নদী রক্ষার কারিগর

ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

নদী রক্ষার কারিগর

বাতিঘর ডেস্ক ১২:১৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

print
নদী রক্ষার কারিগর

মো. মনির হোসেন একজন নদীযোদ্ধা- যিনি নদী, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পর্যটন নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নদী বাংলাদেশের জীবনরেখা। নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। নদী বাঁচলেই প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকবে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির অগ্রগতি হবে। তাই তরুণ সমাজসহ সবাইকে নদী বিষয়ে আগ্রহী ও উদ্যোগী করতে তিনি গঠন করেন এ নেটওয়ার্কটি। এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন আবু বকর সিদ্দীক

নদীবন্ধু মনির হোসেন
সংগঠক মো. মনির হোসেন ১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। মো. মনির হোসেন গত ৯ বছর ধরে তরুণদের সংগঠিত করে নদী প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। নদী ভাবনা ও নদী চিন্তার সঙ্গে বেশিসংখ্যক তরুণকে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে ‘ইয়ূথ ফর রিভার’ শিরোনামে একটি ক্যাম্পেইনের সূচনা করেন তিনি। বর্তমানে এ ক্যাম্পেইনের সঙ্গে প্রায় সাড়ে চার হাজার তরুণপ্রাণ যুক্ত। এ পর্যন্ত তিনি দেশে ও বিদেশে প্রায় ২৫০টি ছোট বড় নদী পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০টি নদীর নান্দনিকতা ও সংকট নিয়ে আলাদাভাবে ফিচার লিখেছেন, যা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। বাঁচাও নদী-বাঁচাও জীবন, তুরাগ একটি নদের নাম, বাঁকখালীর বাঁকে বাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে লবলং সাগর, চিলাই এখন মরা গাঙ্গ, শঙ্খ নদ : দি আমাজন অব বেঙ্গল ও সংকটে জীবন্ত সত্তা শিরোনামে ৭টি নদী নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন, যা বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে প্রচারিত হয়েছে। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র শঙ্খ নদ : দি আমাজন অব বেঙ্গলের জন্য ইউনিসেফ বাংলাদেশের মিনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০১৯ পেয়েছেন ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ক ফর ভিজ্যুয়াল মিডিয়া (বড়দের) ক্যাটাগরিতে।

মো. মনির হোসেন পরিবেশ দূষণ রোধে নানা কার্যক্রম, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও দেশের নদী বাঁচাও আন্দোলনে তরুণ ও প্রবীণ নানা পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে বিশেষ অবদান রাখার জন্য কালের কণ্ঠ- শুভসংঘ শুভ কাজের পুরস্কার হিসেবে ২০১৬ সালে শ্রেষ্ঠ সংগঠক সম্মাননা দেন। তিনি বেশিসংখ্যক মানুষের মধ্যে নদী ভাবনা ছড়িয়ে দিতে এবং নদী সুরক্ষার কাজে সবাইকে যুক্ত করতে তার সংগঠনের মাধ্যমে জাতীয় নদী সম্মেলন, পার্বত্য নদী সম্মেলন, নদী-বিষয়ক সেমিনার, নদী-বিষয়ক পাঠচক্র- এসো নদীর গল্প শুনি, নদী ভ্রমণ, নদী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, প্রকৃতি পাঠ, অনলাইনভিত্তিক নদী-বিষয়ক ইনফো-শো রিভারটক ও উঠান বৈঠকের আয়োজন করেন। সংগঠনের সদস্যদের নদীজ্ঞান সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার জন্য নিয়মিত আয়োজন করেন নদী-বিষয়ক কর্মশালা, রিভার ক্যাম্প ও পাক্ষিক নদী আড্ডা। তিনি বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।


যেভাবে শুরু
এমন একটি সংগঠনের কীভাবে শুরু এমন প্রশ্নের জবাবে মো. মনির হোসেন বলেন, শুরুটা হয়েছিল ২০১১ সালে। ১১ জন তরুণ-যুবক একত্র হয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় যাদুকাটা নদী ভ্রমণের মাধ্যমে কর্মকা- শুরু করা হয়। এরপর থেকে সময়-সুযোগ পেলেই ইচ্ছুক সদস্যদের নিয়ে শখের বশে নদী সঙ্গমে বেরিয়ে পড়ি। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করি, শখের এই নদী ভ্রমণের মধ্য দিয়ে আরও কিছু কাজ করার দায়িত্বটাও পালন করা উচিত। কারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছু দায়দায়িত্ব রয়েছে। নদী ভ্রমণের এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে নদী রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টি, নদী ভরাট ও দূষণ বন্ধে মানুষের বিবেক জাগ্রত করার কাজটি এ ক্ষেত্রে হতে পারে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ। এমন নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা ব্যাপক পরিসরে নদী ভ্রমণ ও পরিদর্শন শুরু করি। ২০১৪ সালের ১৪ মার্চ আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে সাংগঠনিক রূপ দিই। সংগঠনের নাম রাখা হয় ‘বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল’। বর্তমানে এই দলে রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার সদস্য। এদের অধিকাংশই তরুণ ও শিক্ষার্থী, আছে নারী সদস্যও। আমরা নিজের চাঁদার টাকায় কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি।


এসো নদীর গল্প শুনি
আমাদের অস্তিত্ব, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আমাদের জীবন, অর্থনীতি, পর্যটন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নদীর ওপর নির্ভরশীল। তাই নদীভিত্তিক জীবন, অর্থনীতি ও পর্যটন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং পরিণত উপলব্ধি আধুনিক মানুষের পূর্ণাঙ্গতার অপরিহার্য ভিত্তি।
নদী এবং পরিবেশ সম্পর্কে উন্নত এবং স্পষ্ট ধারণা, নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার, নদীর সুরক্ষা ও সংরক্ষণের নিয়ম জেনে সমাজের প্রয়োজনে তা কাজে লাগানো এবং সর্বোপরি নদীর সঙ্গে স্বাস্থ্যকর সহাবস্থানের ক্ষেত্রে আমাদের প্রয়োজনীয় অন্তর্দৃষ্টি তৈরি করে থাকে এমন অনুষ্ঠান। আমাদের এই অন্তর্দৃষ্টি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শৈশব থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
বলাবাহুল্য, আমাদের প্রচলিত শিক্ষা-ব্যবস্থা বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে সেই অন্তর্দৃষ্টি গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই উপরোক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের অনুসন্ধিৎসাকে নদীর বিস্তৃত পরিম-লে নিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক এবং কার্যকর একটি পদ্ধতি হলো সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ পাঠচক্র, বিষয়ভিত্তিক আড্ডা ও ক্যাম্পেইনসহ নদী-বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা।
সেই উদ্দেশ্যকে সামনে ‘এসো নদীর গল্প শুনি’র পথচলা। প্রাথমিকভাবে লক্ষ্য ৬৪ জেলা। পরবর্তীতে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর এ পাঠচক্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে নদীর উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, নদীর বাস্তুতন্ত্র, নদীর স্বাস্থ্য, নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার, নদী পর্যটন, নদী অর্থনীতি, নৌপথ, নদী ও শিল্পোন্নয়ন, নদী নেতৃত্ব ও নদীর ভবিষ্যৎ, নদীর প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে। শিক্ষার্থীদের মতামত, বিশেষজ্ঞ আলোচনা এবং পর্যালোচনা, বিষয়টি সম্পর্কে উপস্থিত সকলের নানা অস্পষ্টতাকে দূর করতে সহায়তা করবে।
এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নদী বিষয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি গড়ে তোলার একটি সমন্বিত প্রয়াস। সকলেই আমাদের এই প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত হোন। সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন নদী ভাবনা।

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল
মো. মনির হোসেনের পরিচালনায় বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল নদী ভ্রমণ করে, সরেজমিন নদী পরিদর্শন করে, নদী বিষয়ে নদী পাড়ের মানুষের সঙ্গে নদী-বিষয়ক তথ্যের আদান-প্রদান করে, নদীর পাড়ের মানুষ ও তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার চেষ্টা করে। কারণ নদীর পাড়ের মানুষ এবং তরুণ সমাজ সচেতন হলে নদী সুরক্ষার কাজটি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল নদী ও জলাশয় রক্ষা, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর কল্যাণে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক। নদী বাংলাদেশের জীবনরেখা। নদী বাঁচলেই বাংলাদেশ বাঁচবে। নদী বাঁচলেই প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকবে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির অগ্রগতি হবে। তাই তরুণ সমাজসহ সকলকে নদী বিষয়ে আগ্রহী ও উদ্যোগী করতে বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল নদী রক্ষায় নদী ভ্রমণ, নদী পরিদর্শনসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং নদীর পাড়ের মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। সরেজমিনে নদী বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা, নদী ক্ষয়ে যাওয়া, নদী দূষিত হওয়ার ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করাও এ নেটওয়ার্কের অন্যতম কাজ। নিরীহ, অবহেলিত নদীকেন্দ্রিক মানুষ, জলচর ও জলনির্ভর প্রাণীর সেবা এবং বিরূপ পরিবেশ থেকে নিরাপদ বাসযোগ্য আশ্রয় পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নদী পরিব্রাজক দল বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলে।

এ নেটওয়ার্ক একটি সেবামূলক, বেসরকারি, অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনগণকে নদী ও জলাশয়ের প্রতি ভালোবাসার সেতুবন্ধনে আবদ্ধ করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধরনের মানুষের সার্বিক সহযোগিতায় নদী ও জলাশয় রক্ষা, নদী উন্নয়ন ও সংরক্ষণসহ নদীর তীরবর্তী নিরীহ ও অবহেলিত মানুষ, জলচর ও জলনির্ভর প্রাণীর কল্যাণে প্রবাহমান নদী, নিরাপদ নৌপথ ও পরিবেশবান্ধব নৌ পর্যটন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এ নেটওয়ার্ক কাজ করে যাচ্ছে। মনির হোসেন বলেন, ‘নদীর মায়ায় নদীর টানে আমরা নদীতে ঘুরে বেড়াই। নদী বিষয়ে নিজে জানা এবং অন্যকে জানানোর কাজ করি। কারণ নদী পরিব্রাজক দল মনে করে, নদীকে জানলেই কেবল নদী বাঁচবে। একই সঙ্গে নদীর সন্তান জেলে এবং বেদেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে তাদের সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়ার জন্যও কাজ করছি আমরা।’ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকালিয়া গ্রামের বালু নদীর তীরে নদীহারা বঞ্চিত সান্ধার সম্প্রদায়ের সন্তানদের জন্য ভাসমান পাঠশালা ‘ক্লাইমেট ইশকুল’ নিজেদের চাঁদার টাকায় পরিচালনা করছি। এখানে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, আচার-আচরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবনদর্শন, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবেশ-প্রকৃতি ও নদীর পদ্ধতি দায়বদ্ধতা শেখানো হবে। নদ-নদী ভ্রমণের সময় নদী পরিব্রাজক দল জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে লিফলেট বিলি করে। সেখানে আমাদের কিছু আবেদন-নিবেদনও থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, নদীর তলদেশ খোদাই করে বালু উত্তোলন না করা। কারণ এর প্রভাবে মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আরও রয়েছে নদীর বুকে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা, দূরপাল্লার নৌযানে ডাস্টবিন স্থাপন করে সেখানে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা করা। কলকারখানাগুলোতে সার্বক্ষণিক ইটিপি নিশ্চিত করা আর সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে এসটিপি নিশ্চিত করা।


নদীর মায়ায় বাঁধা গল্প

‘প্রাচীনকাল থেকেই সভ্যতাগুলো গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। নদীকে বাদ দিয়ে সমৃদ্ধি অনেকটাই অসম্ভব। টেমস নদী যেমন লন্ডন শহরের প্রাণ, তেমনি ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা। আজ কোথায় টেমস আর কোথায় বুড়িগঙ্গা। ইংরেজদের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছুই নিয়েছি; কিন্তু নিতে পারিনি ঐতিহ্যের প্রতি তাদের ভালোবাসার নির্যাসটুকু’- কথাগুলো বলতে বলতে চোখ দুটি কেমন ছলছল করে উঠল তার। নদীর সঙ্গে কোথায় যেন নিজেকে বেঁধে ফেলেছেন তিনি। এ পর্যন্ত তিনি ছাটে-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক নদ-নদী ভ্রমণ করেছেন। ভীষণ নদীপাগল এই মানুষটি হলেন মো. মনির হোসেন। নদী-বিষয়ক বিভিন্ন কথা হয় তার সঙ্গে। বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অনেক নদী ভ্রমণ করে তিনি জানিয়েছেন তার অভিজ্ঞতার কথা। বাংলাদেশের ভূ-ভাগ নদীর পলি দ্বারা গঠিত। হাজার হাজার বছর ধরে নদীবাহিত পলি জমে ধীরে ধীরে সাগর থেকে জেগে উঠেছিল এই দেশ। এরপর গাছপালা জন্মে বনভূমি ও জলাভূমি তৈরি হয় এবং জলে-স্থলে নানা প্রজাতির পশুপাখি, মাছ ও প্রাণীর আবাসন তৈরি হয়। একসময় এই নদীবিধৌত কর্দমাক্ত ভূমিতে আমাদের পূর্বপুরুষরা বসতি গড়ে তুলেছিলেন। নদ-নদী আমাদের আবাসভূমি গঠন করেছে, জনপদ সৃষ্টি করেছে, খাদ্য জুগিয়েছে, হাজার বছর ধরে বয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি। এই বহমান নদী আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের জাতীয় সম্পদ। দেহের রক্তকণিকার মতো পবিত্র আমাদের নদীর জল। এ নদ-নদী আমাদের তৃষ্ণা মেটায়, ফসল ফলায়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ইতিহাস এই নদীই সৃষ্টি করেছে, বয়ে নিয়ে গেছে নৌপথে বিশ^ব্যাপী। নদী ও নদী-তীরবর্তী মানুষকে ঘিরে সৃষ্ট আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য এই নদীর জলধারার মতো প্রবহমান। আমাদের পরিবেশ, শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি-সব কিছুতেই আছে নদ-নদীর ছোঁয়া। নদী ভ্রমণের কারণ জানতে চাইলে নদী পরিব্রাজক মো. মনির হোসেন বলেন, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশে হাজার হাজার নদ-নদী, উপনদী, শাখা নদী সমন্বয়ে বিশে^র অন্যতম নদীব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

নদীগুলো উঁচু পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে সাগরে পতিত হয়েছে। বিগত কয়েক শতকে তিন সহস্রাধিক নদ-নদী বিলীন হয়ে গেছে। বিশ শতকের শেষ দিকে হাজারখানেক নদ-নদী ধুঁকতে ধুঁকতে তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। সুযোগ বুঝে ভূমিদস্যুরা দখল করে নিচ্ছে নদীর নিজস্ব ভূমি। এসব অসুরের হাত থেকে নদী বাঁচাতে হলে সর্বস্তরে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। আমি নদীভ্রমণ করি, নদীর পারের মানুষের সঙ্গে কথা বলি, নদী সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে কিছু জানি আর আমিও কিছু বলি। নদীর উৎস খুঁজি, নদীর প্রবাহ দেখি, দেখি তার বয়ে চলা। নদীর দুঃখকষ্ট দেখি, দিন দিন তার নিঃশেষ হয়ে যাওয়া দেখছি। আর এগুলো সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক গণমাধ্যমে উপস্থাপনের মাধ্যমে সচেতনতাবোধ তৈরির চেষ্টা করছি মাত্র।’ নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। উজানের নদীগুলোর পানি অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। দেখা দিচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়। সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, দেখা দিচ্ছে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য। জীবিকার টানে গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর কাজের আশায় পাড়ি জমাচ্ছে শহরে। এতে পারিবারিক ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে, বাড়ছে বৃদ্ধ, নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা। একসময়ের নদীমাতৃক বাংলা বলে পরিচিত এ দেশের হাজার হাজার জেলে পরিবার তাদের পেশা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। শুকনো মৌসুমে দেশের বহু অংশে ভয়াবহ পানিসংকট দেখা দিচ্ছে। তাই সংকট উত্তরণ, নিরাপদ জীবন ও উন্নত বাংলাদেশের জন্য নদী রক্ষা করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে নদী পরিব্রাজক মনির হোসেনের সচেতনতাবোধ সৃষ্টির যে উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা দরকার। তিনি নদী ভ্রমণ করছেন, নদীর পাড় রক্ষায় তাল, হিজলসহ বিভিন্ন বৃক্ষরোপণ করছেন, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করছেন। তরুণ প্রজন্মকে নদী সম্পর্কে আগ্রহী ও উদ্যোগী করাই তার এ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য।

 

সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব
সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক পানি সপ্তাহ ২০১৮ সালের ৮ জুলাই থেকে ১২ জুলাই ৫ দিনব্যাপী চলা এ সম্মেলনে বিশ্বের ১২৫টি দেশের প্রায় ২৪ হাজার ভিজিটর যোগ দিয়েছেন। এখানে পরিবেশ, পানি, ক্লিন এনভায়রনমেন্ট সামিট, ওয়ার্ল্ড সিটি সামিট, স্মার্ট সিটি সলিউশন নামে একাধিক সামিট হয়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামিট হচ্ছে ইয়ং ওয়াটার লিডার সামিট। এ সামিটের অংশগ্রহণের জন্য ২০১৮ সালের শুরুতে দরখাস্ত আহ্বান করা হয় পরিবেশ, পানি ও পানিসম্পদ রক্ষায় প্রত্যয়ী তরুণদের মধ্য থেকে। জমাকৃত আবেদনকারীর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কাজ, অভিজ্ঞতা ও কমিটমেন্ট পর্যবেক্ষণ করে ৩৫টি দেশের ৭০ জন তরুণকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় সামিটে অংশগ্রহণ করার।
মো. মনির হোসেন ৭০ তরুণের একজন। ফলশ্রুতিতে মো. মনির হোসেন এ সম্মেলনে যোগ দেন। তিনি নদী ও পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও প্রধান গবেষক। সামিটের বিভিন্ন সেশনে বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাতিসংঘের ৮ম মহাসচিব বান কি মুন, শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী রনীল বিক্রমাসিংহ, সিঙ্গাপুরের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং অর্থ ও সমাজ পরিকল্পনা-বিষয়ক সমন্বয়কারী মন্ত্রী থারমেন শানমুগারটনম, পরিবেশ ও পানিসম্পদ মন্ত্রী মাসাগোজ জুলকিফলি, ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্র-বিষয়ক মন্ত্রী লুহুত পানজাইতান, সিঙ্গাপুরের তথ্য, যোগাযোগ, সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও যুব-বিষয়ক সিনিয়র প্রতিমন্ত্রী সিম আনসহ পানি-বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা।

মনির হোসেন বলেন, ‘ইয়ং ওয়াটার লিডার সামিট আমাদের জন্য শিক্ষার একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে। পানি, পরিবেশ ও নদী বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশ^নেতৃবৃন্দসহ বিশেষজ্ঞরা পানি ও পানির আধুনিক ব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন, পানির ইনোভেশন নিয়ে কথা বলেছেন। বর্তমান বাংলাদেশের বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্ট ওয়াটার সলিউশন, ওয়াস্ট ওয়াটার রি ইউজ ও ডিস্যালাইনেশন নামে টেকনিক্যাল সেশন হয়েছে। ওয়াটার ইনোভেশন নিয়ে সহস্রাধিক স্টল ছিল যেখানে ব্যবহারিকভাবে ইনোভেশনগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। পৃথিবীর ৩৫টি দেশের প্রত্যয়ী তরুণ-যুবাদের সঙ্গে ভাবনার আদান প্রদান হয়েছে। অনেক না জানা তথ্য জানার সুযোগ হয়েছে। আগামী ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য একই সম্মেলনের জন্য বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের টিম প্রস্তুত করাই আমার এই মুহূর্তের প্রধান কাজ।’

নদী সুরক্ষায় প্রত্যেকের অংশগ্রহণ অপরিহার্য
নদী জাতীয় সম্পদ। আর নদীর সংকট মানেই জাতীয় সংকট। আর এ সংকট উত্তরণের জন্য সবাইকে একযোগে মাঠে নামতে হবে। কারণ নদীই এদেশের প্রাণ। নদীর জলপ্রবাহের সঙ্গে আমাদের জীবন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদীর স্রোত থেমে গেলে আমাদের জীবনও থেমে যাবে। সভ্যতার মূল শিকড় হলো নদী। নদীতীরেই যুগ যুগ ধরে মানবসভ্যতা বিকশিত হয়েছে।

নানা প্রতিবন্ধকতায় সেটা থমকে গেছে। একে চলমান করার জন্যই আমরা কাজ করছি। এ দেশের তরুণ-যুবসমাজ আমাদের এই নদী সুরক্ষা আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করলে অনেকেই সাড়া দিচ্ছে।