স্বপ্ন আর টিকে থাকার লড়াই

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

কর্মসংস্থান সৃষ্টির জাদুকর

স্বপ্ন আর টিকে থাকার লড়াই

আবু বকর সিদ্দিক ও আলতাফ হোসেন ২:৫৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৭, ২০১৯

print
স্বপ্ন আর টিকে থাকার লড়াই

এখন যেমন মানুষ গ্রাম থেকে ভাগ্যের সন্ধানে ঢাকার মতো মহানগরীতে পাড়ি জমান, সেই সময়ে বাঙালিদের কাছে এমন শহর ছিল কলকাতা। আকিজ উদ্দীনও সেই কলকাতার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছিলেন। সম্বল ছিল মাত্র ১৬ টাকা। ১৯৪২ সালেও ১৬ টাকা খুব বেশি টাকা ছিল না। কলকাতায় তার পরিচিত কোনো মানুষ ছিল না, শুধু আশা, স্বপ্ন আর সাহসে ভর করে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন।

‘বাবার কাছ থেকে মাত্র ১৬ টাকা নিয়ে বাড়ি ছাড়ি। গন্তব্য কাছাকাছি মহানগর কলকাতা। সেখানে গিয়ে আশ্রয় নিলাম শিয়ালদহ রেলস্টেশনে। সারাদিন ঘুরি-ফিরি, কাজের সন্ধান করি আর রাত হলে স্টেশনের এক কোণে কাগজ বিছিয়ে শুয়ে পড়ি। সারাদিনের খাবার ছয় পয়সার ছাতু। এর বেশি খরচ করার সুযোগও ছিল না। কারণ টাকা দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল, কিন্তু উপযুক্ত কাজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।’ আকিজ উদ্দিনের নিজের মুখে বলে যাওয়া এ চিত্র বুঝতে কষ্ট হয় না, কলকাতায় তার সংগ্রাম কেমন ছিল। এভাবে বেশ কিছুদিন ভিক্ষুকের মতো স্টেশনে কাটানোর পর তার পরিচয় হয় সেখানকার জাকারিয়া হোটেলের মালিকের সঙ্গে। তিনি দয়া করে আকিজ শেখকে তার হোটেলের এক কোনায় থাকার জায়গা দেন। কোনোভাবেই কাজ জোটাতে না পেরে তিনি ব্যবসার চিন্তা করতে থাকেন। কিন্তু হাতে এতই অল্প টাকা ছিল যে, তিনি ব্যবসাও শুরু করতে পারছিলেন না। এরপর একসময় জানতে পারলেন কমলালেবুর ব্যবসায় পুঁজি খুব কম লাগে এবং এতে লাভও বেশ ভালো হয়। এরপর তিনি শুরু করলেন পাইকারি দরে কমলা কিনে ফেরি করে বেচা। কলকাতার হাওড়া ব্রিজের আশপাশের এলাকায় তিনি কমলালেবু ফেরি করতেন। এই ব্যবসা করার জন্য দিনে ২ টাকা চাঁদাও দিতে হতো কলকাতার পুলিশকে।

এই ব্যবসা করতে করতে তার হাতে কিছু টাকা জমে গেল। এরপর তিনি ভ্যান গাড়ির ওপর ভ্রাম্যমাণ মুদির দোকানের আইডিয়া পেলেন। সেই সময় ভ্রাম্যমাণ মুদির দোকানগুলো বেশ জনপ্রিয় ছিল। তিনিও একটি মুদির দোকান চালু করলেন। তবে একটি সমস্যা ছিল যে, তিনি হিন্দি একদমই জানতেন না। অন্যদিকে, অন্য ব্যবসায়ীরা হিন্দি ভাষায় ছোট ছোট ছড়া বানিয়ে সেগুলো বলে বলে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতেন।

আকিজ ধীরে ধীরে হিন্দিও শিখতে শুরু করলেন এবং এক সময় শিখেও ফেললেন। তারপর ভ্যান গাড়ির ওপর মুদিমালের দোকানটি বেশ জমে উঠল। তার দোকানের সব পণ্যের দামই ছিল ছয় আনা। তাই তিনি এর নামও দিয়েছিলেন ‘নিলামওয়ালা ছে’আনা’।

দোকান ভালোই চলছিল। কিন্তু সেই দোকানও তিনি বেশিদিন চালাতে পারেননি। অবৈধ দোকান চালানোর অভিযোগে একদিন পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। পাঁচ টাকা জরিমানার সঙ্গে তিন দিনের জেল হয় তার।

জেল খাটায় তার এতই রাগ আর অভিমান হয় যে, তিনি তার লাভজনক ব্যবসাটি বিক্রিই করে দেন। তারপর কয়েকদিন তিনি কিছুই করেননি। কলকাতার এখানে ওখানে অনিশ্চিত ঘুরে বেড়িয়েছেন।

এভাবে কিছুদিন কাটার পর তার পরিচয় হয় এক পেশোয়ারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে। ব্যবসায়ীর সঙ্গে তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ারে পাড়ি জমান। সেখানকার প্রচলিত পশতু ভাষা শিখে নেন অল্প দিনেই। তারপর দোকান বিক্রির টাকা বিনিয়োগ করে শুরু করেন ফলের ব্যবসা।