ইতিহাস ঐতিহ্যের যশোর

ঢাকা, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০ | ২৭ চৈত্র ১৪২৬

ইতিহাস ঐতিহ্যের যশোর

খোলা কাগজ ডেস্ক ২:২৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

print
ইতিহাস ঐতিহ্যের যশোর

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তীর্থভূমি যশোর। কপোতাক্ষ নদের তীরে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভূমি ও নকশিকাঁথা আর জামতলার রসগোল্লার জন্য প্রসিদ্ধ যশোর জেলা। এছাড়া যশোর জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে শ্রীধরপুর জমিদারবাড়ি, কালেক্টরেট পার্ক, পৌরপার্ক, লালদীঘির পাড়, জেস গার্ডেন পার্ক, বেনাপোল স্থলবন্দর, কেশবপুরের ভরতের দেউল পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। খেজুরের গুড়, যা পাটালি গুড় নামে পরিচিত। যশোর পাটালি গুড়ের জন্য বিখ্যাত। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ জেলা নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।

বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটি প্রাচীনকালে কয়েকটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ইতিহাসে এসব রাজ্য ভাঙা, পাণ্ডু, সমতট, তাম্রলিপি বঙ্গ ইত্যাদি নামে পরিচিত। উক্ত সময়ে যশোর তাম্রলিপি ভাঙা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়।

গঙ্গা নদীর পলল অবক্ষেপণে সৃষ্ট যশোর জেলার সবচেয়ে পুরাতন বিবরণ পাওয়া যায় টলেমির মানচিত্রে। মহাভারত, পুরান, বেদ ও আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে এ অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। যশোর জেলার নামকরণ অনুসন্ধানে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। যশোর নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বহু কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। কেউ বলেছেন আরবি শব্দ ‘জেসিনরে’ থেকে যশোর নামের উৎপত্তি যার অর্থ সাকো।

অনুমান করা হয় খানজাহান আলী বাঁশের সাকো নির্মাণ করে ভৈরব নদী পার হয়ে মুড়লীতে আগমন করেন বলে বাঁশের সাকো থেকে যশোর নামের উৎপত্তি। আবার কেউ বলেছেন যশোর শব্দ ‘যশোহর’ শব্দের অপভ্রংশ। যার অর্থ যশ হরণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। গৌড়ের যশ হরণ করে এই শহরের শ্রীবৃদ্ধি হওয়ায় নাম হয় যশোর। নামের উৎপত্তি যাই হোক পরবর্তীকালে যশোরসহ সন্নিহিত অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও বৈপ্লবিক ইতিহাস বহু উত্থান-পতন আর বৈচিত্র্যপূর্ণ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যশোর জেলার আজকের এই অবস্থান। চিরকালের আপসহীন সংগ্রামী যশোরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইংরেজ শাসকগণ তাদের শাসন কাজের সুবিধার জন্য যশোরকে একটি ভূখণ্ডের নির্দিষ্ট করে স্বতন্ত্র জেলায় রূপান্তরিত করে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য এ জেলাটির মাধ্যমেই ১৭৮১ সালে বর্তমান বাংলাদেশে ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৭৮১ সালে জেলা ঘোষণার পর প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন মি. টিলম্যান হেঙ্কেল (১৭৮১-১৭৮৯)। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের ফলে অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলকে করা হয় পাকিস্তানের অংশ এবং পশ্চিমাঞ্চলকে করা হয় ভারতের। এর মধ্যে সীমানারেখা নির্ধারণের ফলে যশোর জেলার ভৌগোলিক অবস্থানের পরিবর্তন সাধিত হয়। এ সময় যশোরের বনগ্রাম মহকুমাকে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।

আইটি পার্ক
আইসিটি সেক্টরের বিকাশ ও আইটি খাতকে সমৃদ্ধ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করতে যশোরে স্থাপিত হয়েছে ‘শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক। ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই আইটি পার্কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক-এ ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কম্পিউটারের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং, কল সেন্টার ও রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এ চারটি ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশের আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যশোরে আন্তর্জাতিক মানের একটি আইটি পার্ক স্থাপনের ঘোষণা দেন। দীর্ঘদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর ২০১৪ সালের ২৫ এপ্রিল যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকায় এ প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। শহরের বেজপাড়া এলাকায় ২৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।

ফুল চাষের গোড়াপত্তন
ফুল এবং বাঙালির জীবন এক অবিচ্ছেদ্য সুতোয় গাঁথা। রুচিশীল বাঙালি মাত্রই বাড়ির আঙিনায় ফুল বাগানের সমারোহ। কিন্তু ফুলচাষ যে বাড়ির আঙিনা ছেড়ে বাণিজ্যিক সাফল্য লাভও করতে পারে তা বাংলাদেশে প্রথম পরিলক্ষিত হয় যশোর জেলায়। মূলত আশির দশকের শুরুতে বাণিজ্যিকভাবে যশোরে ফুল চাষ শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে প্রথম ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি গ্রামের শের আলী ভারত থেকে বীজ এনে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন। শের আলীর সেই গদখালি গ্রামই এখন যশোরের ফুল চাষের রাজধানী।

এখানে প্রতিদিন ভোরে ফুলের হাট বসে। পাইকারী ফুল ব্যবসায়ীরা এই হাট থেকে ফুল কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়। যশোরের উৎপাদিত ফুল চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের ৫৪ টি জেলায়।

মুক্তিযুদ্ধে যশোর
দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোর, ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোরে পরাজিত হয়। ৬ ডিসেম্বর সকালে ও দুপুরে দুই দফায় প্রচণ্ড লড়াই হয় ভারতীয় ৯ম পদাতিক ও ৪র্থ মাউন্টেন ডিভিশনের সঙ্গে পাকিস্তানি ৯ম ডিভিশনের। সুরক্ষিত পাক দুর্গ বলে খ্যাত যশোর ক্যান্টনমেন্টে পর্যাপ্ত সৈন্য না থাকায় পাকিস্তানি সেনারা হতোদ্যম হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে থাকে। মুখোমুখি সে যুদ্ধে পাকসেনাদের অবস্থান ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্টের ১০ কিলোমিটার পশ্চিমে আফরায়। বাংলাদেশের ৮ কিলোমিটার অভ্যন্তরে গরিবপুরে মিত্র বাহিনী অবস্থান নেয়। আফরার প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ায় পাকসেনাদের পালানো ছাড়া গত্যন্তর থাকে না এবং পাক বাহিনী যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে খুলনায় পালিয়ে যায়। মুক্ত হয় যশোর।

ইমাম বারা
সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নে অবস্থিত ৩০০ বছরের পুরনো মুরালি ইমাম বারা। এটি প্রতিষ্ঠা করেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন। ইট দিয়ে নির্মিত আয়তাকার ভবনটি উত্তর-দক্ষিণে ৬০ ফুট, পূর্ব-পশ্চিমে ৫০ ফুট যা ভেতরের অংশে ১০টি পিলার দিয়ে তিন সারিতে বিভক্ত। পিলারের পলেস্তরার ওপর কালো কালি দিয়ে আরবি লিপিতে লেখা দৃষ্টিনন্দন ক্যালিগ্রাফি রয়েছে।

যশোর বিমান বন্দর
১৯৪২ সালে ব্রিটিশরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে যশোরে বিমান ঘাঁটি নির্মাণ কাজ শুরু করে। ১৯৪৬ সালে ২২৫ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় যশোর বিমান বন্দর। ভারত ভাগ হলে ১৯৫০ সালে যশোরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করে। তবে যশোরে পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর চালু হয় ১৯৬০ সালে।

জেস গার্ডেন পার্ক
যশোর শহর থেকে মাত্র ২.৫ কিঃমিঃ দূরে বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম দিকে সুন্দর, নির্মল ও নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত “ জেস গার্ডেন পার্ক। প্রায় ১২ একর জমির উপর পার্কটির অবস্থান। মরহুম এ. এস. এম হাবিবুল হক চুনি ১৯৯২ সালে এই পার্কটি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এটি যশোরের মানুষের কাছে অন্যতম একটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

যশোরের আশপাশের সকল জেলা হতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। এক সময় সিলেট, চট্টগ্রামসহ দূরের অনেক জেলা হতে মানুষ এই জেস গার্ডেনে ঘুরতে আসতেন।

যশোর শহরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হওয়ায় দর্শনার্থীদের কাছে স্থানটি বেশ আকর্ষনীয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিশুদের আনন্দের জন্য পার্কটির জুড়ি নেই। দুপাশে দিগন্ত জোড়া সবুজ ফসলের মাঠ পার্কটির শোভা আরো বৃদ্ধি করেছে। পার্কটির চারপাশ দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য বড় বড় গাছ।

এগুলো একদিকে যেমন পার্কটির শোভা বৃদ্ধি করেছে অন্যদিকে দর্শনাথীদের নির্মল ছায়া দিচ্ছে। পার্কের ভেতরে ঢুকেই চোখে পড়বে একটি কৃত্তিম জলাশয় যেখানে পদ্মফুল ফুটে থাকে, আর তার মাঝে একটি ভাস্কর্য, কৃত্তিম কুমির ও কয়েকটি কৃত্তিম বক পাখি দাঁড়িয়ে আছে।

খেজুরের গুড়
যশোরের শত শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে খেজুরের রস, গুড় ও পাটালি। ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের যশোর খুলনা ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৯০০-১৯০১ সালে পূর্ব বঙ্গে খেজুরের গুড় তৈরি হয়েছে ২১ লাখ ৮০ হাজার ৫৫০ মণ। এর মধ্যে শুধুমাত্র যশোরেই তৈরি হয়েছে ১৭ লাখ ৯ হাজার ৯৬০ মণ গুড়।

১৮৬১ সালে ইংল্যান্ডের নিউ হাউজ চৌগাছার তাহেরপুরে খেজুরের গুড় থেকে ব্রাউন সুগার তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঐ কারখানার উৎপাদিত গুড় সে সময়ে ইউরোপে রপ্তানি হয়েছে। পরবর্তীতে যশোরের বিভিন্ন গ্রামে ১১৭টি কারখানা গড়ে উঠে। কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পর সাদা চিনির কাছে লালচে গুড় পরাজিত হয়। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে যশোরে সাত লাখ ৯১ হাজার ৫১৪টি খেজুর গাছ রয়েছে।

এসব গাছ থেকে প্রতি বছর চার হাজার ৬৪০ মেট্রিকটন গুড় ও ৪০ মেট্রিকটন রস উৎপাদন হয়। বিংশ শতাব্দির প্রথম দিকে যশোরের ‘নোলেন গুড়’ দিয়ে বিখ্যাত সন্দেশ তৈরি করা হতো যা কোলকাতায় এখনো একটি সুস্বাদু খাবারের তালিকায় স্থান পায়।

বেনাপোল স্থল বন্দর
দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেনাপোল স্থলবন্দর যা শার্শা উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম বেনাপোলে অবস্থিত। স্থলপথে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের প্রায় ৯০% এর মাধ্যমে সংঘটিত হয়। বেনাপোল হতে কোলকাতা মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে ভারত গমনের প্রধান পথ যশোর-বেনাপোল-বনগাঁ-কোলকাতা গ্যার্ন্ড ট্রাঙ্ক রোড রুট ব্যবহৃত হয়।

রিট্রিট সিরিমনি
রিট্রিট সিরিমনি বেনাপোল স্থলবন্দরের একটি অন্যতম আকর্ষণ কুচকাওয়াজ। সূর্যাস্তের সময় বেনাপোল সীমান্তের শূন্য রেখায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী মাথায় লাল হলুদ ডোরা ফুল পরে দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে দুই দেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে এই নয়নাভিরান সামরিক কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করা হয়।

ভাসমান সেতু
যশোরের মণিরামপুরের ঝাঁপা বাওড়ের ওপর প্রায় ১৩০০ ফুট দীর্ঘ একটি ভাসমান সেতু (Floating Bridge) নির্মাণ করা হয়েছে।
এই ভাসমান সেতু নির্মাণের ফলে কপোতাক্ষ নদ এবং ঝাঁপা বাঁওড়ে ঘেরা মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা গ্রামের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের কিছুটা অবসান ঘটলো।

মির্জানগর হাম্মামখানা
বাংলার সুবেদার শাহ সুজার শ্যালকপুত্র মীর্জা সফসিকান ১৬৪৯ সালে যশোরের ফৌজদার নিযুক্ত হন। যশোরের কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে কপোতাক্ষ ও বুড়িভদ্রা নদীর সঙ্গমস্থল ত্রিমোহিনীতে বাস করতেন তিনি। তার নামানুসারে এলাকাটির নাম হয় মীর্জানগর।

ত্রিমোহিনী কেশবপুর রাস্তার পাশে মীর্জানগরে ছিল নবাববাড়ি। এ নবাববাড়িতেই তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য হাম্মামখানা। নবাববাড়ি বর্তমানে ভগ্নস্তূপ হলেও হাম্মামখানার অস্তিত্ব এখনও টিকে আছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নুরলা খাঁ ফৌজদার নিযুক্ত হয়ে বুড়িভদ্রা নদীর দক্ষিণ পাড়ে দুর্গ বা কিল্লাবাড়ি স্থাপন করে সেখানে বসবাস করতেন। সুবিস্তৃত পরিখা খনন করে ১০ ফুট উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত করে এটিকে মতিঝিল নামকরণ করেন তিনি।

কালেক্টরেট বিল্ডিং
উপমহাদেশের প্রথম কালেক্টরেট হিসেবে ১৭৮৬ সালে যাত্রা শুরু করা কালেক্টরেট ১৮৮৫ সালে বর্তমান স্থানে একতলা ভবন নির্মাণ করা হয় এবং ১৯৮০ সালে দোতলা উদ্বোধন করার মধ্য দিয়ে বর্তমান রূপ লাভ করে। কালেক্টরেট ভবনটি যশোর শহরের দড়াটানায় অবস্থিত। উপমহাদেশে ব্রিটিশ স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে প্রাচীনতম। ১৭৮১ সালে জেলা ঘোষণার পর প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করেন মি. টিলম্যান হেঙ্কেল (১৭৮১-১৭৮৯)। এই ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের অনেক বিখ্যাত কর্মকর্তার নাম।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত
অনুভূতি ও চিন্তার অপূর্ব বাস্তবায়নের নবরূপকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বাংলা সাহিত্য যেন একই বৃন্তে ফুটে থাকা দু’টি ফুল। সাহিত্যের গতানুগতিক আদর্শ ভৎখাত করে নতুন আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে বিশে^র দরবাবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন মাইকেল। নাতিদীর্ঘ জীবনের ভেতর সাইকেল যে আত্মপ্রত্যয় ও আত্মদ্রোহের ছাপ বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন তা অসাধারণ এবং অবিস্মরনীয়।

বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার আলোকবর্তিকা মাইকেল ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি শনিবার যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক ধর্নাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছন্দের নানা মাত্রিক পরীক্ষা মিল-বিন্যাস অমিলতা ও যতি স্বাধীনতা দিয়ে মাইকেল বাংলা কবিতার সীমানাকে বহুদূর প্রসারিত করেছে। বাংলা সাহিত্যকে এতদিন যে লোহার বেড়ীর মতো পায়ে শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছিল- সোনার কাঠির স্পর্শে মধুসূদন নিদ্রিত রাজকন্যার ঘুম ভাঙালেন।

সাহিত্যে শামিষ্ঠা, পদ্মাবতী, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, কৃষ্ণকুমারী, একেই কি বলে সভ্যতা, তিলোত্তমা সম্ভব, মেঘনাদ বধকাব্য, ব্রজাঙ্গঁনা কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য তাঁর অনবদ্য অবদান। তাঁর লেখা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে আলাদা রূপমাধুর্য্য যা বাঙালিকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।

জেলা প্রশাসকের পুরাতন বাসভবন
সাতক্ষীরা হাউজ নামে পরিচিত ১৮৯৫ সালে নির্মিত দেশের প্রথম কালেক্টরের বাসভবন যেন স্থাপত্য নিদর্শনের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্য। দোতলা এ ভবন সংলগ্নে রয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত এক মাঠ যার মোট জমির পরিমাণ ২৪.৭৫ একর। বহুল পরিচিত এই ডিসি বাংলো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ডিসি বাংলো।

তৎকালীন ভারত সম্রাট ১৯২১ সাল থেকে দু’দফায় ২৫ বৎসরের জন্য এই জমি লীজ নেন যা পরবর্তীতে কোম্পানিটি খরিদ সূত্রে ব্যাংক অব ক্যালকাটার অধিকার গ্রহণ করে।