প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মেহেরপুর

ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২ ফাল্গুন ১৪২৬

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মেহেরপুর

মাজেদুল হক মানিক ২:০৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২০

print
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মেহেরপুর

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের তীর্থভূমি মেহেরপুর। মেহেরপুর সদর থানার বৈদ্যনাথতলা গ্রামের ঐতিহাসিক আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় যা দেশের ইতিহাসে একটি স্মরনীয় স্থান। মেহেরপুর জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ ও কমপ্লেক্স, মেহেরপুর শহীদ স্মৃতিসৌধ, আমদহ গ্রামের স্থাপত্য নিদর্শন, সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, আমঝুপি নীলকুঠি, ভাটপাড়া নীলকুঠি, সাহারবাটি ভবানন্দপুর মন্দির পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ জেলাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন মাজেদুল হক মানিক।

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স
বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার এর শপথ গ্রহণের স্থান হিসেবে মুজিবনগর ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। শপথ গ্রহণের স্মৃতিকে অম্লান করে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে শপথগ্রহণের স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ স্থানের আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলার লক্ষ্যে উক্ত কমপ্লেক্সে একটি মানচিত্রের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরকে দেখানো হয়েছে। এই কমপ্লেক্স মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির স্মারক ম্যূরাল স্থাপন করা হয়েছে।

সার্বিকভাবে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স, ঐতিহাসিক আম্রকানন, ঐতিহাসিক ছয় দফার রূপক উপস্থাপনকারী ছয় ধাপের গোলাপ বাগান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত প্রদর্শন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের (Mujibnagar Moktijoddo Sriti Complex) ভিতরের অংশে মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। স্মৃতি কমপ্লেক্সের বাইরের অংশে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ এবং পাকিস্থানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্যসহ আরও ঐতিহাসিক ঘটনার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। উক্ত ভাস্কর্যগুলির কয়েকটি এখানে দেওয়া হলো। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত উক্ত ভাস্কর্যগুলি যেকোন বিদগ্ধ পর্যটককে আকর্ষণ করবে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান বাংলাদেশের মানচিত্রে প্রদর্শন করে মানচিত্রটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরস্থ মূল আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয়েছে। সুদৃশ্য এ মানচিত্রটি মুক্তযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি সম্পর্কিত এক প্রামাণ্য চিত্র।

ভাটপাড়া নীলকুঠি
ভাটপাড়া নীলকুঠি (Bhatpara Neelkuthi) গাংনী উপজেলার অন্যতম উল্লেখযোগ্য নীলকুঠি যা গাংনী থানার সাহারবাটি ইউনিয়নের ভাটপাড়ায় অবস্থিত। ১৮৫৯ সালে স্থাপিত ধ্বংস প্রায় এই নীলকুঠিটি ইট, চুন-শুরকি দ্বারা নির্মাণ করা হয়। এর ছাদ লোহার বীম ও ইটের টালি দিয়ে তৈরি।

এই কুঠির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কাজলা নদী। গাংনী উপজেলার উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে ঐতিহাসিক কাজলা নদীর তীরে অবস্থিত জাতীয় জীবনের ও সভ্যতার স্মারক ভাটপাড়া নীলকুঠি। ৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থবিশিষ্ট মূল ভবনটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ বেনিয়াদের নির্যাতনের সাক্ষী হিসেবে। কুঠিভবন ও নীলগাছ আজও স্মরণ করিয়ে দেয় নীলকরদের অত্যাচার ও নির্যাতনের কথা। প্রচলিত আছে গভীর রাতে এখানে এসে দাঁড়ালে শোনা যায় নর্তকীদের নূপুরের আওয়াজ ও চাষিদের বুকফাটা আর্তনাদ। কালের সাক্ষী ভাটপাড়া কুঠিবাড়িতে আগে অনেক পর্যটক এলেও ধ্বংসাবশেষ দেখে হতাশ হয়েই ফিরতে হত।

২০১৬ সালের শেষের দিকে কাজলা নদীর ধারের নীলকুঠি বাড়িটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয় জেলা প্রশাসন। ২০১৭ সালের শুরুর দিকেই এর কাজ শুরু করা হয়। ইতিমধ্যে কুঠিবাড়ি ঘিরে কৃত্রিম লেক, ঝর্ণাধারা, বিভিন্ন পশু-পাখির মূর্তি, খেলাধুলার সরঞ্জাম, পানি ও পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, চলাচলের রাস্তা, বাহারি সব ফুলের বাগান করা হয়েছে।

২৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কুঠিবাড়িটির বেশকিছু জায়গা ভূমিহীনদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ায় কমে গেছে এর আয়তন। এখনও যা আছে সেখানেই জেলা প্রশাসক / ডিসি ইকোপার্ক (DC Eco Park) গড়ে তোলা হয়েছে।

আমদহ গ্রামের স্থাপত্য
মেহেরপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ন নিদর্শন মেহেরপুর শহর থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত আমদহ গ্রামের স্থাপত্য কীর্তি (Architecture of Amda Village)। প্রায় এক বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই প্রত্নস্থানের চারিদিকে ছিল পরিখা, কিন্তু পরিখার বেষ্টনীতে কোন প্রাচীর ছিল না।

এখন এই প্রত্নস্থানের কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এখানকার মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা একটি প্রত্নস্তম্ভ পুরাতন জেলা প্রশাসক ভবনের সামনে স্থাপন করা হয়েছে। আমদহ গ্রামের এই স্থাপত্য শৈলীর ধ্বংসাবশেষকে রাজা গোয়ালা চৌধুরীর সঙ্গে বগা দস্যুদের যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত আবাসস্থল বলে মাসিক পত্রিকা সাধক এর ১৩২০ (১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা) সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মেহেরপুর পৌর কবর স্থান
বহু বছর পূর্ব থেকে মৃতদেহ সমাহিত করার জন্য মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়ক সংলগ্ন স্থানে স্থাপিত হয় পৌর গোরস্থান। পূর্বে পৌর গোরস্থান অরক্ষিত অবস্থায় ছিল।

উক্ত প্রাচীর কালের আবর্তনে বিলীন হয়ে গেলে ১৯৯৩ সালে পৌর মেয়র, জনাব মোতাছিম বিল্লাহ মতু পৌর মেয়রের আসন অলংকৃত করার পর পৌর পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় সুদর্শন প্রাচীর নির্মাণসহ প্রাচীরের গায়ে টাইলস্ ও পাথরের ওপর আরবি এবং বাংলা কোরআন, হাদিসের বাণী লিখেন। এছাড়া এ কবরস্থানের সমস্ত জায়গায় ফুলের বাগান দ্বারা সজ্জিতকরণসহ কবর স্থানের মধ্যে ওজুখানা ও মসজিদ নির্মাণ করেন।

আমঝুপি নীলকুঠি
মেহেরপুর মানেই নীলকরদের ইতিহাস ও অত্যাচারের কাহিনী। এদেশে ব্রিটিশ রাজত্বকালে ইংরেজরা সে সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে নীল চাষ করার জন্য যেসব কুঠি গড়ে তুলেছিলেন, সেসব কুঠিবাড়িই নীলকুঠি নামে পরিচিত। কুষ্টিয়া মেহেরপুর সড়ক বা ঢাকা মেহেরপুর সড়কের কাছেই আমঝুপি নীলকুঠির অবস্থান (Amjhupi Neelkuthi)।

মোঘল সেনাপতি মানসিংহ এবং নবাব আলীবর্দী খাঁর স্মৃতি বিজড়িত এই আমঝুপিতেই পলাশীর পরাজয়ের নীলনকশা রচিত হয়েছিল। কথিত আছে এই নীলকুঠিতেই ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ লয়েড ও মীরজাফরের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের শেষ বৈঠক হয়েছিল। যার পরের গল্প অত্যাচার আর নির্যাতনের।

আমঝুপি ষড়যন্ত্রের ফলাফল সিরাজ-উদ-দৌলার পতন। ফলাফল বাঙালিদের স্বাধীনতা হারিয়ে পরাধীনতা গ্রহণ। তারপর সেই যে অত্যাচার শুরু হল সেই অত্যাচারের রক্তেই একদিন এখানে আমঝুপিতে নীলকুঠি গড়ে উঠল।

আমঝুপি নীলকুঠিতে দেশীয় স্থাপত্যের সঙ্গে ইউরোপীয় স্থাপত্য বিশেষ করে ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণ ঘটেছে। মূল কুঠি ভবনের বহির্বিভাগ দেখে এর সামগ্রিক অবস্থা অনুধাবন সম্ভব নয়। ভবনটির বাইরে চাকচিক্য না থাকলেও বিবর্ণরুপ পরিগ্রহ করেনি।

কুঠি ভবনটির দৈর্ঘ্য ১৫ মিটার, প্রস্থ ১০ মিটার ও উচ্চতা প্রায় ৮ মিটার। এতে রয়েছে দুটি প্রবেশ পথ ও ১৮টি জানালা। আমঝুপি কুঠিবাড়ির পূর্বদিকে রয়েছে একটি মনোরম ফুলের বাগান। এছাড়া তহসিল অফিসের সামনে রয়েছে একটি পেয়ারা বাগান। কুঠিবাড়ির আম্রকাননের পাশাপাশি রয়েছে ইংরেজ আমলে লাগানো বেশকিছু নাম না জানা বিশাল আকৃতির গাছ। দক্ষিণ দিকে কাজলা নদীর কোল ঘেঁষে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে নারিকেল গাছ। এসব গাছ ও বাগানের মনোরম নৈসর্গিক পরিবেশ কুঠিবাড়ির স্থাপত্যে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা, যা আমঝুপি নীলকুঠির নিথর পরিবেশকে করে তুলেছে প্রাণবন্ত। ভবনটিতে প্রবেশের দুটি পথ আছে। মূল প্রবেশ পথ এবং ভবনের সম্মুখ ভাগ কাজলা নদীর দিকে।

স্বামী নিগমানন্দ আশ্রম
মেহেরপুর জেলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থান হচ্ছে স্বামী নিগমানন্দ আশ্রম। হিন্দুধর্মের মহান সংস্কারক নিগমানন্দ সরস্বতীর জন্ম ১২৮৭ বঙ্গাব্দে রাধা গোবিন্দপুর গ্রামে। তার পৈতৃক নিবাস মেহেরপুরের কুতুবপুর গ্রামে। শ্রী চৈতন্য ও শংকরের দর্শনের সমম্বয়ে এক নতুন ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন।

স্বামী নিগমানন্দ গৃহীত হয়েও ছিলেন সন্ন্যাসী ও মানবের প্রেমে ব্যাকুল এক সাত্ত্বিক পুরুষ। ১৮ শতকের দিকে মেহেরপুর শহরে রাজা গোয়ালা চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত করেন আটচালা শিবমন্দির। মন্দিরটি বর্তমানে নিগমানন্দ সরস্বতী ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত সরস্বতী আশ্রম হিসেবে কাজ করছে।

বলরাম হাড়ি মন্দির
১৮ শতকের শেষের দিকে মেহেরপুর শহরের মালোপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলরাম হাড়ি নামের এক আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি ‘উপাস’ নামে একটি ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করেন যার অনুসারীরা বলরামী সম্প্রদায় নামে পরিচিত। ১৮ শতকের শেষের দিকে বা ১৯ শতকের গোড়ার দিকে এ ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ হয়।

১৮৫০ সালে ৬৫ বছর বয়সে বলরাম হাড়ি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাকে সমাহিত করা হয়। মেহেরপুরের জমিদার জীবন মুখার্জি এ সাধকের স্মৃতি রক্ষার্থে ৩৫ শতাংশ জমি দান করেন। এ জমির ওপর নির্মাণ করা হয় বলরাম হাড়ির সমাধি মন্দির।