দেশজুড়ে সুবিদিত। এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ছাত্রীদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা। এতে ছাত্রীদের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে।

প্রতিদিন ছাত্রীরা রুটিন করে ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে দৈনিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে দিনের কার্যক্রম শুরু করে আর ঘুমাতে যায় রাত ১০টায়। হোমসের প্রায় সব কাজই ছাত্রীরা নিজেরাই করে। প্রতিটি কাজের জন্য প্রতিটি শ্রেণি থেকে ৩০ জনের একটি দল তৈরি করা হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার। এদের জন্য ৮ জন পুরুষসহ ৬৮ জন শিক্ষক।