ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রতীক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৯ কার্তিক ১৪২৬

অসুর দোলনী

ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রতীক

ধীরাজ কুমার নাথ ১:৫৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

print
ঐতিহ্য ও ঐক্যের প্রতীক

বাংলাদেশে শরৎকাল হচ্ছে উৎসবের সময়কাল। গ্রীষ্মের দাবদাহ ও বর্ষার অঝোর বর্ষণ শেষে আসে শরৎ। প্রকৃতিতে পুষ্পরাজির সমারোহ, প্রেম-প্রীতি সৃষ্টি করে এক অনবদ্য ও আকর্ষণীয় পরিবেশ।

শারদীয়া দুর্গোৎসব, লক্ষ্মীপূজা, দেওয়ালি ইত্যাদি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মাঝে প্রধান হলো শারদীয় দুর্গোৎসব, যা ভারত ও নেপালে দশেরা হিসেবেও উৎযাপিত হয়ে থাকে প্রায় ১০ দিন ধরে, যাকে তারা বলে ‘নবরাত্রি’। দেওয়ালি হচ্ছে আলোর উৎসব, যা উৎযাপিত হয় রাজা রামচন্দ্রের লঙ্কা বিজয় শেষে অযোধ্যায় পুনরাগমনের দিনটিকে স্মরণ করে।

এই দীপাবলিতে অযোধ্যার প্রতিটি ঘর আলোকিত হয়েছিল আনন্দের মিছিলে আর দীপাবলির আলোর বন্যায়। মহানন্দে দীপাবলির শুভরাত্রি উদযাপিত হয়েছিল অযোধ্যার প্রতিটি গৃহে। সত্যের বিজয় ও অসুরের পরাজয়কে অভিনন্দিত করা হয় লাখ লাখ প্রদীপের আলোর ঝর্ণাধারার মাঝে। দীপাবলি তাই বিজয়ের প্রতীক, সত্য প্রতিষ্ঠার শুভদিন। অসত্যের অন্ধকার ও অসুরের পরাজয়কে অভিনন্দিত করার এক মাহেন্দ্রক্ষণ হচ্ছে দীপাবলির উৎসব।

বাস্তবে পৌরাণিক কাহিনী ও কথকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উৎসব উৎযাপনের কাহিনী ও ঘটনাপ্রবাহ। তবে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবনবোধ ও চিন্তাধারার সংমিশ্রণের ফলে ধর্মের মর্মবাণীতে এক সংহতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যা এই উৎসবকে টেকসই রূপ দিয়েছে। যার ফলে যুগ যুগ ধরে উৎযাপিত হয়ে আসছে শারদীয় উৎসব বাংলার মাটিতে এবং তা-ই হয়ে উঠেছে বাংলার ঐতিহ্য।

শিউলি ফুলের সুভাস, বাতাসের হিমেল মধুর পরশ, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ভাববিনিময়ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে এই শরতের সকাল-সন্ধ্যায়। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনায় আকুল করা মনকে করেছে আন্দোলিত, হৃদয়ে দিয়েছে দোলা, মনকে করেছে উৎসবমুখর। তার মাঝে মায়ের আগমন, ঢাকের শব্দ, ধূপধুনার মাঝে মন হয়ে ওঠে উদাসীন। তাই পৌরাণিক কাহিনীকে বর্তমানের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে মন হয়ে ওঠে উদগ্রীব।

শারদীয় দুর্গোৎসব হচ্ছে অসত্যকে পরাভূত করে সত্য ও ন্যায়ের বাতাবরণ প্রতিষ্ঠার শুভ সময়। দশভুজা দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা ধরণিতে আগমন করে শরতের মোহনীয় সময়কালে সত্যকে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে। দশ হাতে মা দুর্গা ধারণ করে আছে ত্রিশুল ও অন্য উপকরণ, যা দুষ্টের দমন ও সত্যকে প্রতিষ্ঠার সহায়ক।

বাংলাদেশে দেবী দুর্গার আরাধনা চলে আসছে ঐতিহাসিকদের মতে প্রায় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে। দিনাজপুর ও মালদার জমিদাররা প্রথমে দুর্গাপূজার সূচনা করে। তবে অনেকের মতে রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংশ নারায়ণ অথবা নদীয়ার জমিদার ভোলানন্দ মজুমদার প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা করে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে।

তবে বিশাল আকারে সর্বস্তরের জনগণকে নিয়ে সমন্বিতভাবে ‘বারোয়ারী’ পূজা শুরু হয় কলকাতায় ১৮৩২ সালে, কাশিমপুরের রাজা হরিনাথ তার বাড়ি মুর্শিদাবাদে সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে পূজার আয়োজন করে। আবার কারও মতে, ১৭৯০ সালে হুগলির গুপাতিপাড়ায় ‘বারোজন’ বিশিষ্ট ব্যক্তি বারোয়ারী পূজার প্রচলন শুরু করেন। ইতিহাস যাই হোক না কেন, বর্তমানে দুর্গোৎসব হচ্ছে বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অঙ্গ।

সার্বজনীন দুর্গোৎসবের মূলবাণী হচ্ছে, সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে এবং সবার উদ্যোগে সমন্বিতভাবে পূজার আয়োজন করা। এর মাধ্যমে হিন্দুদের মধ্যে বর্ণ বিভাজনের ভাবনাকে দুরীভূত করে ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।

বর্তমানে দুর্গোৎসবে অনেক আধুনিকতা এসেছে, আলোর বর্ণচ্ছটায় পূজাম-পকে মহিমান্বিত করা অথবা একেক মণ্ডপে কোনো এক বিশেষ প্রতিপাদ্য বিষয়কে তুলে ধরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার এক রীতি চালু হয়েছে। সমসাময়িক ভাবনাকে তুলে ধরার এমন উদ্যোগ অবহেলার নয়, তবে রক্ষণশীলদের অভিমত হচ্ছে, এর ফলে দুর্গাপূজার সনাতনী ও ধর্মীয় অনুভূতি অনেক দূরে সরে গেছে।

অনেক ক্ষেত্রে শারদীয় দুর্গোৎসব হয়েছে সামাজিক প্রতিপত্তির কেন্দ্র এবং সম্পদের সমারোহ হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে, যা অনেকের মতে অনভিপ্রেত। তবে একথা সত্য, দুর্গাপূজা উপলক্ষে যেসব সাময়িকী বা পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তা ধর্মের বিভিন্ন দিকদর্শন এবং আচার অনুষ্ঠানের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণালব্ধ উপাত্তকে উদ্ভাসিত করতে সহায়তা করে। এ ছাড়াও সাহিত্যের ভুবনে অনেক অমূল্য অবদান রাখছে এসব প্রকাশনা।

বাংলাদেশে এ বছর (২০১৯ সালে) কমপক্ষে ৪০ হাজার পূজামণ্ডপ নির্মিত হয়েছে, যা দেশের সর্বত্র এবং সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশ সরকার দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত এমন এক মহা আয়োজনকে শুধু আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছে তাই নয়, নিরাপত্তার নিশ্চিদ্র বলয়ে বেঁধে ফেলে দুর্গাপূজার আয়োজনকে সাবলীল ও আনন্দমুখর করার সুযোগ সৃষ্টি করছে। তাই এ উৎসব সর্বজনীন জাতীয় উৎসবে রূপ লাভ করেছে এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে লালন করছে। রাজনীতি পরোক্ষভাবে জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দ পূজামণ্ডপে গিয়ে তাদের ভোটারদের অনুপ্রাণিত করেন এবং সাহস জোগান। এসবের ফলে দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছে জাতীয় উৎসব।

অনেকের মনে প্রশ্ন, ঈশ্বরকে মাতৃরূপে বন্দনা করা হয় কেন? ঈশ্বরকে মাতৃরূপে বন্দনার অন্যতম দর্শন হচ্ছে মায়ের সঙ্গে তার সৃষ্টির অপূর্ব সংযোগ সাধন। মায়ের দয়া অপরিসীম, জ্ঞানের ভাণ্ডার অফুরন্ত, ক্ষমতা অপরিমেয় এবং তার ঐশ্বর্য অনবদ্য ও অনির্বচনীয়। মা তার সন্তানদের জাগতিক সম্পদের অধিকারী হতে এবং আধ্যাত্মিক ভাবধারায় উজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতা বহুরূপে প্রকাশিত হয়। এই শক্তির উৎস হচ্ছে মায়ের আশীর্বাদ। মা দশভুজা দুর্গা তার সন্তানদের দান করে ঐশ্বর্য, সাহায্য করে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় বিকশিত ও প্রতিষ্ঠা করে।