অটিজমে অন্য আলো

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

অটিজমে অন্য আলো

আলতাফ হোসেন ১:১২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০১৯

print
অটিজমে অন্য আলো

অটিজমের প্রসঙ্গ এলেই যার কথা সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তিনি হলেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নেতৃত্ব ও প্রচেষ্টায় অটিস্টিকদের সেবা ও পুনর্বাসনে নিরলস কাজ করছে বাংলাদেশ। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সব অটিজম শিশুর জীবনযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে বিকশিত জীবনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার যে প্রত্যয় ও প্রচেষ্টা নিয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, তা প্রশংসার দাবিদার। তিনি অটিজমবিষয়ক বাংলাদেশ জাতীয় পরামর্শক কমিটির চেয়ারম্যান। শিশুদের অটিজম বিষয়ে একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রবক্তা।

সায়মা ওয়াজেদ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি, ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। পুতুল ২০০৪ সালে স্কুল সাইকোলজির ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি লাভ করেন।

ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তার গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত হয়।

তিনি ২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম এবং স্নায়বিক জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা পেয়েছে।

মনস্তত্ত্ববিদ সায়মা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটিজম স্পিকস-এর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। তিনি ২০১৩ সালের জুন থেকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত আছেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুতুলকে হু অ্যাক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে।

পুতুলের উদ্যোগেই ২০১১ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় অটিজম নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের পর গড়ে ওঠে সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক। সংগঠনটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অটিস্টিক শিশুদের স্বাস্থ্য, সামাজিক ও শিক্ষা সহায়তা দেওয়ার জন্য অবকাঠামো গড়তে কাজ করছে। তার উদ্যোগেই অটিজম সচেতনতায় বাংলাদেশের একটি প্রস্তাব বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

তার মতে, উন্নয়নশীল দেশে অটিস্টিকদের জন্য কাজ করা খুব সহজ নয়। এর জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে অনেক। এসব দেশে অটিজম মোকাবেলায় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও সীমিত সেবা, সেবাদানকারীদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের অভাব এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় চ্যালেঞ্জ। অটিস্টিক জনগোষ্ঠীকে বিশ্বের মূলধারার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার লক্ষ্যে তাদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সেবা দিয়ে কর্মোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য বিশ্বের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

জানা গেছে, ১৯৪৩ সালে আমেরিকার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লিও ক্যানার প্রথম মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে রোগটি শনাক্ত করে অটিজম শব্দটি ব্যবহার করেন। শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়।

অটিজম শিশুর বিকাশজনিত একটি সমস্যা। ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে অটিজমের সঠিক কারণ জানা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা অটিজম আক্রান্ত মানুষ রয়েছেন।

সরকার পরিচালিত এক জরিপে বর্তমানে দেশে ১৬ লাখ ৪৪ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির সংখ্যা ৪৭ হাজার।

জরিপ অনুযায়ী, মোট অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রামে। এ বিভাগে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ১১ হাজার ৬৯৫ শিশু শনাক্ত হয়েছে। এর পরই ঢাকা বিভাগে ৮ হাজার ৮০৬ শিশু। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রংপুরে ৪ হাজার ৬৩২ জন, খুলনায় ৪ হাজার ১০ জন, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৮৭৫ জন, সিলেটে ২ হাজার ৪৭০ জন, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৩৬৭ জন ও বরিশালে ২ হাজার ২৮ জন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ মানুষ অটিজম আক্রান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৬৮ শিশুর মধ্যে একজন অটিস্টিক।

যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিশেষজ্ঞ এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক সমীক্ষায় দেখেন যে, ৪০ বছর বয়সী মায়ের অটিস্টিক শিশু হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মায়ের তুলনায় ৫০ ভাগ। সমীক্ষায় তারা আরও দেখেন যে, প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে ৫ জনের এমন রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত ছেলে শিশু মেয়ে শিশুর তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি।